কেয়ামতের বড় আলামতগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং সবচেয়ে ভয়ংকর হলো ‘দাজ্জাল’-এর আবির্ভাব। রাসুলুল্লাহ (স.) উম্মতকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে বারবার সতর্ক করেছেন। হাদিস শরিফে দাজ্জালের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে একটি অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে, যা ‘তামিম দারির হাদিস’ নামে পরিচিত। সহিহ হাদিসের এই বর্ণনা থেকে জানা যায়, দাজ্জাল বর্তমানে পৃথিবীর কোনো এক নির্জন দ্বীপে শিকলবন্দি অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সেই দ্বীপটি ঠিক কোথায়?
১. তামিম দারির (রা.) ঐতিহাসিক সমুদ্র অভিযান
সহিহ মুসলিমের এক দীর্ঘ হাদিসে (হাদিস: ২৯৪২) এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে। সাহাবি তামিম দারি (রা.) এবং তাঁর ৩০ জন সঙ্গী একবার সমুদ্রভ্রমণে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়েন। দীর্ঘ এক মাস সমুদ্রে ভাসার পর সূর্যাস্তের সময় তাঁরা এক অজানা দ্বীপে নোঙর করেন। দ্বীপে নামার পর তাঁদের সাক্ষাৎ হয় ‘জাসসাসা’ (সংবাদ সংগ্রহকারী) নামক এক অদ্ভুত প্রাণীর সাথে, যার পুরো শরীর ঘন পশমে ঢাকা ছিল। প্রাণীটি তাঁদের এক পুরোনো মঠের দিকে নিয়ে যায়। সেখানে তাঁরা এক বিশালদেহী মানুষকে হাত-পা ও ঘাড়ে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান। সেই বন্দি ব্যক্তিই ছিল দাজ্জাল। সে সাহাবিদের কাছে ‘বাইসান’ খেজুর বাগান, তাবারিয়্যা সাগর, ‘জুগার’ ঝরণা এবং শেষ নবীর আগমন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল।
আরও পড়ুন: দাজ্জালের সঙ্গে সাক্ষাতের যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তামিম দারি (রা.)
২. দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থান: হাদিসের ইঙ্গিত
সেই দ্বীপটি ঠিক কোথায় অবস্থিত, তা নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। হাদিসে দ্বীপটির সুনির্দিষ্ট নাম বলা না হলেও রাসুলুল্লাহ (স.) এর দিক সম্পর্কে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি প্রথমে ইয়েমেন বা শামের সাগরের কথা ভাবলেও পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে নিজের মত সংশোধন করেন। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- মনে রেখো, দাজ্জাল শাম কিংবা ইয়েমেনের কোনো সাগরে নেই। সে পূর্বের কোনো এক স্থানে আছে। এ কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন। (মুসলিম: ৭১১৯)
বিজ্ঞাপন
৩. আধুনিক ও প্রাচীন গবেষকদের মতামত
মদিনা থেকে ‘পূর্ব দিক’ এবং ‘সমুদ্র’ এই দুইয়ের সমন্বয়ে গবেষকরা কয়েকটি স্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো-
ক. আরব সাগর বা ভারত মহাসাগর: মদিনার পূর্ব দিকে তাকালে স্থলভাগ পেরিয়ে পারস্য উপসাগর হয়ে আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের বিশাল জলরাশি পাওয়া যায়। তামিম দারির জাহাজ যেহেতু ইয়েমেনের কাছাকাছি থেকে যাত্রা শুরু করেছিল, তাই স্রোতের টানে জাহাজটি এই সাগরের কোনো দ্বীপে পৌঁছানোই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
আরও পড়ুন: দাজ্জাল সামনে এলে এই ৪ কাজ অবশ্যই করবেন
খ. খোরাসান বা ইসফাহান প্রসঙ্গ: অন্য হাদিসে এসেছে, দাজ্জাল পূর্বাঞ্চলীয় ‘খোরাসান’ বা ইরানের ইসফাহান থেকে আত্মপ্রকাশ করবে। এর সমাধান হতে পারে- বর্তমানে সে দ্বীপে বন্দি আছে, কিন্তু মুক্তির পর সে ইসফাহান বা খোরাসান অঞ্চলে এসে মানুষের সামনে আত্মপ্রকাশ করবে।
গ. সোকোত্রা দ্বীপ (ইয়েমেন): অনেক আধুনিক গবেষক ‘সোকোত্রা দ্বীপ’-কে দাজ্জালের দ্বীপ হিসেবে সন্দেহ করেন। আরব সাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটির প্রকৃতি অত্যন্ত রহস্যময় এবং এর গাছপালা ও প্রাণীকূল পৃথিবীর অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে আলাদা। তবে হাদিসে নির্দিষ্ট করে সোকোত্রার নাম বলা হয়নি।
ঘ. বারমুডা ট্রায়াঙ্গল (একটি ভুল ধারণা): বর্তমানে অনেকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে দাজ্জালের স্থান বলে দাবি করেন। কিন্তু ইসলামি শরিয়তে এর কোনো ভিত্তি নেই। কারণ বারমুডা ট্রায়াঙ্গল আমেরিকার পশ্চিমে, অথচ হাদিসে স্পষ্ট করে ‘পূর্ব দিক’ বলা হয়েছে। তাই এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. দ্বীপটি কি দৃশ্যমান না অদৃশ্য?
মুহাদ্দিস ও গবেষকদের মতে, দাজ্জাল এবং তার দ্বীপটি বাস্তব। তবে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কুদরতে তা মানুষের সাধারণ দৃষ্টির আড়ালে রেখেছেন। মানুষ হয়তো সেই দ্বীপের কাছাকাছি যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর হুকুম না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাকে চিনতে পারবে না বা দাজ্জালকে খুঁজে পাবে না।
৫. আমাদের করণীয়
দ্বীপের জিপিএস লোকেশন জানার চেয়ে দাজ্জালের ভয়াবহ ফিতনা থেকে বাঁচার প্রস্তুতি নেওয়া মুমিনের জন্য বেশি জরুরি। রাসুলুল্লাহ (স.) এ থেকে বাঁচার জন্য কিছু আমল শিক্ষা দিয়েছেন-
- সুরা কাহাফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করা।
- নামাজের শেষ বৈঠকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে পানাহ চেয়ে বিশেষ দোয়া পড়া।
- সর্বদা ঈমানের ওপর অটল থাকা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

