রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

নূরের তাজাল্লি: তুর পাহাড়ে আল্লাহর মহিমার বিস্ময়কর নিদর্শন

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

নূরের তাজাল্লি: তুর পাহাড়ে আল্লাহর মহিমার বিস্ময়কর নিদর্শন
প্রতীকী ছবি: এআই

মানব ইতিহাসের অন্যতম মর্যাদাবান নবী হজরত মুসা (আ.), যিনি সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলার অনন্য সম্মান লাভ করেছিলেন। এ কারণেই তাকে বলা হয় ‘কালিমুল্লাহ’ বা আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনকারী। সিনাই উপত্যকার তুর পাহাড় সেই ঐতিহাসিক ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী, যেখানে মুসা (আ.) আল্লাহর নূরের তাজাল্লি প্রত্যক্ষ করেন এবং আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন।

বিপদের রাতে আগুনের খোঁজে মহান রবের সান্নিধ্য

হজরত মুসা (আ.) যখন মাদয়ান থেকে সপরিবারে (হজরত শুআইব আ.-এর মেয়ে ও তাঁর স্ত্রী) মিসরের দিকে যাত্রা করছিলেন, তখন ছিল এক অন্ধকার ও কনকনে শীতের রাত। অপরিচিত রাস্তা, তার ওপর তাঁর স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হয়। এই চরম বিপদ ও অসহায়ত্বের মুহূর্তে একটু উষ্ণতার প্রয়োজন ও পথের সন্ধানে তিনি দূরে আগুনের শিখা দেখতে পান।

পরিবারকে নিরাপদ স্থানে রেখে তিনি আগুনের দিকে এগিয়ে যান। সুরা আল-কাসাসে সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, মুসা যখন আগুন দেখলেন, তখন তিনি তার পরিবারকে বললেন- ‘তোমরা এখানে অপেক্ষা করো, আমি আগুন দেখেছি; হয়তো সেখান থেকে আগুন নিয়ে আসতে পারব অথবা পথের কোনো সন্ধান পাব।’

পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় প্রথম আলাপ

আগুনের কাছে পৌঁছানোর পর বরকতময় ভূমির একটি বৃক্ষ থেকে এক গায়বি আওয়াজ এলো- ‘হে মুসা! আমিই তোমার প্রতিপালক; সুতরাং তোমার জুতা জোড়া খুলে ফেল, নিশ্চয় তুমি পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় রয়েছ।’ (সুরা ত্বহা: ১১-১২)


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: হজরত মুসা ও খিজির (আ.)-এর ঘটনা

আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-কে তাঁর সান্নিধ্য দান করলেন এবং বললেন, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই; সুতরাং আমার ইবাদাত করো এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো।’ (সুরা ত্বহা: ১৪)। এই অন্তরঙ্গ আলাপের মাধ্যমেই তিনি নবুয়ত লাভ করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাকে ডেকেছিলাম তুর পাহাড়ের ডান দিক থেকে এবং অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছি।’ (সুরা মরিয়ম: ৫২)

৪০ দিনের ইতেকাফ ও তাওরাতপ্রাপ্তি

পরবর্তীতে বনী ইসরায়েলকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-কে তুর পাহাড়ে চল্লিশ রাতের জন্য অবস্থানের নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর ভাই হারুন (আ.)-কে সম্প্রদায়ের দায়িত্ব দিয়ে পাহাড়ে যান। সেখানে মহান আল্লাহ তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং তাকে পবিত্র ‘তাওরাত’ দান করেন।

‘হে প্রভু! আমাকে দেখা দিন’

আল্লাহর সঙ্গে কথা বলতে বলতে মুসা (আ.)-এর মনে এক তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হলো- যাঁর সঙ্গে তিনি কথা বলছেন, তাঁকে যদি একবার স্বচক্ষে দেখতে পেতেন! তিনি বিনীতভাবে নিবেদন করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে দর্শন দিন, আমি আপনাকে দেখব।’ মহান আল্লাহ জবাবে বললেন, ‘তুমি আমাকে কিছুতেই দেখতে পাবে না।’ অর্থাৎ এই নশ্বর পৃথিবীর চোখ দিয়ে আল্লাহর অসীম নূর প্রত্যক্ষ করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর সেই কালজয়ী দোয়া: প্রতিটি চ্যালেঞ্জের চূড়ান্ত সমাধান

পাহাড়ের দিকে দৃষ্টিপাত ও নূরের তাজাল্লি

আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.)-কে বললেন, ‘তুমি বরং পাহাড়ের দিকে তাকাও। সেটি যদি আপন জায়গায় স্থির থাকে, তবেই তুমি আমাকে দেখতে পারবে।’ অতঃপর যখন মহান প্রতিপালক পাহাড়ের ওপর তাঁর নূরের অতি সামান্য ‘তাজাল্লি’ (আলোকচ্ছটা) প্রকাশ করলেন, মুহূর্তেই বিশাল সেই পাহাড়টি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধুলোয় মিশে গেল।

মুসা (আ.)-এর সংজ্ঞাহীন হওয়া ও তাওবা

পাহাড়ের সেই ভয়াবহ দৃশ্য ও আল্লাহর কুদরতের মহিমা দেখে হজরত মুসা (আ.) জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। দীর্ঘ সময় পর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এল, তিনি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে তাওবা করলেন এবং আল্লাহর অসীম মহিমার সামনে নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে বললেন- ‘আপনার সত্তা পবিত্র। আমি আপনার দরবারে তাওবা করছি এবং আমিই সবার আগে ঈমান আনছি (যে দুনিয়ায় কেউ আপনাকে দেখতে সক্ষম নয়)।’ (সুরা আরাফ: ১৪৩)

তুর পাহাড়: ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী

বর্তমানে সিনাই উপত্যকার সেই তুর পাহাড় আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক পর্যটক ও গবেষকের মতে, পাহাড়ের চূড়ার পাথরগুলো অস্বাভাবিকভাবে কালচে ও ঝলসানো দেখায়, যা সাধারণ পাহাড়ের পাথরের তুলনায় ভিন্ন। যেন হাজার বছর আগের সেই নূরের তাজাল্লির স্মৃতি এখনও সেখানে রয়ে গেছে।

তুর পাহাড়ের এই ঘটনা আমাদের শেখায় মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা। এটি আল্লাহর সঙ্গে তাঁর প্রিয় নবীর ভালোবাসা, ব্যাকুলতা ও মানুষের সীমাবদ্ধতার এক গভীর পাঠ। আল্লাহর নূর দেখার সৌভাগ্য দুনিয়ায় নয়, বরং পরকালীন জান্নাতই মুমিনদের জন্য নির্ধারিত। 

সূত্র: সুরা ত্বহা: ১১-১৭, সুরা আরাফ: ১৪২-১৪৩, সুরা মরিয়ম: ৫২ ও সুরা কাসাস: ২৯-৩০, তাফসিরে ইবনে কাসির ও ইসলামি ইতিহাস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর