শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

জাকাত কাদের দেওয়া যাবে, কাদের যাবে না?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০ মার্চ ২০২৬, ০৩:৩২ পিএম

শেয়ার করুন:

জাকাত কাদের দেওয়া যাবে, কাদের যাবে না?

ইসলামের পাঁচ ভিত্তির অন্যতম হলো জাকাত। নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলিমদের ওপর জাকাত আদায় করা ফরজ। জাকাত গরিবের প্রতি করুণা নয়; বরং এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। তবে জাকাতের অর্থ যাকে-তাকে বা যেকোনো ভালো কাজে ব্যয় করার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে জাকাত ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট খাত দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে জাকাত দিলে আদায় হবে না।
ইসলামি শরিয়তের আলোকে জাকাত কাদের দেওয়া যাবে এবং কাদের দেওয়া যাবে না- তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-

জাকাত যাদের দেওয়া যাবে (জাকাতের ৮টি খাত)

পবিত্র কোরআনের সুরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে জাকাত ব্যয়ের ৮টি খাতের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। খাতগুলো হলো-
১. ফকির (নিঃস্ব): এমন ব্যক্তি, যার বেঁচে থাকার মতো সম্বল নেই বা খুব সামান্য। অর্থাৎ যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এবং জীবনধারণের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল।
২. মিসকিন (অভাবী): এমন অভাবী ব্যক্তি, যার রোজগার তার নিজের এবং তার ওপর নির্ভরশীলদের অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়; কিন্তু আত্মসম্মানবোধের কারণে অন্যের কাছে হাত পাতে না।
৩. জাকাত আদায়কারী (আমিলিন): ইসলামি রাষ্ট্র কর্তৃক জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের বেতন জাকাতের ফান্ড থেকে দেওয়া যাবে। শরিয়ত নির্দিষ্ট জাকাত উসুলকারী আমেল। এটা ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধান দ্বারা নিযুক্ত হতে হবে। নিজে নিজে মনে করে নিলে হবে না। (জাওয়াহিরুল ফিকহ: ৬/৬৯)
৪. মন জয় করার জন্য (মুয়াল্লাফাতুল কুলুব): সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী কোনো ব্যক্তির চিত্তাকর্ষণের জন্য অথবা ইসলাম গ্রহণ করতে ইচ্ছুক কোনো অমুসলিমকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে জাকাত দেওয়া যায়। তবে, এ বিধানটিও রহিত হয়ে গেছে। বর্তমানে কোনো ধনী নওমুসলিমকে জাকাত প্রদান জায়েজ নয়। (হেদায়া: ১/১৮৪, মারেফুল কোরআন: ৪/১৭১)
৫. দাসমুক্তির জন্য (রিকাব): চুক্তিবদ্ধ দাসকে তার মালিকের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য বা মুক্তিপণ হিসেবে জাকাতের অর্থ দেওয়া যাবে। বর্তমান যুগে দাসের প্রচলন নেই, তাই এই খাতটিও অপ্রচলিত।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: এমন ব্যক্তি যিনি এত পরিমাণ ঋণগ্রস্ত যে, ঋণ পরিশোধ করার পর তার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে না। এমন ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করার জন্য জাকাত দেওয়া যাবে।
৭. আল্লাহর রাস্তায় (ফি সাবিলিল্লাহ): যারা আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজে সক্রিয়ভাবে নিয়োজিত। ইসলামি স্কলারদের মতে, জিহাদে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদ এবং দ্বীন শিক্ষার কাজে নিয়োজিত দরিদ্র শিক্ষার্থীদের এই খাত থেকে জাকাত দেওয়া যাবে।
৮. বিপদগ্রস্ত মুসাফির: কোনো ব্যক্তি যদি সফরে গিয়ে সম্পদহীন বা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং বাড়িতে পৌঁছানোর মতো অর্থ তার কাছে না থাকে, তবে তাকে প্রয়োজন পূরণের জন্য জাকাত দেওয়া যাবে। (তার নিজ বাড়িতে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেও তাকে দেওয়া যাবে)।

আরও পড়ুন
যাদের জাকাত দিলে আদায় হবে না
যেসব সম্পদের জাকাত দিতে হবে না
যেসব সম্পদের জাকাত দেওয়া ফরজ
কিছু স্বর্ণ কিছু রুপা থাকলে কোন হিসাবে জাকাত দেবেন?

জাকাত যাদের দেওয়া যাবে না

এমন কিছু ব্যক্তি ও খাত রয়েছে, যেখানে জাকাতের অর্থ ব্যয় করলে জাকাত আদায় হবে না। সেগুলো হলো-
১. ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন আত্মীয়: নিজের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি (ঊর্ধ্বতন) এবং নিজের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি বা তাদের সন্তানদের (অধস্তন) জাকাত দেওয়া যায় না।
২. স্বামী-স্ত্রী: স্বামী তার স্ত্রীকে এবং স্ত্রী তার স্বামীকে জাকাত দিতে পারবেন না।
৩. ধনী বা নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক: যার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তাকে জাকাত দেওয়া জায়েজ নেই।
৪. সৈয়দ বংশের লোক: রাসুলুল্লাহ (স.)-এর বংশধর অর্থাৎ বনু হাশেমের জন্য জাকাত গ্রহণ করা জায়েজ নয় বলে অধিকাংশ ফকিহ মত দিয়েছেন। তবে তাদের সাধারণ দান-সদকা বা উপহার দেওয়া যাবে।
৫. অমুসলিম: জাকাত কেবল মুসলিম গরিব-দুঃখীদের অধিকার। সাধারণ কোনো অমুসলিমকে জাকাতের অর্থ দেওয়া জায়েজ নেই। তবে সাধারণ দান বা নফল সদকা অমুসলিমদের দেওয়া যায়।
৬. মসজিদ, মাদরাসা ও জনকল্যাণমূলক কাজ: জাকাত আদায়ের প্রধান শর্ত হলো ‘তামলিক’ বা কোনো ব্যক্তিকে মালিক বানিয়ে দেওয়া। তাই মসজিদ, মাদরাসা নির্মাণ, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, ব্রিজ তৈরি বা কূপ খননের মতো জনকল্যাণমূলক কাজে সরাসরি জাকাতের টাকা দেওয়া যায় না। (তবে মাদরাসার গরিব ফান্ডে বা লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দেওয়া যাবে, যেখান থেকে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মালিক বানিয়ে দেওয়া হয়)।
৭. কর্মচারীর বেতন বা সেবার প্রতিদান: কাজের লোক, গৃহভৃত্য বা কোনো কর্মচারীকে তাদের সেবার পারিশ্রমিক বা মজুরির বিকল্প হিসেবে জাকাতের টাকা দেওয়া যাবে না। তবে তাদের ন্যায্য বেতনের বাইরে আলাদাভাবে জাকাতের নিয়তে অনুদান বা উপহার হিসেবে দিলে জাকাত আদায় হবে।
৮. মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফন বা ঋণ: মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের খরচ জাকাতের টাকা থেকে মেটানো যাবে না এবং মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ঋণও জাকাত থেকে পরিশোধ করা যাবে না; কারণ, এখানে মৃত ব্যক্তিকে সম্পদের মালিক বানানো সম্ভব নয়।


বিজ্ঞাপন


জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে নিজ দরিদ্র আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম। এতে জাকাত আদায় ও আত্মীয়তা রক্ষার দ্বিগুণ সওয়াব মেলে। তবে বিতরণের আগে খাতগুলো সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রতিটি মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর