পবিত্র রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ এক বিশেষ ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। ইতেকাফের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো- প্রাকৃতিক বা শরিয়তসম্মত প্রয়োজন ছাড়া মসজিদের সীমানার বাইরে না যাওয়া। তবে বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে অনেকেই একা বা ব্যাচেলর হিসেবে বসবাস করেন, যাদের জন্য মসজিদে খাবার পৌঁছে দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে ইতেকাফকারী কি নিজে খাবার আনতে বাইরে যেতে পারবেন? ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে এর অত্যন্ত বাস্তবসম্মত সমাধান রয়েছে।
অনিবার্য প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার বিধান
ইসলামি শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, বিনা প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হলে ইতেকাফ ভেঙে যায়। তবে শরিয়ত মানুষের সাধ্যাতীত কোনো বোঝা চাপিয়ে দেয় না। ইতেকাফকারীর যদি এমন কোনো সাহায্যকারী না থাকে যে তাঁর কাছে খাবার পৌঁছে দেবে, তাহলে খাবার সংগ্রহের জন্য তিনি নিজে বাইরে বা বাসায় যেতে পারবেন। ফিকহি পরিভাষায় একে ‘হাজাতে তাবিয়্যাহ’ বা স্বাভাবিক ও অনিবার্য প্রয়োজন হিসেবে গণ্য করা হয়। এক্ষেত্রে ইতেকাফ নষ্ট হবে না।
খাবার সংগ্রহের শর্ত ও সতর্কতা
খাবার আনতে বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইতেকাফকারীকে কিছু কঠোর নিয়ম অনুসরণ করতে হয়-
১. বিলম্ব না করা: খাবার সংগ্রহের জন্য মসজিদ থেকে বের হয়ে অন্যকোনো কাজে সময় ব্যয় করা যাবে না। অন্যকোনো পার্থিব কাজে সামান্য সময় ব্যয় করলেও ইতেকাফ ভেঙে যাবে।
২. খাবারের জন্য অপেক্ষা: যদি বাসায় যাওয়ার পর দেখা যায় খাবার এখনো তৈরি হয়নি, তবে খাবার প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করা জায়েজ। এতে ইতেকাফের ক্ষতি হবে না। (আলবাহরুর রায়েক: ২/৩০৩)।
৩. বাইরে না খাওয়া: খাবার সংগ্রহ করে দ্রুত মসজিদে ফিরে আসতে হবে এবং মসজিদের ভেতরেই খাবার গ্রহণ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
পথ চলতে চলতে কথা বলা বা কুশলাদি বিনিময়
প্রাকৃতিক প্রয়োজনে (যেমন টয়লেটে যাওয়া বা খাবার আনা) বাইরে যাওয়ার সময় পথ চলতে চলতে অন্যকে সালাম দেওয়া বা কুশলাদি জিজ্ঞেস করা জায়েজ। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হলো- থেমে যাওয়া বা রাস্তায় দাঁড়ানো যাবে না।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (স.) ইতেকাফ অবস্থায় চলতে চলতে রোগীর কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন, তবে এজন্য তিনি রাস্তায় দাঁড়াতেন না।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৪৭২) সুতরাং, শুধুমাত্র কথা বলার জন্য বা কুশল বিনিময়ের জন্য অল্প সময় দাঁড়ালেও ইতেকাফ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
আধুনিক শহরজীবনের সমাধান
শহরাঞ্চলে বর্তমানে ফুড ডেলিভারি অ্যাপের সুবিধাও রয়েছে। এক্ষেত্রে ইতেকাফকারী মসজিদে বসেই খাবার অর্ডার করতে পারেন। তবে খাবার গ্রহণের সময় তাঁকে মসজিদের প্রধান ফটক বা সীমানার ভেতর থেকেই তা গ্রহণ করতে হবে। অযথা রাস্তার ওপর গিয়ে ডেলিভারি ম্যানের জন্য অপেক্ষা করা বা দাঁড়িয়ে থাকা পরিহার করতে হবে।
ইতেকাফ হলো রবের দুয়ারে পড়ে থাকার নাম। শরিয়ত অনিবার্য প্রয়োজনে খাবার সংগ্রহের অনুমতি দিলেও ইবাদতের একাগ্রতা বজায় রাখতে ইতেকাফে বসার আগেই খাবারের বিষয়ে যতটা সম্ভব ব্যবস্থা করে রাখা উত্তম। তবে একাকী বা ব্যাচেলরদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত খাবার সংগ্রহ করে ফিরে আসলে ইতেকাফের কোনো ক্ষতি হবে না, ইনশাআল্লাহ।
বাদায়েউস সানায়ে: ২/১১৪; আবু দাউদ: ২৪৭২; আলবাহরুর রায়েক: ২/৩০৩; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১২১; রদ্দুল মুখতার: ২/৪৫০)




