বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

শবে বরাত: ভাগ্য নির্ধারণ নাকি ক্ষমার রাত?

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

শবে বরাত: ভাগ্য নির্ধারণ নাকি ক্ষমার রাত?

শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত। উপমহাদেশীয় মুসলিম সমাজে এটি ‘শবে বরাত’ বা ‘ভাগ্য রজনী’ হিসেবে বহুল পরিচিত। দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বাস করা হয় যে, এ রাতেই পরবর্তী এক বছরের রিজিক, জন্ম-মৃত্যু ও ভাগ্য নির্ধারিত হয়। কিন্তু ইসলামের মৌলিক উৎস কোরআন ও সহিহ হাদিসের মানদণ্ডে এই রাতের প্রকৃত পরিচয় কী? এটি কি কেবলই ভাগ্য নির্ধারণের রাত, নাকি এর চেয়েও বড় কোনো প্রাপ্তি অর্থাৎ ‘ক্ষমা’ অর্জনের মহেন্দ্রক্ষণ?

ভাগ্য নির্ধারণ নিয়ে বিভ্রান্তি ও প্রকৃত সত্য

আমাদের দেশে শবে বরাতকে ‘ভাগ্য রজনী’ বলার পেছনে সুরা দুখানের ৩–৪ নম্বর আয়াতের একটি বিশেষ ব্যাখ্যা কাজ করে। যেখানে বলা হয়েছে- ‘নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে… এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।’ (সুরা দুখান: ৩-৪)

তবে অধিকাংশ মুফাসসির ও হাদিস বিশারদদের মতে, এখানে ‘মুবারক রজনী’ বলতে ‘লাইলাতুল কদর’ বা কদরের রাতকে বোঝানো হয়েছে। ইমাম তাবারি (রহ.)-এর মতে, যেহেতু কোরআন রমজান মাসে নাজিল হয়েছে (সুরা বাকারা: ১৮৫), তাই ভাগ্য নির্ধারণের চূড়ান্ত কাজ কদরের রাতেই সম্পন্ন হয়। (তাফসির তাবারি: ২৫/১০৭)

সে হিসেবে শবে বরাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত বলা দালিলিক দিক থেকে দুর্বল।

আরও পড়ুন: শবে বরাতে মানুষকে খাওয়ানোর বিধান কী


বিজ্ঞাপন


তবে কেন এই রাত গুরুত্বপূর্ণ?

ভাগ্য নির্ধারণের রাত না হলেও শবে বরাত সাধারণ কোনো রাত নয়। হাদিসের ভাষায় এটি হলো- ‘ক্ষমার রাত’। বিশুদ্ধ হাদিস অনুযায়ী, এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া সবাইকে ব্যাপকভাবে ক্ষমা করে দেন (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)। অর্থাৎ এটি হলো পাপিষ্ঠ বান্দার জন্য রেকর্ড সংশোধনের রাত।

চোখের পানিতে যেভাবে বদলায় ‘তকদির’

শবে বরাতে ভাগ্য লেখা না হলেও, এ রাতে মানুষের ‘তাকদিরে মুআল্লাক’ বা ‘ঝুলন্ত ভাগ্য’ পরিবর্তনের একটি পথ খোলা থাকে। আলেমদের মতে, কিছু বিষয় আল্লাহর জ্ঞানে চূড়ান্ত (তাকদিরে মুবরাম), যা বদলায় না। কিন্তু কিছু বিষয় বান্দার দোয়ার ওপর ঝুলন্ত থাকে।

রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘দোয়া ছাড়া আর কোনো কিছুই তকদির পরিবর্তন করতে পারে না। (তিরমিজি: ২/২১৩৯) তাই দোয়া ও অনুতাপের মাধ্যমে এই রাতটি তকদিরে মুআল্লাক পরিবর্তনের এক বিশেষ সুযোগ হয়ে ওঠে। শবে বরাতের শেষ প্রহরে বান্দা যখন অনুতপ্ত হয়ে চোখের পানি ফেলে আল্লাহর কাছে আবেদন জানায়, তখন সেই অশ্রুর বিনিময়ে তার অনাগত দিনের বিপদ বা দুর্ভাগ্য দূর হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

আরও পড়ুন: শবে বরাতে পড়ার মতো ২ গুরুত্বপূর্ণ ইস্তেগফার -

বান্দার করণীয়

শবে বরাতে নফল ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বা বিশেষ নিয়ম নেই। তবে দীর্ঘ সেজদা ও দীর্ঘ কেরাতে নামাজ পড়া এবং আল্লাহর কাছে একান্তভাবে রোনাজারি করা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত। বিশেষ করে রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, যখন আল্লাহ পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন- কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। কে আছে এমন যে, আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দিব। কে আছে এমন আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারি: ১১৪৫) শবে বরাতের রাতে সেই বরকত লাভে সচেষ্ট হওয়া এবং নফল নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য খোজা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।

এই রহমতের রাতেও যারা বঞ্চিত

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু শ্রেণির মানুষ তাওবা না করা পর্যন্ত এই সাধারণ ক্ষমা থেকে বঞ্চিত থাকে। তারা হলেন-

  • মুশরিক ও অন্যের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণকারী।
  • আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।
  • পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান।
  • মদ্যপায়ী ও অন্যায়ভাবে হত্যাকারী।

আরও পড়ুন: শবে বরাতে ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো জেনে রাখুন

ইবাদত: সুন্নাহ বনাম কুসংস্কার

শবে বরাতের সুন্নাহসম্মত আমল হলো- নিভৃতে ইবাদত, দীর্ঘ সেজদায় নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত এবং দিনের বেলা নফল রোজা রাখা। কিন্তু এই রাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, মাত্রাতিরিক্ত আলোকসজ্জা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো খাবারকে ইবাদতের অংশ মনে করা কুসংস্কার ও বিদআত।

শবে বরাত ভাগ্য নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক কোনো উৎসব নয়, বরং এটি হলো রবের কাছে নিজেকে সমর্পণের রাত। এটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজের ‘ঝুলন্ত তকদির’কে কল্যাণের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়ার অনন্য সুযোগ। তাই আনুষ্ঠানিকতার পেছনে না ছুটে, এক ফোঁটা চোখের পানির মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমা অর্জন করাই হোক এ রাতের মূল লক্ষ্য।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর