হজ একটি পবিত্র ইবাদত, যা শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। সম্প্রতি ধর্ম মন্ত্রণালয় হজযাত্রীদের লাগেজে নেশাজাতীয় ওষুধ ও নির্দিষ্ট কিছু নিষিদ্ধ পণ্য বহন না করার কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। বিষয়টি কেবল রাষ্ট্রীয় আইনগত বিষয় নয়- ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতেও এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মাসয়ালাগত দিক।
তাওবা ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা
হজের সফর শুরু হয় তাওবার মাধ্যমে, আর তওবার অন্যতম শর্ত হলো ভুল বা অন্যায় পথ পরিহার করা। একজন হজযাত্রী যখন আল্লাহর মেহমান হিসেবে পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে থাকা উচিত সততা ও স্বচ্ছতা। জেনেশুনে নিষিদ্ধ কোনো পণ্য গোপন করা বা আইন অমান্য করা তাওবার প্রকৃত চেতনার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাষ্ট্রীয় আইন মানা ও আমানতের দায়িত্ব
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যখন ভিসা গ্রহণ করে অন্য দেশে প্রবেশ করেন, তখন তিনি কার্যত সেই দেশের আইন মেনে চলার একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন। শরিয়তের দৃষ্টিতে এই চুক্তি বা অঙ্গীকার রক্ষা করা ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।’ (সুরা মায়েদা: ১) সুতরাং সৌদি আরবের হজ ও ইমিগ্রেশন আইন ভঙ্গ করে নিষিদ্ধ পণ্য বহন করা ‘খেয়ানত’ বা বিশ্বাসভঙ্গের শামিল, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্ট গুনাহের কাজ।
বিজ্ঞাপন
হজের কবুলিয়ত ও আধ্যাত্মিক ক্ষতি
হজ কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো এটি হতে হবে ‘হজে মাবরুর’- যেখানে কোনো পাপাচার, ধোঁকাবাজি বা অনৈতিক কাজ থাকবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি হজ করল এবং কোনো অশ্লীলতা ও পাপ কাজ করল না, সে যেন নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে এলো।’ (সহিহ বুখারি: ১৫২১) ওলামায়ে কেরামের মতে, ক্ষতিকর পণ্য যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অন্তত মাকরুহ এবং অনেক ক্ষেত্রে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর, তা হজের মতো পবিত্র সফরে বহন করা হজের রূহানিয়ত বা আধ্যাত্মিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রশ্ন: সৌদি আরবে নিষিদ্ধ পণ্য লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া কি জায়েজ?
উত্তর: না, এটি জায়েজ নয়। কারণ এটি রাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গের পাশাপাশি ভিসা চুক্তির খেয়ানত। এতে হজ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং শরিয়তের দৃষ্টিতেও এটি গুনাহ ও তাওবার শর্ত ভঙ্গের শামিল।
শরিয়তের নীতি: ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি নীতি হলো- ‘লা দারারা ওয়া লা দিরার’ (নিজের ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না)। নিষিদ্ধ পণ্য বহন করে ধরা পড়লে জেল, জরিমানা বা হজযাত্রা ব্যাহত হওয়ার চরম ঝুঁকি থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ‘তোমরা নিজের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।’ (সুরা বাকারা: ১৯৫) সুতরাং জেনেশুনে এমন ঝুঁকি নেওয়া শরিয়তসম্মত নয়।
আরও পড়ুন: হজ ২০২৬: প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা
আইন ভঙ্গ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
ইসলামি দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় আইন ভঙ্গ করা কেবল আইনি অপরাধ নয়, এটি আমানতের খেয়ানত হিসেবেও গণ্য হয়। একজন হজযাত্রীর অনৈতিক আচরণ নিজের ইবাদত ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে নিজ দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করতে পারে। আলেমদের মতে, হজের মতো ইবাদতে যেকোনো ধরনের গোপনীয়তা বা আইন ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা পুরো ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
মোটকথা, হজ আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণের নাম। তাই এ সফরে রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা ভঙ্গ করা যেমন আইনগত অপরাধ, তেমনি শরিয়তের দৃষ্টিতেও এটি খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং ‘হজে মাবরুর’ লাভের প্রত্যাশায় প্রতিটি হজযাত্রীর উচিত সব ধরনের নিষিদ্ধ পণ্য থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং রাষ্ট্রীয় আইনকে পূর্ণভাবে অনুসরণ করা।




