সকালে তপ্ত রোদ, বিকেলে ঝুম বৃষ্টি- প্রকৃতির এই খামখেয়ালি রূপ অনেকের কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা কখনো গরমে অতিষ্ঠ হয়ে অভিযোগ করি, আবার কখনো বৃষ্টির কাদা-জল নিয়ে নাখোশ হই। তবে একজন মুমিনের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে রোদ-বৃষ্টির এই পরিবর্তনগুলো আল্লাহর অস্তিত্ব, ক্ষমতা ও একত্বের সুস্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়।
পরিবর্তনের মাঝে স্রষ্টার অস্তিত্বের খোঁজ
দিন-রাত্রির পরিবর্তন এবং আবহাওয়ার এই রূপান্তর আকস্মিক নয়। আল্লাহ তাআলা কোরআনে স্মরণ করিয়েছেন- ‘নিশ্চয়ই আসমান ও জমিন সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনের মধ্যে জ্ঞানবানদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯০)
আবহাওয়ার এই বৈচিত্র্য আমাদের শেখায়, মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ এককভাবে এক মহান সত্তার হাতে। আজ যে সূর্য আমাদের তপ্ত রোদে পোড়াচ্ছে, পরক্ষণেই মেঘের আড়ালে লুকিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে- প্রকৃতি কোনো স্বয়ংক্রিয় ঘটনা নয়, বরং এক মহাব্যবস্থাপকের আজ্ঞাবহ।
আরও পড়ুন: নারী-পুরুষ বিভাজন: আল্লাহর কুদরত ও হেকমতের জীবন্ত নিদর্শন
তপ্ত রোদ: পরকালের স্মারক
প্রচণ্ড রোদে ঘামতে থাকা একজন মুমিনকে পরকালের সেই ভয়াবহ উত্তাপের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘তোমাদের এই আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের এক ভাগ।’ (সহিহ বুখারি)
গ্রীষ্মের তাপ আমাদের ছায়ার গুরুত্ব বোঝায়, পাশাপাশি আল্লাহর আরশের ছায়ার প্রতি আকৃষ্ট করে। রোদের উত্তাপকে বিরক্তির চোখে না দেখে আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখাটাই ইসলামের শিক্ষা।
বৃষ্টি: মৃত পৃথিবীর পুনর্জীবন
ঝুম বৃষ্টি কেবল পৃথিবীকে শীতল করে না, এটি পুনর্জীবনের প্রতীক। মরুপ্রায় মৃত জমি বৃষ্টির ছোঁয়ায় সজীব হয়ে ওঠে, তেমনি আল্লাহ কেয়ামতের দিন মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন। কোরআনে উল্লেখ আছে- ‘তিনিই আল্লাহ, যিনি তাঁর রহমতের (বৃষ্টির) আগে সুসংবাদবাহী বায়ু পাঠিয়ে দেন... এবং আমি এর মাধ্যমে মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি।’ (সুরা আরাফ: ৫৭)
বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা আল্লাহর রহমতের বার্তা নিয়ে আসে। রাসুল (স.) বৃষ্টির সময় দোয়া করতেন এবং বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পানিকে আল্লাহর নতুন রহমত হিসেবে গ্রহণ করতেন।
আরও পড়ুন: পাহাড় ও সাগর যেভাবে আল্লাহর নির্দেশে চলে
খামখেয়ালি আবহাওয়া ও মুমিনের ধৈর্য
আবহাওয়া আমাদের ইচ্ছার অধীনে নয়। কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি এই দোলাচল আমাদের অসহায়ত্ব মনে করিয়ে দেয়। এই অসহায়ত্ববোধ মুমিনকে বিনয়ী করে। রোদে ধৈর্য (সবর) এবং বৃষ্টিতে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতিতেই সওয়াব অর্জন সম্ভব। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘মুমিনের বিষয়টি কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। যদি সে সুখ পায় তবে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে এটি তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি সে দুঃখ পায় তবে ধৈর্য ধারণ করে, এটি এটিও কল্যাণকর হয়।’ (সহিহ মুসলিম)
রোদ আর বৃষ্টির এই ক্ষণিকের পরিবর্তন আমাদের আত্মিক উপলব্ধির সময়। রোদ আমাদের স্রষ্টার প্রতাপ ও পরকালের কথা মনে করিয়ে দেয়, বৃষ্টি মনে করিয়ে দেয় তাঁর অসীম মমতা ও রহমতের কথা। প্রকৃতির ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মধ্যেও আল্লাহর মহান কারিগরি খুঁজে পাওয়া আমাদের জন্য একটি বড় ইবাদত।

