শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ঢাকা

ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য: ইসলামের সতর্কতা ও করণীয়

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম

শেয়ার করুন:

ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য: ইসলামের সতর্কতা ও করণীয়

আগামীকে ঘিরে মানুষের থাকে হাজারো স্বপ্ন ও পরিকল্পনা। ভবিষ্যৎকে সুন্দর করতে মানুষ হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো- ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার চাদরে ঢাকা। এর চাবিকাঠি একমাত্র মহান আল্লাহর হাতে। তাই ইসলামে ভবিষ্যৎ নিয়ে আগাম মন্তব্য বা নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষেত্রে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। নিম্নে কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

গায়েব বা ভবিষ্যতের জ্ঞান কেবল আল্লাহর

ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা গায়েব বা অদৃশ্যের অন্তর্ভুক্ত। ইসলামি আকিদা হলো- আল্লাহ ছাড়া গায়েবের খবর কেউ জানে না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন- ‘আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে আছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না...।’ (সুরা আনআম: ৫৯)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কেউ অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ ছাড়া...।’ (সুরা নামল: ৬৫)

জ্যোতিষশাস্ত্র ও ভাগ্যগণনা: ইসলামের কঠোর নিষেধাজ্ঞা

সমাজে অনেকে ভবিষ্যৎ জানার আশায় গণক, জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিশারদ কিংবা জাদুকরের কাছে যান। ইসলামে এটি ‘শিরক’ বা আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করার শামিল।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: শিরকের বিষাক্ত ছোবল: কীভাবে ঈমান হারায় মুমিন

১. গণকের কাছে যাওয়ার ভয়াবহ পরিণতি: রাসুলুল্লাহ (স.) সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘যদি কেউ কোনো গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তার কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে, তবে ৪০ দিন পর্যন্ত তার সালাত কবুল হবে না।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাদের কথা বিশ্বাস করা মানে মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর অবতীর্ণ দ্বীনের প্রতি কুফরি করা। (আবু দাউদ: ৩৮৯৫)

২. জ্বিন ও জাদুকরদের প্রতারণা: অনেকে জিন বশ করে ভবিষ্যৎ জানার দাবি করে। অথচ জিনেরা ভবিষ্যৎ জানে না। রাসুল (স.)-এর আগমনের পর তাদের জন্য আকাশের খবর শোনা কঠিন করে দেওয়া হয়েছে। তারা যেটুকু তথ্য চুরি করে, তার সাথে শত মিথ্যা জুড়ে দিয়ে মানুষের কাছে প্রচার করে।

৩. গ্রহ-নক্ষত্র ও পাথরের প্রভাব নেই: গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের ভিত্তিতে ভাগ্য নির্ধারিত হওয়া বা কোনো পাথর (যেমন—পান্না, আকিক) ভাগ্য বদলাতে পারে—এমন বিশ্বাস ইসলামে ভিত্তিহীন।

ভবিষ্যত বক্তব্যে সঠিক পন্থা: ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা

মুমিনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কোনো নিশ্চিত দাবি থাকবে না। বরং তাকে অবশ্যই ‘ইনশাআল্লাহ’ (যদি আল্লাহ চান) বলতে হবে। কারণ, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া বান্দার কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ (স.)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন- ‘(হে নবী!) ‘ইনশাআল্লাহ’ বলা ছাড়া কোনো বিষয়েই কখনো বলো না, আমি আগামীতে তা করব...।’ (সুরা কাহফ: ২৩-২৪)

আরও পড়ুন: না বুঝে শিরক করলে আল্লাহ শাস্তি দেবেন?

ইনশাআল্লাহ না বলার ঐতিহাসিক শিক্ষা

ভবিষ্যতের কোনো কাজে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর ভরসা না করে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা আল্লাহ পছন্দ করেন না। নবীদের জীবনেও এর নজির রয়েছে। 

সুলাইমান (আ.)-এর ঘটনা: প্রতাপশালী বাদশাহ সুলাইমান (আ.) একবার বলেছিলেন, আজ রাতে তিনি তাঁর একশ’ স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হবেন এবং সবাই (স্ত্রীরা) মুজাহিদ সন্তান প্রসব করবে। কিন্তু তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলতে ভুলে যান। ফলে তাঁর আশা পূরণ হয়নি। রাসুল (স.) বলেন, ‘যদি তিনি ইনশাআল্লাহ বলতেন, তবে তাঁর শপথ ভঙ্গ হতো না এবং আশা পূরণ হতো।’ (সহিহ বুখারি: ৫২৪২)

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ঘটনা: ইহুদিরা রাসুল (স.)-কে তিনটি প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, ‘আগামীকাল উত্তর দেব’। কিন্তু ইনশাআল্লাহ না বলায় ১৫ দিন ওহি আসা বন্ধ ছিল। এতে নবীজির কষ্ট হয়েছিল। অতঃপর মহান আল্লাহ ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার নির্দেশ দিলেন। বললেন- ভবিষ্যতে কোনো কাজ করার সংকল্প করলে, অবশ্যই ‘ইন শা-আল্লাহ’ বলে নেবেন। কেননা, মানুষ তো জানেই না যে, ভবিষ্যতে কোনোকিছু করার তাওফিক আল্লাহ তাকে দেবেন কি দেবেন না। (তাফসির, সুরা কাহাফ: ২৩-২৪) মূলত এ ঘটনার মাধ্যমে উম্মতকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনর্থক কৌতূহল বা ভাগ্য গণনার চেষ্টা মুমিনের কাজ নয়। মুমিনের কাজ হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করে সঠিক পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণই একজন মুমিনের প্রকৃত পরিচয়। আল্লাহ আমাদের সকল প্রকার শিরক থেকে বেঁচে থাকার এবং সুন্নাহ অনুযায়ী ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর