সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

অশ্লীলতার সয়লাব ও মহান আল্লাহর আত্মমর্যাদা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

শেয়ার করুন:

অশ্লীলতার সয়লাব ও মহান আল্লাহর আত্মমর্যাদা

মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার শালীনতা ও লজ্জাশীলতায়। ইসলামে ‘হায়া’ বা লজ্জাকে কেবল একটি চারিত্রিক গুণ নয়, বরং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অথচ আধুনিকতার ছদ্মাবরণে সমাজে আজ বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা উদ্বেগজনক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে অশ্লীলতা শুধু ব্যক্তিগত চরিত্রকেই কলুষিত করে না; বরং এটি আল্লাহ তাআলার আত্মমর্যাদা বা ‘গাইরত’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সামষ্টিকভাবে সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনে।

কোরআনের নিষেধাজ্ঞা

মহান আল্লাহ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের অশ্লীলতাকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, আমার রব প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপকাজ, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন নিষিদ্ধ করেছেন…।’ (সুরা আরাফ: ৩৩) এই আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয়, নির্লজ্জতাকে সভ্যতা বা অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা মূলত আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল।

আল্লাহর আত্মমর্যাদা (গাইরত) ও বেহায়াপনা

হাদিসে আল্লাহ তাআলার ‘গাইরত’ বা আত্মমর্যাদার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর চেয়ে বেশি গাইরতসম্পন্ন আর কেউ নেই। এ কারণেই তিনি প্রকাশ্য ও গোপন সব ধরনের অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন।’ (সহিহ বুখারি)। বর্তমান যুগে ডিজিটাল মাধ্যমে অশ্লীলতার সহজলভ্যতা আল্লাহর এই পবিত্র গাইরতের সঙ্গে এক সাংঘর্ষিক বাস্তবতা তৈরি করছে।

আরও পড়ুন: অশ্লীল কিছু চোখে পড়লে যে দোয়া পড়বেন

অশ্লীলতা ও অজানা ব্যাধির বিস্তার

সমাজে যখন প্রকাশ্যে বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল নৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে মহামারি ও এমন সব ব্যাধির আবির্ভাব ঘটে, যা পূর্ববর্তী জাতিগুলোর মধ্যে ছিল না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০১৯)

অশ্লীলতা প্রচারের কঠিন শাস্তি

যারা নিজেরা অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়ার পাশাপাশি সমাজে এর প্রসার কামনা করে বা অশালীন বিষয়বস্তু প্রচার করে, তাদের জন্য কোরআনে রয়েছে কঠোর সতর্কবার্তা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা নুর: ১৯)

লুত (আ.)-এর কওম: ইতিহাসের সতর্কবার্তা

অশ্লীলতার কারণে কোনো জাতি কীভাবে বিলীন হয়ে যায়, তার অন্যতম বড় উদাহরণ হলো লুত (আ.)-এর কওম। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতঃপর যখন আমার আদেশ এলো, আমি জনপদটিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে কঙ্কর বর্ষণ করলাম।’ (সুরা হুদ: ৮২) ইতিহাস প্রমাণ করে, নৈতিক অবক্ষয় ও অশ্লীলতা কোনো সভ্যতাকেই টিকিয়ে রাখতে পারেনি।

আরও পড়ুন: লুত (আ.)-এর কাছে পুরুষের বেশে আসা ফেরেশতাদের ঘটনা

সাংস্কৃতিক অবক্ষয় ও কেয়ামতের আলামত

রাসুলুল্লাহ (স.) ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থার কিছু বিপর্যয়কে কেয়ামতের আলামত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র ও মদ্যপান ব্যাপক হয়ে যাবে, তখন ভূমিধস, বিকৃতি ও উপর থেকে নিক্ষেপ করে ধ্বংস করার শাস্তি আসবে।’ (তিরমিজি) আজ বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে যে নগ্নতা ছড়িয়ে পড়ছে, তা মূলত সেই ভয়াবহ পরিণতিরই ইঙ্গিত।

মুক্তির পথ: তওবা ও লজ্জাশীলতা

বেহায়াপনা ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ হলো কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা নুর: ৩১) ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে লজ্জাশীলতা ও তাকওয়ার চর্চাই আমাদের নৈতিক মুক্তি এনে দিতে পারে।

বেহায়াপনা কোনোভাবেই প্রগতি বা আধুনিকতার প্রতীক হতে পারে না; বরং এটি ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই আত্মবিনাশের পথ। যে সভ্যতা শালীনতা হারায়, সে সভ্যতার পতন অনিবার্য। তাই শালীনতা, লজ্জাশীলতা ও আল্লাহভীতি বজায় রাখাই দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ লাভের একমাত্র উপায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সমাজকে অশ্লীলতার সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর