শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ইউসুফ (আ.)-এর চারিত্রিক শুভ্রতা: জুলাইখার আসক্তি ও এক অলৌকিক সাক্ষ্য

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

ইউসুফ (আ.)-এর চারিত্রিক শুভ্রতা: জুলাইখার আসক্তি ও এক অলৌকিক সাক্ষ্য
প্রতীকী ছবি: এআই

ইতিহাসের পাতায় হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনী পবিত্রতা, ধৈর্য ও চারিত্রিক দৃঢ়তার এক অনন্য উপাখ্যান। মিসরের আজিজের স্ত্রী জুলাইখার অপবাদ থেকে মুক্ত হয়ে তিনি যে নিষ্কলঙ্ক চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মুমিনদের জন্য এক আলোকবর্তিকা। তাঁর এই নির্দোষ প্রমাণের প্রক্রিয়াটি ছিল যেমন যৌক্তিক, তেমনি অলৌকিক।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পরীক্ষার মুহূর্ত

মিসরের তৎকালীন মন্ত্রী আজিজে মিসর কিতফির-এর স্ত্রী জুলাইখা ইউসুফ (আ.)-এর রূপে বিমোহিত হয়ে পড়েন। তিনি নিজের মনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউসুফ (আ.)-কে পাপকাজে লিপ্ত হওয়ার আহ্বান জানান। ইউসুফ (আ.) আল্লাহর ভয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কিছু বর্ণনায় উল্লেখ আছে, জুলাইখা তাঁকে বশে আনতে নানাভাবে চেষ্টা করেছিলেন। একদিন ঘরে একা পেয়ে জুলাইখা দরজা বন্ধ করে দেন এবং তাঁকে পাপে লিপ্ত হওয়ার জোরাজুরি করেন। উপায় না পেয়ে ইউসুফ (আ.) বন্ধ দরজার দিকে দৌড় দিলেন। তখন মহান আল্লাহর কুদরতে রুদ্ধ দ্বার খুলে গেল।
ঠিক দরজার ওপাশে আজিজে মিসর ও জুলাইখার পরিবারের একজন সদস্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। নিজেকে বাঁচাতে জুলাইখা উল্টো ইউসুফ (আ.)-এর ওপর অপবাদ আরোপ করেন এবং তাঁকে কারারুদ্ধ করার দাবি তোলেন।

আরও পড়ুন: কূপে নিঃসঙ্গ ইউসুফ (আ.): জিব্রাইলের যে বার্তা বদলে দিল সবকিছু

সেই সাক্ষী: কে ছিলেন তিনি?

ইউসুফ (আ.)-এর পবিত্রতা প্রমাণের জন্য সেখানে উপস্থিত জুলাইখার পরিবারের এক সদস্য সাক্ষ্য দেন। এই সাক্ষীর পরিচয় নিয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে দুটি প্রধান মত রয়েছে-


বিজ্ঞাপন


১. দুগ্ধপোষ্য শিশু: কিছু হাদিস ও তাফসিরকারের মতে, এই সাক্ষী ছিলেন এক দুগ্ধপোষ্য শিশু। আল্লাহ তাআলা তাঁকে অলৌকিক বাকশক্তি দান করেছিলেন এবং তিনি ইউসুফ (আ.)-এর পক্ষে কথা বলে ওঠেন। (মুসনাদে আহমদ, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)

২. প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি: আবার অনেক মুফাসসিরের মতে, তিনি ছিলেন জুলাইখার পরিবারের একজন বয়স্ক ও অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি। তিনি কোনো অলৌকিক কথা নয়, বরং যুক্তিনির্ভর তদন্তের পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন। আল্লাহই এ বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞাত।

পবিত্র কোরআনে বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে- ‘সে (ইউসুফ) বলল, সে-ই আমার থেকে অসৎ কর্ম কামনা করেছে। তখন নারীর পরিবারের এক সাক্ষী সাক্ষ্য দিল- যদি তার জামা সম্মুখ দিক থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে নারী সত্য বলেছে আর সে মিথ্যাবাদী। আর যদি তার জামা পেছন থেকে ছেঁড়া হয়ে থাকে, তবে নারী মিথ্যা বলেছে আর সে সত্যবাদী।’ (সুরা ইউসুফ: ২৬-২৭)

আরও পড়ুন: কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.) এর একটি মূল্যবান দোয়া

নির্দোষিতার প্রমাণ ও আজিজে মিসরের প্রতিক্রিয়া

তদন্তে দেখা গেল ইউসুফ (আ.)-এর জামাটি পেছন থেকে ছেঁড়া। এতে প্রমাণিত হলো যে, তিনি পালাচ্ছিলেন এবং জুলাইখা তাঁকে পেছন থেকে টেনে ধরেছিলেন। আজিজে মিসর সত্য উপলব্ধি করে বিষয়টি গোপন রাখতে এবং জুলাইখাকে নিজের পাপের জন্য আত্মসমালোচনার (ক্ষমা প্রার্থনা) নির্দেশ দেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায়- ‘হে ইউসুফ, তুমি এ বিষয়টি উপেক্ষা করো। আর হে নারী, তুমি তোমার পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তুমি অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউসুফ: ২৯)

তবে সত্য প্রকাশ পাওয়ার পরও সামাজিক মর্যাদা রক্ষা ও লোকলজ্জার ভয়ে পরবর্তীতে ইউসুফ (আ.)-কে কারাগারে পাঠানো হয়।

রাজকীয় সম্মান ও সফলতার পথ

কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর ইউসুফ (আ.) মিসরের বাদশাহর এক জটিল স্বপ্নের নির্ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করেন। এর ফলে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও বিশ্বস্ততা সবার সামনে প্রকাশ পায়। বাদশাহ তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন।

আরও পড়ুন: ইয়াকুব (আ.)-এর হৃদয়স্পর্শী দোয়া: ধৈর্য কঠিন হয়ে গেলে পড়ুন

প্রচলিত ভুল ধারণা ও প্রকৃত সত্য

ইউসুফ (আ.)-এর চরিত্র নিয়ে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, ইউসুফ (আ.) ও জুলাইখার মধ্যে পারস্পরিক প্রণয় ছিল, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। জুলাইখার আসক্তি ছিল একপক্ষীয়। ইউসুফ (আ.) আল্লাহর নবী হিসেবে ছিলেন সম্পূর্ণ নিষ্পাপ। এছাড়া তাঁদের বিয়ের বিষয়টি নিয়ে পবিত্র কোরআন বা সহিহ হাদিসে সরাসরি কিছু উল্লেখ নেই। তবে কোনো কোনো মুফাসসির উল্লেখ করেছেন যে, অনেক বছর পর জুলাইখা তওবা করলে এবং তাঁর স্বামী কিতফিরের মৃত্যুর পর ইউসুফ (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। (তাফসিরে তবারি, খণ্ড ১৬)

হজরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা আমাদের শেখায় যে, সত্য কোনো না কোনোভাবে প্রকাশ পাবেই। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের সম্মান রক্ষায় প্রয়োজনে পরিস্থিতির এমন মোড় ঘুরিয়ে দেন যা মানুষের কল্পনাতীত। যারা প্রতিকূল পরিবেশেও চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে, আল্লাহ তাঁদের দুনিয়া ও আখেরাতে উচ্চাসীন করেন।

এমএ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর