বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

জাকাত হিসাবের ভুল এড়াতে ৭টি জরুরি ফিকহি গাইডলাইন

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ মার্চ ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

জাকাত হিসাবের ভুল এড়াতে ৭টি জরুরি ফিকহি গাইডলাইন

জাকাত ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। সঠিক নিয়মে জাকাত আদায় করা যেমন ফরজ ইবাদত, তেমনি এর হিসাবে সামান্য ভুল হলে একজন অভাবী মানুষের হক নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপনার সম্পদ ও ঋণের নিখুঁত সমন্বয় করে জাকাত হিসাব করার জন্য ৭টি অতি জরুরি ফিকহি গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো।

১. নিসাব নির্ধারণে ‘দরিদ্রের কল্যাণ’ নীতি

জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নিসাব থাকা শর্ত। শরিয়ত অনুযায়ী স্বর্ণের নিসাব ৭.৫ ভরি এবং রুপার নিসাব ৫২.৫ ভরি। সমসাময়িক আলেমদের একটি বড় অংশ দরিদ্রের স্বার্থে (আনফা লিল ফুকারা) রুপার নিসাবকে মানদণ্ড হিসেবে ধরার পরামর্শ দেন। কারণ এতে জাকাতের পরিধি বাড়ে এবং অভাবী মানুষ বেশি উপকৃত হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য আলেমের ব্যক্তিগত পরামর্শ গ্রহণ করা উত্তম।

২. ক্যালেন্ডার ভেদে জাকাতের হারের পার্থক্য

জাকাত মূলত চান্দ্রবর্ষ বা হিজরি সনের (৩৫৪ দিন) ভিত্তিতে হিসাব করা ফরজ।
হিজরি বছর অনুযায়ী: জাকাতের হার মোট সম্পদের ২.৫% (৪০ ভাগের ১ ভাগ)।
সৌর/ইংরেজি বছর অনুযায়ী: কেউ যদি ইংরেজি ক্যালেন্ডার (৩৬৫ দিন) অনুসরণ করেন, তবে বছর ১০-১১ দিন বেশি হওয়ার কারণে তাকে ২.৫৮% হারে জাকাত প্রদান করতে হবে। ফিকহি নির্ভুলতার জন্য এই পার্থক্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন: জাকাতের বছর পূর্ণের তারিখ মনে না থাকলে করণীয়


বিজ্ঞাপন


৩. শেয়ার বাজারের জটিলতা ও নিরাপদ সমাধান

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দুটি দিক রয়েছে। যদি লভ্যাংশ অর্জনের উদ্দেশ্যে শেয়ার কেনা হয়, তবে কোম্পানির ব্যালেন্সশিট থেকে ‘নিট জাকাতযোগ্য সম্পদ’ বের করে তার ওপর জাকাত দিতে হয়। তবে বাস্তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে ব্যালেন্সশিট বিশ্লেষণ করা বেশ জটিল। সেক্ষেত্রে নিরাপদ সমাধান হলো- জাকাত বর্ষপূর্তির দিনে ওই শেয়ারের সর্বশেষ বাজারমূল্যের (Market Value) ওপর ভিত্তি করে জাকাত হিসাব করা। এতে দায়মুক্ত হওয়া সহজ হয়।

৪. ক্রয়মূল্য নয়, বর্তমান বিক্রয়মূল্য ধরা

জাকাতযোগ্য সব সম্পদের ক্ষেত্রে (স্বর্ণ-রুপা, ব্যবসায়িক পণ্য, প্লট বা ফ্ল্যাট) ক্রয়মূল্য ধর্তব্য নয়। বরং যেদিন জাকাত হিসাব করছেন, সেদিন ওই সম্পদ বাজারে বিক্রি করলে যে মূল্য পাওয়া যেত (Selling Price), সেই বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী হিসাব করতে হবে।

আরও পড়ুন: জাকাতের উপযুক্ত কারা? আত্মীয়-স্বজনদের জাকাত দেওয়ার বিধান কী?

৫. আধুনিক বিনিয়োগ ও জামানতের হিসাব

জাকাতযোগ্য সম্পদের তালিকায় অনেক সময় আমরা আধুনিক কিছু খাত বাদ দিয়ে ফেলি।
সঞ্চয়পত্র ও বন্ড: সঞ্চয়পত্র, বন্ড বা ট্রেজারি বিলের ক্ষেত্রে তার আসল বা ক্রয়মূল্যের ওপর জাকাত আসবে।
ফেরতযোগ্য জামানত: বাড়ি বা দোকান ভাড়ার সময় যে সিকিউরিটি মানি বা জামানত দেওয়া হয়, তা যেহেতু মালিককে এক সময় ফেরত দিতে হবে, তাই দাতার জন্য ওই টাকার জাকাত হিসাব করা আবশ্যক।
প্রভিডেন্ট ফান্ড: ঐচ্ছিক প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমানো বেতনের অর্থের ওপরও জাকাত হিসাব করতে হবে।

৬. ঋণ বিয়োগের সঠিক নিয়ম ও সীমাবদ্ধতা

সব ধরনের ঋণ জাকাত থেকে বিয়োগ করা যায় না। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী-
শুধুমাত্র ওই ঋণের অংশটুকু জাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বাদ যাবে, যা আগামী এক বছরের (১২ মাস) মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
কর্মচারীদের বকেয়া বেতন, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল বা স্ত্রীর অনাদায়ী মোহর (যা পরিশোধের দৃঢ় ইচ্ছা আছে) জাকাতযোগ্য সম্পদ থেকে বিয়োগ করা যাবে।

আরও পড়ুন: জাকাত কাকে দেওয়া যাবে, কাকে যাবে না?

৭. ব্যবসায়িক ঋণের ক্ষেত্রে সতর্কতা

যদি কোনো ব্যবসায়ীর ঋণের পরিমাণ তার জাকাতযোগ্য সম্পদের চেয়েও বেশি হয়, তবুও তাকে সতর্ক হতে হবে। কিছু ফকিহের মতে, বিপুল ব্যবসায়িক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ঋণের অজুহাতে নিজেকে দেউলিয়া দেখিয়ে জাকাত প্রদান থেকে বিরত থাকা কাম্য নয়। এ ক্ষেত্রে নিজের উৎপাদনশীল ও জাকাতযোগ্য সম্পদের পূর্ণ হিসাব করে জাকাত প্রদান করা তাকওয়ার পরিচায়ক।

জাকাত কেবল একটি গাণিতিক হিসাব নয়, এটি একটি আর্থিক ইবাদত। হিসাবের সময় ২.৫% বা ২.৫৮% যা-ই প্রযোজ্য হোক, তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করে এবং সন্দেহ হলে কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

বি.দ্র. ব্যক্তিগত বা জটিল আর্থিক অবস্থার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

তথ্যসূত্র: 
ফতোয়ায়ে শামি: খণ্ড-৩, জাকাত অধ্যায়
২. বাদায়েউস সানায়ে: খণ্ড-২, নিসাব ও শর্তাবলি
৩. আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু (ড. ওয়াহবা যুহাইলি): খণ্ড-৩, আধুনিক জাকাত মাসায়েল
৪. আলমগিরি: খণ্ড-১, জাকাত পরিচ্ছেদ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর