বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

‘রমজান কারিম’ না ‘রমজান মোবারক’ কোনটি বলা উত্তম?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম

শেয়ার করুন:

‘রমজান কারিম’ না ‘রমজান মোবারক’ কোনটি বলা উত্তম?

বরকতময় মাস রমজান এলে মুসলিম বিশ্বে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ধ্বনি শোনা যায়- ‘রমজান মোবারক’ ও ‘রমজান কারিম’। কিন্তু কোনটি বলা অধিক যুক্তিযুক্ত ও সুন্নাহসম্মত—এ প্রশ্ন অনেকের মনে জাগে। ভাষাগত বিশ্লেষণ, হাদিসের দলিল ও আলেমদের মতামতের আলোকে বিষয়টি নিচে পর্যালোচনা করা হলো।

শব্দগত অর্থ ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

রমজানের শুভেচ্ছায় ব্যবহৃত শব্দ দুটির অর্থের সূক্ষ্ম পার্থক্য পাঠকদের জন্য জেনে নেওয়া জরুরি-

রমজান মোবারক (Ramadan Mubarak): ‘মুবারক’ শব্দের অর্থ বরকতময় বা কল্যাণমণ্ডিত। অর্থাৎ এ বাক্যের মাধ্যমে দোয়া করা হয়-আপনার রমজান মাসটি বরকত, রহমত ও ক্ষমার আধার হোক। আরবি দোয়ার শুভেচ্ছার ধাঁচে এটি অধিক সরাসরি ও অর্থবহ।

রমজান কারিম (Ramadan Kareem): ‘কারিম’ শব্দের অর্থ উদার বা মহানুভব। এখানে রমজান মাসে আল্লাহর পক্ষ থেকে অশেষ দয়া, সওয়াব ও অনুগ্রহ বর্ষণের প্রাচুর্যকে রূপক অর্থে সম্মান জানানো হয়।

ভাষাগত ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উভয় বাক্যই ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ। তবে আরব বিশ্বে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বহুজাতিক সমাজগুলোতে দুটি অভিব্যক্তিই সমানভাবে জনপ্রিয়।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় সৌদি গ্র্যান্ড মুফতির রমজানের বার্তা

হাদিসের আলোকে ‘মুবারক’ শব্দের ভিত্তি

নবীজি (স.) রমজান আগমনে সাহাবিদের সুসংবাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতেন। হাদিসে এসেছে, রমজান শুরু হলে তিনি বলতেন- ‘তোমাদের কাছে রমজান মাস এসেছে, একটি বরকতময় (মোবারাক) মাস। আল্লাহ তাআলা এ মাসে তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন...।’ (সূত্র: সুনানে নাসায়ি: ২১০৮; মুসনাদে আহমদ: ৭১৪৮)

এই বর্ণনায় স্পষ্টভাবে ‘শাহরুন মুবারাক’ (বরকতময় মাস) শব্দটি এসেছে। এই প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে আলেমদের বড় একটি অংশ অভিমত দেন যে, ‘রমজান মোবারক’ বলা নববী ভাষার অধিক নিকটবর্তী।

‘রমজান কারিম’: আলেমদের ভিন্নমত

‘রমজান কারিম’ শব্দবন্ধটি সরাসরি হাদিসে না থাকলেও এটি আরবি সাংস্কৃতিক প্রয়োগে বেশ জনপ্রিয়। এ বিষয়ে আলেমদের দুটি দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়-

১. সতর্কতামূলক মত: সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেম শায়খ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল-উসাইমিন (রহ.)-সহ কিছু ফকিহ মনে করেন, ‘কারিম’ মূলত আল্লাহর গুণবাচক বৈশিষ্ট্য; সময় বা মাস নিজে দানশীল নয়। মাসটি মূলত আল্লাহর অসীম দয়া ও দানের একটি মাধ্যম মাত্র। তাই তাঁদের মতে, ‘রমজান মোবারক’ বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত ও আকিদাগতভাবে নিরাপদ। (সূত্র: ফতোয়া ইবনে উসাইমিন, খণ্ড ২০/২৫৪)

আরও পড়ুন: রমজানের ৬ শিক্ষা ধারণ করলে জীবন হবে আলোকময়

২. অনুমোদনকারী মত: অধিকাংশ আলেমের মতে, এখানে ‘কারিম’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এমন এক মাস, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্মান ও প্রাচুর্য বয়ে আনে। আরবি ভাষায় সম্মান প্রকাশে ‘কারিম’ ব্যবহারের দৃষ্টান্ত রয়েছে যেমন ‘আল-কোরআনুল কারিম’। তাই এতে কোনো ভুল আকিদা বা নিষিদ্ধ অর্থ নেই।

শুভেচ্ছা বিনিময় ও শিষ্টাচার

রমজানের চাঁদ দেখার ঘোষণা আসার পর সেই সন্ধ্যা থেকেই শুভেচ্ছা বিনিময় শুরু করা উত্তম। পুরো মাসজুড়েই এই অভিবাদন জানানো বৈধ। মাস শেষে এই শুভেচ্ছা পরিবর্তিত হয়ে হয়- ‘ঈদ মোবারক’।

ঈদের সময় সাহাবায়ে কেরামদের একটি দোয়া পড়া প্রসিদ্ধ ছিল- ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’ (অর্থাৎ: আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন)। (সূত্র: ফাতহুল বারি, খণ্ড ২/৪৪৬)

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: কোনটি বেছে নেবেন?

সার্বিক দলিল ও ভাষাগত বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতে নিচের বিষয়গুলো স্পষ্ট-

সুন্নাহর নিকটবর্তী: ‘রমজান মোবারক’ শব্দটি হাদিসের শব্দের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি একটি দোয়া।

সাংস্কৃতিক গ্রহণযোগ্যতা: ‘রমজান কারিম’ আরব সংস্কৃতিতে বহুল ব্যবহৃত এবং রূপক অর্থে এটি বলায় কোনো ধর্মীয় বাধা নেই।

মূল লক্ষ্য: শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্কে না জড়িয়ে আন্তরিকতা ও ভ্রাতৃত্বের মনোভাব নিয়ে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা।

মোটকথা, ‘রমজান মোবারক’ ও ‘রমজান কারিম’ দুটি অভিব্যক্তিই মুসলিম সমাজে প্রচলিত ও গ্রহণযোগ্য। নববী ভাষার অনুসরণে ‘মুবারক’ শব্দটি অধিক প্রামাণ্য ভিত্তিসম্পন্ন হলেও, ‘কারিম’ বলাতেও শরিয়তসম্মত কোনো বাধা নেই। এই মোবারক মাস আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাস হোক- এটাই হোক আমাদের মূল প্রার্থনা।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর