মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

কদরের রাতে কেন বেশি বেশি দোয়া করবেন

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ মার্চ ২০২৬, ১০:১১ পিএম

শেয়ার করুন:

কদরের রাতে কেন বেশি বেশি দোয়া করবেন

পবিত্র রমজান মাসের মুকুট বলা হয় ‘লাইলাতুল কদর’ বা শবে কদরকে। এই একটি রাত রমজানের মর্যাদা ও সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই রাতেই অবতীর্ণ হয়েছে মানবজাতির মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে কদরের রাতে আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা কদর: ১)

এই মহিমান্বিত রজনীতে দোয়া ও মুনাজাতের গুরুত্ব অপরিসীম। কেন এই রাতে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি প্রার্থনা করা উচিত, তার বিশেষ কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।


বিজ্ঞাপন


১. ভাগ্য পুনর্নির্ধারণের রাত (তাকদির নির্ধারণ)

সুরা কদরের বর্ণনা অনুযায়ী, এ রাতে ফেরেশতা ও জিবরাইল (আ.) পালনকর্তার আদেশক্রমে ‘প্রত্যেক মঙ্গলময় বস্তু’ বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন। মুফাসসিরদের মতে, এ রাতে পরবর্তী এক বছরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের তফসিল ফেরেশতাদের কাছে নাজিল করা হয়। যেহেতু এ সময় মানুষের জীবনের যাবতীয় অবধারিত ঘটনাবলি ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, তাই নিজের ও পরিবারের কল্যাণে আল্লাহর কাছে দোয়ার মাধ্যমে আকুতি জানানোই মুমিনের প্রধান কাজ।

আরও পড়ুন: শবে কদর অনুসন্ধান: আমল, দোয়া ও আলামত

২. হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম সওয়াব

শবে কদরের মর্যাদা অনুধাবনের জন্য কোরআনে ‘আল-কদর’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরা অবতীর্ণ হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘কদরের রাত হলো হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (সুরা কদর: ৩) এই রাতের ইবাদত, জিকির ও দোয়ার সওয়াব হাজার মাসের (প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস) ইবাদতের চেয়েও উত্তম। এ বিরল সুযোগ হাতছাড়া করা মুমিনের জন্য চরম দুর্ভাগ্যের বিষয়।

৩. গুনাহ পুরোপুরি মুছে ফেলার সুযোগ (আফওয়া ও মাগফিরাহ)

শবে কদরের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো- এর বিশেষ দোয়া। রাসুল (স.) হজরত আয়েশা (রা.)-কে এই রাতে ‘আফওয়া’ (عفو) শব্দ দিয়ে দোয়া করতে শিখিয়েছেন। এর পেছনে এক গভীর রহস্য রয়েছে-
আফওয়া’র বিশেষত্ব: আরবি ভাষায় ‘আফওয়া’ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছু এমনভাবে মুছে ফেলা যেন তার কোনো চিহ্নই অবশিষ্ট না থাকে। যেমন চক দিয়ে বোর্ডে লেখার পর ভুল শব্দ ডাস্টার দিয়ে মুছে ফেলা হয়।
পার্থক্য: ‘মাগফিরাহ’ মানেও ক্ষমা, তবে তাতে গুনাহের রেকর্ড থেকে যেতে পারে যা বিচারের দিন সামনে আসবে। কিন্তু ‘আফওয়া’ হলো এমন এক পরম ক্ষমা, যেখানে আল্লাহ গুনাহ মাফ করে তা আমলনামা থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলবেন। এমনকি বিচারের দিন ফেরেশতা বা খোদ বান্দাকেও সেই গুনাহের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হবে না। তাই পাপের গ্লানি সম্পূর্ণ ধুয়ে ফেলতে এ রাতে দোয়ার বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন: শবে কদরে যেভাবে ইবাদত করবেন

৪. রাসুল (স.)-এর আমল ও নির্দেশনা

রমজানের শেষ দশক আসার সঙ্গে সঙ্গেই রাসুল (স.) ইবাদতের জন্য কোমর বেঁধে নিতেন (অধিক পরিশ্রম করতেন) এবং নিজে রাত জাগার পাশাপাশি পরিবারকেও জাগাতেন। (সহিহ বুখারি)। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে শবে কদর অনুসন্ধান করো।’ (সহিহ বুখারি: ১৯১৩) কোনো কোনো হাদিসে ২৭ রমজানের রাতের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। (মুসনাদে আহমাদ: ২১৪৯)

৫. গুনাহমুক্ত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কদরের রাতে ইমানের সঙ্গে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কিয়ামুল্লাইল (রাত জেগে ইবাদত) করবে, তার পেছনের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৯০১) কিয়ামুল্লাইলের অন্যতম মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দোয়া ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।

শবে কদরের বিশেষ দোয়া

হজরত আয়েশা (রা.) যখন জানতে চাইলেন এ রাতে তিনি কী প্রার্থনা করবেন, তখন রাসুল (স.) এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন-
আরবি: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউয়ুন, তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফাফু ‘আন্নী।
অর্থ: হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল (গুনাহ মুছে ফেলার মতো ক্ষমাকারী)। আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। কাজেই আমাকে ক্ষমা করুন। (সুনান তিরমিজি: ৩৫১৩)

শবে কদরের আগাগোড়া হলো শান্তি, যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। যখন কোনো বান্দা অনুতপ্ত হয়ে অশ্রুবিজড়িত চোখে ক্ষমা চায়, আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হয়ে সেই বান্দার যাবতীয় পাপ আমলনামা থেকে মুছে দেন। তাই এই বরকতময় রাতে অলসতা না করে মুনাজাত ও চোখের পানির মাধ্যমে মহান রবের সান্নিধ্য অর্জন করা প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর