হিজরি ১১ সন, রবিউল আউয়াল মাস। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (স.) তখন মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়। প্রচণ্ড জ্বরের কারণে তাঁর মাথায় পট্টি বাঁধা। শারীরিক চরম দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি জুমার দিনে সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে মিম্বরে আরোহণ করেন। ইতিহাসের পাতায় এটি নবীজি (স.)-এর ওফাতপূর্ব সর্বশেষ খুতবাগুলোর অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত।
সেই খুতবায় উম্মতের জন্য তিনি যেসব দিকনির্দেশনা ও সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন, তার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো-
দুনিয়া ও আখেরাতের মধ্যে নির্বাচন
খুতবার শুরুতে রাসুলুল্লাহ (স.) সমবেত সাহাবাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আল্লাহ তাঁর এক বান্দাকে দুনিয়া এবং আল্লাহর নিকট যা আছে (আখেরাত) এ দুটির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। সেই বান্দা আল্লাহর নিকট যা আছে, তা-ই বেছে নিয়েছেন।’ (সহিহ বুখারি: ৪৬৬)
এ কথা শুনে হজরত আবু বকর (রা.) অঝোরে কাঁদতে শুরু করলেন। উপস্থিত অন্যরা শুরুতে বুঝতে না পারলেও, আবু বকর (রা.) ঠিকই বুঝেছিলেন যে, ‘সেই বান্দা’ স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (স.) এবং তাঁর বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
আরও পড়ুন: নবীজির অন্তিম মুহূর্তের মহামূল্যবান ১৪ উপদেশ
হজরত আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব
সিদ্দিকে আকবরের কান্না দেখে নবীজি (স.) তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন, ‘মানুষদের মধ্যে আবু বকর আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে তার জান ও মাল দিয়ে। আমি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ‘খলিল’ (অন্তরঙ্গ বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করতাম, তবে আবু বকরকেই করতাম। কিন্তু ইসলামের ভ্রাতৃত্বই আমাদের জন্য উত্তম।’ এরপর তিনি নির্দেশ দেন, ‘মসজিদে প্রবেশের সব দরজা বন্ধ করে দাও, কেবল আবু বকরের দরজা ছাড়া।’ (সহিহ বুখারি: ৪৬৬, ৩৬৫৪)
আনসারদের প্রতি বিশেষ ওসিয়ত
মদিনার আনসারদের অবদানের কথা স্মরণ করে নবীজি (স.) মুহাজির ও পরবর্তী উম্মতকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমি তোমাদের আনসারদের ব্যাপারে ওসিয়ত করছি। তারা আমার বিশ্বস্ত ভাণ্ডার (গোপন কথা সংরক্ষণকারী)। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, এখন তাদের প্রাপ্য অধিকার বাকি রয়েছে। সুতরাং তাদের নেককারদের সাদরে গ্রহণ করবে এবং তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।’ (সহিহ বুখারি: ৩৭৯৯, ৩৮০১)
আরও পড়ুন: নবীজির বিদায়ের ৬ ইঙ্গিত
কবর পূজা ও শিরক থেকে কঠোর সতর্কতা
অসুস্থতার তীব্র যন্ত্রণার মধ্যেও নবীজি (স.) তাওহিদের ব্যাপারে আপসহীন ছিলেন। তিনি উম্মতকে সাবধান করে বলেন, ‘সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবীদের কবরকে সেজদার স্থান বা ইবাদতখানা বানিয়েছিল। আমি তোমাদের এই কাজ করতে নিষেধ করছি। তোমরা কবরকে মসজিদে পরিণত করো না।’ (সহিহ মুসলিম: ৫৩২)
জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত
খুতবার শেষ পর্যায়ে নবীজি (স.) ন্যায়বিচারের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যদি কারও পিঠে আঘাত দিয়ে থাকি, তবে এই যে আমার পিঠ- সে যেন বদলা নিয়ে নেয়। আমি যদি কারও সম্পদ নিয়ে থাকি, তবে এই যে আমার সম্পদ- সে যেন তা নিয়ে নেয়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ২৭২)
আরও পড়ুন: বিদায় হজের ভাষণে কী বলেছিলেন নবীজি
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যেন এ কথা মনে না করে যে, আমার থেকে প্রতিশোধ নিলে আমি মনঃক্ষুণ্ণ হবো। জেনে রেখো, আমার নিকট সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে আমার থেকে তার হক আদায় করে নেয় অথবা আমাকে ক্ষমা করে দেয়, যেন আমি আল্লাহর সঙ্গে পরিচ্ছন্ন অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে পারি।’
এই খুতবার পর নবীজি (স.) মিম্বর থেকে নেমে জুমার নামাজ আদায় করেন। এরপরে তাঁর অসুস্থতা এতটাই বেড়ে যায় যে, তিনি আর মসজিদে এসে জামাতে নামাজ পড়াতে পারেননি। নবীজি (স.)-এর জীবনের শেষ দিককার এই খুতবা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহর জন্য পারস্পরিক অধিকার রক্ষা, শিরক থেকে বেঁচে থাকা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা।

