ইয়াকুব (আ.)-এর চোখের পানি শুকিয়েছিল ইউসুফ (আ.)-এর বিরহে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি কেবল একটু আশায় বুক বেঁধে ছিলেন - হয়ত একদিন তাঁর প্রিয় সন্তান ফিরে আসবে। কিন্তু যখন বেদনা অসহনীয় হয়ে উঠল, তখন তিনি মানুষের দিকে না তাকিয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেছিলেন- إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ ‘আমি আমার অসহনীয় বেদনা ও দুঃখ শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।’ (সুরা ইউসুফ: ৮৬)
দোয়ার প্রেক্ষাপট: এক পিতার বেদনা
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবন ছিল পরীক্ষার পর পরীক্ষা। প্রিয় পুত্র ইউসুফকে ভাইয়েরা কূপে ফেলে দেয় (সুরা ইউসুফ: ১৫-১৭)। মিথ্যা সংবাদ শোনেন যে ইউসুফকে নেকড়ে খেয়েছে (সুরা ইউসুফ: ১৮)। অন্য পুত্র বিনইয়ামিনকেও হারান (সুরা ইউসুফ: ৮৩) তবুও তিনি বলেছিলেন- فَصَبْرٌ جَمِيلٌ ‘সুন্দর ধৈর্য।’ (সুরা ইউসুফ: ৮৩)
আরও পড়ুন: কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসুলদের দোয়া
এই দোয়া থেকে ৩টি জীবনপরিবর্তনকারী শিক্ষা
১. অভিযোগ শুধু আল্লাহর কাছেই: ইয়াকুব (আ.) শিখিয়েছেন- মানুষের কাছে অভিযোগ করে লাভ নেই। আল্লাহই সবচেয়ে বড় সান্ত্বনাদাতা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩)
বিজ্ঞাপন
২. ধৈর্য + দোয়া = সমাধান: ৪০ বছর ধৈর্য ধরেছেন, কিন্তু দোয়া বন্ধ করেননি। নবীজি বলেছেন, ‘দোয়াই ইবাদতের মূল।’ (তিরমিজি: ৩৩৭১)
৩. কান্নাও হতে পারে ইবাদত: যখন কান্না আল্লাহমুখী হয়, তখন তা ইবাদতে পরিণত হয়। আল্লাহ তাআলা বলছেন- ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।’ (সুরা ইনশিরাহ: ৬)
কখন এই দোয়া পড়বেন?
- প্রিয়জন হারানোর বেদনায়
- আর্থিক সংকটে
- শারীরিক অসুস্থতায়
- মানসিক অবসাদে
- অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে
আরও পড়ুন: এই ৫ দোয়া করুন, একটি কবুল হলেও জীবনে আর কিছু লাগবে না
দোয়ার উচ্চারণ ও অর্থ
আরবি: إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ
উচ্চারণ: ইন্নামা আশকূ বাসসী ওয়া হুজনী ইলাল্লাহ
অর্থ: আমি আমার কষ্ট ও দুঃখ শুধুমাত্র আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি।
দোয়ার বিশেষ ফজিলত
আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য: ‘আমি বান্দার নিকটতম হই যখন সে আমার কাছে ফরিয়াদ করে।’ (হাদিসে কুদসি)
আত্মিক শান্তি: ইয়াকুব (আ.)-এর দোয়ার পরই ইউসুফ (আ.)-এর সাক্ষাৎ লাভ হয়। (সুরা ইউসুফ: ৯৬)
অফুরন্ত পুরস্কার: ‘ধৈর্যশীলদের অফুরন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে।’ (সুরা জুমার: ১০)
আরও পড়ুন: জরুরি দোয়াগুলো জেনে নিন
ইয়াকুব (আ.)-এর জীবন থেকে ৩টি মূল বার্তা
১. আল্লাহই যথেষ্ট: মানুষের দিকে না তাকিয়ে আল্লাহর দিকে তাকান
২. কখনো হতাশ হবেন না: দোয়া কবুল হতে ৪০ বছরও লাগতে পারে
৩. কষ্টই পাথেয়: প্রতিটি কান্না আপনাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করবে
শেষ কথা, ‘ইয়াকুব (আ.)-এর এই দোয়া শুধু নিছক একটি বাক্য নয়; এটি হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসা আর্তনাদ। আপনিও এই দোয়াকে কঠিন পরিস্থিতিতে সম্বল করে নিন। যেন আপনার বেদনাও যেন আল্লাহর দরবারে পৌঁছায়!’
সূত্র: সুরা ইউসুফ, তাফসির ইবনে কাসির, সহিহ বুখারি, তিরমিজি

