জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। আধুনিক বিজ্ঞান যখন পরিবেশ রক্ষার পথ খুঁজছে, ইসলাম আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগেই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, বৃক্ষরোপণ এবং অপচয় রোধে সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। ইসলামের এই পরিবেশবান্ধব জীবনদর্শনকেই বিশেষজ্ঞরা এখন ‘গ্রিন ইসলাম’ বা ‘সবুজ ইসলাম’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের মৌলিক নীতি ও দালিলিক দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
প্রকৃতি ও পরিবেশ: স্রষ্টার সুপরিমিত নেয়ামত
আমাদের চারপাশের এই প্রকৃতি মহান আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত। ইসলামি দৃষ্টিতে, প্রকৃতিতে কোনো কিছুই অপ্রয়োজনীয় নয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন- ‘আমি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছি ও এতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং আমি পৃথিবীতে প্রতিটি বস্তু সুপরিমিতভাবে উৎপন্ন করেছি। আমি তোমাদের জন্য তাতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছি।’ (সুরা হিজর: ১৯-২০)
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতির এই সুশৃঙ্খল সাজসজ্জা মুমিনদের জন্য জ্ঞান ও উপদেশস্বরূপ। (সুরা কাফ: ৭-৮)
মানুষ পৃথিবীর আমানতদার বা খলিফা
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ এই পৃথিবীর নিরঙ্কুশ মালিক নয়, বরং আল্লাহর প্রতিনিধি বা আমানতদার। ‘তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি (খলিফা) করেছেন।’ (সুরা আনআম: ১৬৫)
এই আমানতের দাবি হলো, মানুষ নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতি ব্যবহার করবে কিন্তু একে ধ্বংস বা কলুষিত করবে না।
আরও পড়ুন: সৎ নেতা বাছাইয়ের অলৌকিক ফল: আল্লাহর রহমত নেমে আসে ৫ ভাবে
বিজ্ঞাপন
বৃক্ষরোপণ: সদকা ও ইবাদত
পরিবেশের প্রাণকেন্দ্র হলো বৃক্ষ। পৃথিবীর মোট উদ্ভিদ প্রজাতির ২৫ শতাংশই হলো গাছ। বৃক্ষরোপণকে ইসলাম ‘সদকায়ে জারিয়া’ বা প্রবহমান দান হিসেবে গণ্য করেছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেতখামার করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তবে তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।’ (সহিহ মুসলিম)
এমনকি কেয়ামতের মহাবিপর্যয়ের মুহূর্তেও বৃক্ষরোপণের নির্দেশ দিয়ে তিনি (স.) বলেছেন- ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কেয়ামত এসে গেছে, আর তোমাদের হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তবে সেটি রোপণ করে দাও।’ (মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে বাযযার)
প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে
প্রকৃতির অবমাননা করা ইসলামের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। কারণ প্রতিটি সৃষ্টিই তার আপন মহিমায় আল্লাহর জিকির করে। জনৈক ব্যক্তি একটি গাছের পাতা ছিঁড়লে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছিলেন- ‘প্রত্যেকটি পাতা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে।’
সুতরাং বিনা প্রয়োজনে পাতা ছেঁড়া বা গাছ কাটা সেই জিকির ও তাসবিহ বন্ধ করার শামিল।
আরও পড়ুন: যেসব তাসবিহ ১০০ বার পড়তে উৎসাহিত করেছেন নবীজি (স.)
দূষণ ও ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
ইসলামের একটি মূলনীতি হলো- ‘নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যের ক্ষতি করা যাবে না’ (লা দরারা ওয়া লা দিরারা)। প্লাস্টিক বর্জ্য বা কলকারখানার ধোঁয়ায় পরিবেশ দূষিত করা এই মূলনীতির পরিপন্থী। যত্রতত্র ময়লা ফেলা বা পরিবেশ কলুষিত করাকে কোরআনে ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে- ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও জলে বিপর্যয় (ফাসাদ) ছড়িয়ে পড়েছে।’ (সুরা রুম: ৪১)
পানি ও বায়ুর ভারসাম্য রক্ষা
প্রাণিকুলের বেঁচে থাকার জন্য পানি ও বায়ু অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বায়ুপ্রবাহ এবং মেঘমালার স্তরে স্তরে বারিধারা বর্ষণের মাধ্যমে জীবনপ্রবাহ সচল রাখেন। (সুরা রুম: ৪৮)। এই জলবায়ু ও বায়ুর বিশুদ্ধতা নষ্ট করা মানুষকে আল্লাহপ্রদত্ত সেবা থেকে বঞ্চিত করার নামান্তর। নদীর তীরে বসেও অজু করার সময় অতিরিক্ত পানি ব্যয় না করার মাধ্যমে রাসুল (স.) পানির মিতব্যয়িতার শিক্ষা দিয়েছেন।
অপচয় রোধ ও মিতব্যয়িতা
প্লাস্টিক আসক্তি এবং অতি ভোগবাদের মূলে রয়েছে অপচয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: ২৭)
প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে ইসলামের মূলনীতি হলো- প্রকৃতির কোনো সৃষ্টির বিনাশ বা অপব্যবহার করা যাবে না। প্রতিটি সৃষ্টিই কোনো না কোনোভাবে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। তাই পরিবেশ ধ্বংসের যেকোনো চেষ্টা মুমিনের পরিচায়ক হতে পারে না। প্লাস্টিক বর্জন, গাছ লাগানো এবং অপচয় রোধের মাধ্যমে সবুজ-সমারোহের চর্চা পারে এই পৃথিবীকে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ করে তুলতে।

