সুখ-দুঃখ ও দৈনন্দিন জীবনে প্রতিবেশীরাই আমাদের নিত্যসঙ্গী। পরিবারের পর সবচেয়ে কাছের মানুষ তারাই। একারণেই জীবনযাত্রায় প্রতিবেশীর গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, পিতামাতা ও আত্মীয়-স্বজনের অধিকারের পাশেই এর স্থান দেওয়া হয়েছে।
সুরা নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। কোনো কিছুকে তাঁর সঙ্গে শরিক করো না এবং পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের দাস-দাসীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো।’
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ও জান্নাত
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া কেবল অমানবিক নয়, বরং পরকালীন মুক্তির অন্তরায়। হাদিস শরিফে এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘ওই ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার প্রতিবেশী তার অত্যাচার থেকে নিরাপদ থাকে না।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৬)
অর্থাৎ, একজন মুমিন হওয়ার বড় শর্ত হলো- তার মাধ্যমে তার প্রতিবেশী নিরাপদ অনুভব করবে।
আরও পড়ুন: ইফতারের সময় দরিদ্র প্রতিবেশীর কথা ভুলে যাবেন না
যেসব আচরণ বর্জনীয়
প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় ইসলাম আমাদের নির্দিষ্ট কিছু আচরণের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দিয়েছে-
কষ্ট দেওয়া ও অমর্যাদা: কথা বা কাজের মাধ্যমে প্রতিবেশীকে উত্যক্ত করা বা নিচু দেখানো যাবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন স্বীয় প্রতিবেশীকে সম্মান করে। (সহিহ বুখারি: ৬০১৯)
অভাবে পাশে না থাকা: কেবল নিজের সুখ নিয়ে ব্যস্ত থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। হাদিসে এসেছে, ‘ওই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী না খেয়ে থাকে।’ (আদাবুল মুফরাদ: ১১২; তাবারানি: ১২৫৭৩, হাকেম, বায়হাকি: ২০১৬০)
ক্ষুদ্র উপহারে অবজ্ঞা নয়: সুসম্পর্ক বৃদ্ধিতে উপহারের ভূমিকা অপরিসীম। নবীজি (স.) নারীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘কোনো মহিলা প্রতিবেশিনী যেন অপর মহিলা প্রতিবেশিনীর হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি তা ছাগলের সামান্য গোশতযুক্ত হাড় হলেও।’ (সহিহ বুখারি: ২৫৬৬)
সহযোগিতায় সংকীর্ণতা: প্রতিবেশীর প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসা জরুরি। এমনকি রান্না করা খাবারের ঝোল বাড়িয়ে দিয়ে হলেও প্রতিবেশীকে তাতে শরিক করার নসিহত করেছে ইসলাম। (সহিহ মুসলিম: ২৬২৫)
আরও পড়ুন: প্রতিবেশীর সংকটে আপনার দায়িত্ব
আমরা কি অজান্তেই প্রতিবেশীর হক নষ্ট করছি?
অনেক সময় আমরা মনে করি, কাউকে সরাসরি গালি দেওয়া বা মারধর করাই কেবল কষ্ট দেওয়া। কিন্তু আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারে গভীর রাতে উচ্চস্বরে গান শোনা, বারান্দা দিয়ে ময়লা ফেলা, এসির পানি অন্যের জানালার ওপর পড়া কিংবা সিঁড়িঘরে জুতার স্তূপ করে রাখা- এগুলোও যে প্রতিবেশীর প্রতি অবিচার, তা আমরা বেমালুম ভুলে যাই। এমনকি কমন স্পেস দখল করে চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে কৌতূহলী হওয়াও কষ্টের বড় কারণ হতে পারে।
প্রতিবেশীর সঙ্গে আমাদের আচরণই আমাদের ঈমানের গভীরতার প্রতিফলন। যান্ত্রিক এই জীবনে আমরা যেন দেয়াল তুলে একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যাই। মনে রাখা প্রয়োজন, বিপদের সময় সবার আগে পাশের ঘরের মানুষটিই এগিয়ে আসেন।
আসুন, নিজেরা পরিবর্তন শুরু করি- প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার মাধ্যমেই গড়ে উঠুক একটি শান্তিময় ও মানবিক সমাজ।




