মানবীয় দুর্বলতার কারণে মানুষ অনেক সময় ভুল বা অপরাধে লিপ্ত হতে পারে। কিন্তু সেই ভুলের দায়ভার গ্রহণ না করে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর তা আরোপ করা কেবল নৈতিক অবক্ষয়ই নয়, বরং ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী এটি একটি গুরুতর গুনাহ। ইসলাম সত্যবাদিতা ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নিজের স্বার্থ রক্ষায় অন্যকে মিথ্যা অপবাদে কলঙ্কিত করা সামাজিক ও পারলৌকিক জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।
নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপানোকে পবিত্র কোরআনে ‘বুহতান’ বা স্পষ্ট মিথ্যা অপবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা প্রদান করে ইরশাদ করেন- ‘আর যে ব্যক্তি কোনো ভুল বা পাপ করে, অতঃপর তা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর আরোপ করে, সে তো এক গুরুতর অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করল।’ (সুরা নিসা: ১১২)
মুফাসসিরগণের মতে, এখানে ‘খতিয়াহ’ (ভুল) এবং ‘ইসম’ (পাপ) শব্দ দুটি ব্যবহার করে সব ধরণের ছোট-বড় অপরাধের দায় অন্যকে দেওয়ার ভয়াবহতা নির্দেশ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রাসুলুল্লাহ (স.) মুসলিমের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অন্যকে নিরাপদ রাখার বিষয়টি প্রাধান্য দিয়েছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে নবী (স.) বলেছেন- ‘প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
আরও পড়ুন: কাউকে কষ্ট দেওয়ার পর ক্ষমা না পেলে করণীয় কী
নিজের অপরাধ গোপন করতে গিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া মুনাফিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত, যা এ ধরনের কাজের ভয়াবহতা নির্দেশ করে। রাসুলুল্লাহ (স.) মুনাফিকের লক্ষণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘যখন সে কথা বলে, মিথ্যা বলে।’ (সহিহ বুখারি) সুতরাং নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপানোর অর্থ হলো- একই সাথে মিথ্যাচার এবং অন্যকে নিজ জিহ্বা বা হাতের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করা, যা একজন আদর্শ মুমিনের চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক নষ্ট করা
ইসলামি ফিকহ শাস্ত্রের একটি মৌলিক নীতি হলো, আল্লাহ তাআলা বান্দার ব্যক্তিগত অনেক গুনাহ ক্ষমা করলেও বান্দার হক বা ‘হাক্কুল ইবাদ’ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ততক্ষণ ক্ষমা করেন না, যতক্ষণ না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তা ক্ষমা করেন। নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপালে মূলত তিনটি অপরাধ সংঘটিত হয়: মিথ্যাচার, জুলুম এবং ওই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করা। রাসুলুল্লাহ (স.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো, কারণ কেয়ামতের দিন জুলুম অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’ (সহিহ মুসলিম)
আরও পড়ুন: কারো প্রতি অন্যায় করলে যে বিপদে পড়তে হবে
সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
একটি সমাজে যখন নিজের দায় এড়ানোর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখন পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়। অন্যের ওপর দোষ চাপানোর প্রবণতা মানুষের মধ্যে আত্মশুদ্ধির পথ রুদ্ধ করে দেয়। ফলে ব্যক্তি নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হারায় এবং বারবার একই ত্রুটিতে লিপ্ত হয়। এটি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর পরিণতি বয়ে আনতে পারে।
প্রতিকার ও উত্তরণের উপায়
দায়িত্বশীলতা: নিজের কৃতকর্মের দায়ভার নিজে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা।
তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা: যদি ইতিপূর্বে এমন কাজ করা হয়ে থাকে, তবে প্রথমত আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং দ্বিতীয়ত যাঁর ওপর দোষ চাপানো হয়েছিল, তাঁর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে তাঁর সম্মান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা।
পরকালীন জবাবদিহিতা: কেয়ামতের দিন প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব দিতে হবে—এই চেতনা অন্তরে জাগ্রত রাখা।
নিজের দোষ অন্যের ওপর চাপানো মূলত চারিত্রিক দুর্বলতা ও সাহসের অভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়- সত্য যত কঠিনই হোক তা স্বীকার করতে। মিথ্যার আশ্রয়ে সাময়িকভাবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা গেলেও আল্লাহর দরবারে এবং বিবেকের কাছে অপরাধীই থাকতে হয়। তাই সামাজিক শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তির লক্ষ্যে আমাদের উচিত প্রতিটি কাজে সত্যনিষ্ঠ হওয়া এবং নিজের ভুলের জন্য অন্যের ওপর দায় চাপানোর মতো গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকা।

