ইসলামের বারো মাসের ধারায় শাবান মাস হলো পবিত্র রমজানের প্রস্তুতির মাস। এই মাসের মধ্যভাগের মহিমান্বিত রাতটি মুসলিম সমাজে পরিচিত ‘শবে বরাত’ নামে। হাদিসের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যরজনী। আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক অনন্য সুযোগ নিয়ে আসে এই বরকতময় রাত। এই রাতকে ঘিরে ইসলামের দিকনির্দেশনা ও করণীয়গুলো জেনে নেওয়া জরুরি।
শবে বরাত: নাম ও অর্থের তাৎপর্য
‘শবে বরাত’ শব্দটি ফার্সি ও আরবি দুই ভাষার সমন্বয়। ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাআত’ অর্থ মুক্তি বা দায়মুক্তি। অর্থাৎ শবে বরাত মানে মুক্তির রাত। যদিও হাদিসে সরাসরি এই নাম ব্যবহৃত হয়নি, তবে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ হিসেবে এ রাতের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। এ রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত ও মাগফিরাত নাজিল করেন।
শবে বরাতের ফজিলত: হাদিসের আলোকে
একাধিক সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসে শবে বরাতের ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
১. সাহাবি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন- ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৯০)
বিজ্ঞাপন
২. উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (স.) এ রাতে দীর্ঘ সময় সেজদায় থেকে নামাজ আদায় করতেন এবং উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। (শুআবুল ঈমান, বায়হাকি)
আরও পড়ুন: শবে বরাতেও ক্ষমা পাবে না যারা
শবে বরাতের ৬টি ফজিলতপূর্ণ আমল
এই বরকতময় রাতে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করাই সুন্নাহসম্মত। উল্লেখযোগ্য কিছু আমল হলো-
১. তাওবা ও ইস্তেগফার: অতীতের গুনাহের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা।
২. নফল নামাজ: সক্ষমতা অনুযায়ী নফল নামাজ আদায় করা। তবে নির্দিষ্ট কোনো রাকাত সংখ্যা বা নিয়ম নেই।
৩. কোরআন তেলাওয়াত: অর্থসহ কোরআন তেলাওয়াত করা, যা রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৪. জিকির ও দরুদ পাঠ: বেশি বেশি তাসবিহ পাঠ ও নবী (স.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা।
৫. ১৫ই শাবানের নফল রোজা: শবে বরাতের তারিখ আইয়ামে বিজের অন্তর্ভুক্ত। সেই হিসেবে ১৫ শাবান (শবে বরাতের দিন) রোজা রাখা সুন্নত। তবে, ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ তিনটি রোজা রাখাই সর্বোত্তম।
৬. অন্তর পবিত্র রাখা: আমল কবুলের পূর্বশর্ত হিসেবে অন্যের প্রতি ঘৃণা বা শত্রুতা পরিহার করা।
আরও পড়ুন: শিরক থেকে বেঁচে থাকার পুরস্কার
যে সব ব্যক্তি এ রাতেও ক্ষমা পায় না
একাধিক হাদিসের ঘোষণা অনুযায়ী, কিছু মানুষ এই রাতের ব্যাপক ক্ষমা থেকেও বঞ্চিত থাকে, যতক্ষণ না তারা তাওবা করে ফিরে আসে। যেমন-
- মুশরিক (আল্লাহর সঙ্গে শরিককারী)
- বিদ্বেষ ও হিংসা পোষণকারী
- আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী
- পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান
- মদ্যপায়ী ও অন্যায়ভাবে হত্যাকারী
ইবাদতে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে নফল ইবাদত গোপনে ও একাকী করাই উত্তম। শবে বরাতে ফরজ নামাজ (মাগরিব, এশা ও ফজর) অবশ্যই জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। তবে নফল ইবাদতের জন্য সমবেত অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের কোনো প্রমাণ সাহাবায়ে কেরাম বা তাবেয়িনদের যুগে পাওয়া যায় না।
বর্জনীয় কুসংস্কার ও অনৈসলামিক চর্চা
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি-
- আতশবাজি ও পটকা ফাটানো।
- অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা।
- বিশেষ খাবারকে ইবাদতের অংশ মনে করা।
- মাইক ব্যবহার করে উচ্চশব্দে ইবাদত করা, যা অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।
শবে বরাত আমাদের জন্য আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহাসুযোগ। অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা পরিহার করে বিশুদ্ধ আমলের মাধ্যমে এ রাতের বরকত ও মাগফিরাত অর্জন করাই হোক আমাদের লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত রাতের যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফিক দান করেন। আমিন।

