ইসলামে সৃষ্টির প্রতিটি দিকই আল্লাহর মহিমা, পরিকল্পনা ও ক্ষমতার নিদর্শন। পাহাড় ও সাগর কেবল প্রাকৃতিক উপাদান নয়; এগুলো আল্লাহর আজ্ঞা অনুযায়ী চলাচল করে। কোরআন ও হাদিসে এর বর্ণনা আমাদের শেখায় যে সৃষ্টির প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বারবার তাঁর সৃষ্টিজগতের নিদর্শনসমূহের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পাহাড় ও সাগর—এ দুটি বিশাল সৃষ্টি কীভাবে আল্লাহর নির্দেশে পরিচালিত হয়, তা কোরআনের বহু আয়াতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ আছে।
পাহাড়ের গতিবিধি: স্থিতিশীলতা ও চলন
কোরআনে পাহাড়কে কেবল পৃথিবীর স্থিতিশীলতার কারণ হিসেবেই নয়, বরং মেঘের মতো চলমান সত্তা হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে, যা আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন।
পৃথিবীর স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাহাড়
আল্লাহ তাআলা পাহাড়কে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে স্থাপন করেছেন- ‘তিনি পৃথিবীতে পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে এটি তোমাদের নিয়ে আন্দোলিত না হয়।’ (সুরা নাহল: ১৫)
আধুনিক ভূতত্ত্ববিদরাও পাহাড়ের গভীর মূলকে (Mountain Roots) পৃথিবীর প্লেটগুলোকে সংযুক্তকারী পেরেক বা নোঙর হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা পৃথিবীর স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: সৃষ্টিজগতের রহস্য অনুধাবনে কোরআনের আহ্বান
পাহাড়ের চলন ও আল্লাহর নির্দেশনা
প্লেট টেকটোনিক তত্ত্ব অনুযায়ী পাহাড় ধীরে ধীরে চলাচল করে। কোরআনও এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে: ‘তুমি পর্বতগুলোকে দেখতে পাও এবং মনে কর যে তারা স্থির, অথচ সেগুলো মেঘের মতো চলমান হবে।’ (সুরা নমল: ৮৮)
এটি ভূত্বকের প্লেটসমূহের ধীর গতির চলনকে নির্দেশ করে, যা আল্লাহর সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে পরিচালিত।
পাহাড়ের আত্মসমর্পণ
পাহাড়সহ সমস্ত সৃষ্টি আল্লাহর আজ্ঞায় কিভাবে পরিচালিত হয়, তার একটি স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে- ‘তারপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করলেন, যা ছিল ধোঁয়াাকার; অতঃপর তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে বললেন: তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল- আমরা আসলাম বিনীত হয়ে।’ (সুরা হা মিম সাজদা: ১১)
সাগরের গতিবিধি: আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে
সাগরের বিশালতা, তরঙ্গ, স্রোত এবং পানির সীমারেখা—সবই আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন, যা সুনির্দিষ্ট নিয়মের অধীন।
সাগরপথের সীমারেখা ও আড়াল
দুই সাগরের মিলনস্থলে আল্লাহর কর্তৃক নির্ধারিত এক অন্তরায় বা সীমারেখা রয়েছে, যা তারা অতিক্রম করে না: ‘তিনি দুই দরিয়া প্রবাহিত করেছেন, যারা পরস্পর মিলিত হয়; উভয়ের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরায়, যা তারা অতিক্রম করে না।’ (সুরা রহমান: ১৯-২০)
এটি মিষ্ট ও লবণাক্ত পানির মিলনস্থলের (Estuaries) প্রাকৃতিক পৃথকীকরণকে নির্দেশ করে, যা আল্লাহর নিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক বিধানেরই অংশ।
আরও পড়ুন: আল্লাহর ৮টি অসীম কুদরত
সাগরের তরঙ্গ ও নিয়ন্ত্রণ
জাহাজ চলাচল ও মানব জীবনের প্রয়োজনীয় পরিবহণের জন্য সাগর সঞ্চালিত হয় আল্লাহর নির্দেশে: ‘আল্লাহ, যিনি সাগরকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যেন তাঁর আদেশে তাতে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে। আর যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ করতে পার।’ (সুরা জাসিয়া: ১২)
সাগরের প্রতিটি স্রোত ও তরঙ্গ মানুষের জীবন, পরিবহন ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; যা সবই আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে।
সাগরের গভীরতায় অদৃশ্য শক্তি
সাগরের রহস্যময় গভীরতাও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন, যা মানুষকে তাঁর বিশাল ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দেয়: ‘অথবা (তাদের আমলসমূহ) গভীর সমূদ্রে ঘনিভূত অন্ধকারের মতো, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার; এক স্তরের উপর অপর স্তর।’ (সুরা নূর: ৪০)
আরও পড়ুন: রহস্যময় সৃষ্টি আকাশ, জ্ঞানীদের চিন্তার খোরাক
নবী-রাসুলদের মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশের প্রমাণ
পাহাড় ও সাগরের চলাচল যে আল্লাহর পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত, তার ঐতিহাসিক ও অলৌকিক প্রমাণ নবী-রাসুলদের জীবনীতে পাওয়া যায়।
হজরত নূহ (আ.)-এর কিস্তি
বন্যা ও কিস্তি চালনা আল্লাহর তত্ত্বাবধানে হয়েছিল: ‘নূহ বলল- এতে আরোহণ কর, আল্লাহর নামে এর গতি ও এর স্থিতি।’ (সুরা হুদ: ৪১)
হজরত মুসা (আ.)-এর সাগর বিভাজন
সাগর আল্লাহর নির্দেশে বিভক্ত হয়েছিল: ‘অতঃপর আমি মুসার প্রতি ওহি পাঠালাম, ‘তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর। ফলে তা বিভক্ত হয়ে গেল।’ (সুরা শুআরা: ৬৩)
প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহর হাতে
পাহাড়ের স্থিতি থেকে সাগরের স্রোত সবই আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। এই দুটি বিশাল সৃষ্টি সম্পূর্ণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়, যা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত: ‘ আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সব তাঁরই। সবকিছুই তাঁর অনুগত।’ (সুরা রুম: ২৬)
পাহাড় ও সাগরের এই দালিলিক বিবরণ চিন্তা-ভাবনা করলে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি হয়। ‘হে আমাদের রব! আপনি এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র, তাই আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৯১)
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর সৃষ্টি নিদর্শনসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার তাওফিক দিন। আমিন।

