মানুষের জীবন এক সরলরেখায় চলে না। কখনো সুখের বসন্ত, আবার কখনো দুঃখের বাতাস। এ দুয়ের সমন্বয়েই মানবজীবন। সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সুখ হলো সফলতা আর দুঃখ হলো ব্যর্থতা বা দুর্ভাগ্য। কিন্তু একজন ঈমানদারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুমিনের জীবনে ‘অকল্যাণ’ বলতে কিছু নেই। তার জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি পরিস্থিতি, তা সুখের হোক বা দুঃখের; সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত এবং পরিণামে তা তার জন্য মঙ্গলজনক। এই বিশ্বাসই মুমিনকে হতাশা থেকে মুক্তি দেয় এবং উদ্ধত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
রাসূলুল্লাহ (স.) মুমিনের এই চমৎকার বৈশিষ্ট্যটি তুলে ধরেছেন এভাবে—‘মুমিনের বিষয়টি বড়ই আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া আর কারো এই বৈশিষ্ট্য নেই। যদি সে কোনো নেয়ামত লাভ করে, তবে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, এতে তার কল্যাণ হয়। আর যদি কোনো বিপদের মুখোমুখি হয়, তবে সে সবর (ধৈর্য) ধারণ করে, এতেও তার কল্যাণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)
নিম্নে কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুমিনের এই কল্যাণ লাভের প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো।
বিজ্ঞাপন
১. ঈমান বা বিশ্বাসের কারণে বিশেষ মর্যাদা
মুমিনের জীবনের সকল কল্যাণের মূল ভিত্তি হলো তার ‘ঈমান’। ঈমান থাকার কারণেই তার সাধারণ ভালো কাজগুলো ইবাদতে পরিণত হয় এবং বিপদগুলো পাপ মোচনের কারণ হয়। আল্লাহ তাআলা কোরআনে মুমিনদের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন- ‘যে সৎকর্ম করে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আর সে যদি মুমিন হয়, তবে আমি তাকে (দুনিয়াতে) পবিত্র জীবন দান করব এবং (আখেরাতে) তাদের কৃতকর্মের চেয়েও উত্তম প্রতিদান দেব।’ (সুরা নাহল: ৯৭)
আরও পড়ুন: ঈমান দুর্বল হলে যে ক্ষতি
অর্থাৎ, ঈমান থাকার কারণেই সুখ ও দুঃখ উভয় অবস্থাকে সে আল্লাহর পরীক্ষা ও ফয়সালা হিসেবে মেনে নেয়, যা তাকে মানসিক প্রশান্তি ও পরকালীন মুক্তি দান করে। তাছাড়া ঈমান মুমিনের অন্তরে গভীর প্রশান্তি ও নিরাপত্তা এনে দেয়, যা তাকে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতেও স্থির ও অবিচল রাখে। এটি মানুষকে সৎ, দায়িত্বশীল ও ন্যায়পরায়ণ হতে শেখায় এবং অন্যায়ের পথ থেকে দূরে রাখে। ঈমানের শক্তিতেই মুমিন আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে বিপদ মোকাবিলার সাহস পায়। সর্বোপরি, দুনিয়ায় আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি এবং পরকালে চিরস্থায়ী জান্নাত ও মুক্তির নিশ্চয়তা একমাত্র ঈমানের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
বিজ্ঞাপন
২. নেয়ামত লাভের পর শুকরিয়া আদায়ের কারণে
আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো সুখ, সম্পদ বা সফলতা পেলে মুমিন আনন্দে আত্মহারা হয়ে আল্লাহকে ভুলে যায় না; বরং সে বিনয়ী হয় এবং ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে। এই কৃতজ্ঞতাবোধ বা ‘শুকরিয়া’ তার নেয়ামতকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন- ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের (নেয়ামত) বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর।’ (সুরা ইবরাহিম: ৭)
শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে মুমিন দুটি লাভ অর্জন করে: প্রথমত পার্থিব নেয়ামত বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত পরকালে কৃতজ্ঞ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে জান্নাত লাভ করে।
আরও পড়ুন: শিরকের বিষাক্ত ছোবল: কীভাবে ঈমান হারায় মুমিন
৩. বিপদ ও সংকটে সবর বা ধৈর্য ধারণের কারণে
জীবনের চলার পথে বিপদ-আপদ, রোগ-শোক বা অভাব-অনটন আসা স্বাভাবিক। একজন মুমিন জানেন যে, এই কষ্ট ক্ষণস্থায়ী এবং এর বিনিময়ে আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দেবেন। বিপদে ধৈর্য ধারণ বা ‘সবর’ মুমিনের অন্যতম হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন- ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব সামান্য ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফসলের কিছুটা ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৫) বিপদে সবর করার মাধ্যমে মুমিনের গুনাহ মাফ হয়। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘মুসলমানের ওপর যে ক্লান্তি, রোগ-ব্যাধি, দুশ্চিন্তা, শোক ও কষ্ট আসে, এমনকি যে কাঁটা তার শরীরে বিঁধে, এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১)
সুতরাং, বিপদ মুমিনের জন্য কোনো অভিশাপ নয়, বরং এটি তার আত্মশুদ্ধি ও মর্যাদা বৃদ্ধির সোপান।
পরিশেষে বলা যায়, একজন মুমিনের জীবন নিছক খাওয়া-পরা বা পার্থিব ভোগের নাম নয়। মুমিনের জীবন হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নিরন্তর সাধনা। যখন সে সুখে থাকে, কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে সে আল্লাহর নিকটবর্তী হয়। আর যখন সে কষ্টে থাকে, ধৈর্যের মাধ্যমে সে আল্লাহর রহমত লাভ করে। পৃথিবীর আর কোনো মতাদর্শ বা দর্শনে দুঃখ ও কষ্টের মাঝে এমন ইতিবাচক ও কল্যাণকর দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যায় না।
তাই আমাদের উচিত, সর্বাবস্থায় আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। সুখের দিনে কৃতজ্ঞতা আর দুঃখের দিনে ধৈর্যের চাদর গায়ে জড়িয়ে রাখা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত মুমিন হিসেবে কবুল করুন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে কল্যাণ লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

