কেয়ামতের দিন আমলনামা ও হিসাব-নিকাশের পর মানুষ প্রধানত জান্নাতি ও জাহান্নামি এই দুই দলে বিভক্ত হবে। তবে এর বাইরেও একটি বিশেষ শ্রেণি থাকবে, যারা জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করবে। পবিত্র কোরআনে এ দলের আলোচনা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তাদের নামেই একটি পূর্ণাঙ্গ সুরার নামকরণ করা হয়েছে- সুরা আরাফ। এ দলের সদস্যদের বলা হয় ‘আসহাবে আরাফ’ বা আরাফবাসী।
‘আরাফ’ কী এবং কোথায়?
পবিত্র কোরআনে জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি প্রাচীর ও তার ওপর অবস্থানকারী একটি দলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুফাসসিরদের ব্যাখ্যায় এ উঁচু স্থানকে ‘আরাফ’ বলা হয়।
তাফসিরে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা এবং তাফসিরে তাবারিসহ বিভিন্ন তাফসিরে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘আরাফ’ হলো জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যবর্তী একটি উঁচু স্থান।
কোরআন থেকে আরও জানা যায়, এ স্থানে অবস্থানকারীরা জান্নাতি ও জাহান্নামিদের তাদের নিদর্শন দেখে চিনতে পারবে। (সুরা আরাফ: ৪৬)
আরও পড়ুন: জাহান্নামিদের সঙ্গে জান্নাতিদের যেসব কথা হবে
কারা হবেন ‘আসহাবে আরাফ’?
আসহাবে আরাফ কারা- এ বিষয়ে মুফাসসিরদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে।
অনেক মুফাসসিরের মতে, তারা এমন ব্যক্তি, যাদের নেক আমল ও গুনাহ সমান হবে। নেক আমল তাদের জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু তখনও তারা জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি পাবে না। তারা আল্লাহর ফয়সালার অপেক্ষায় আরাফে অবস্থান করবে। পরবর্তীতে আল্লাহর অনুগ্রহে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তাফসিরে তাবারি; তাফসিরে ইবনে কাসির)
জান্নাতিদের দিকে দৃষ্টি ও সম্ভাষণ
আরাফবাসীরা যখন জান্নাতিদের দেখবে, তখন তাদের প্রতি সম্ভাষণ জানিয়ে বলবে, ‘সালামুন আলাইকুম’ (আপনাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)। যদিও তখনও তারা জান্নাতে প্রবেশ করেনি, তবুও তারা জান্নাতে প্রবেশের আশায় থাকবে। (সুরা আরাফ: ৪৬)
দুনিয়াতেও মুসলমানদের পারস্পরিক সাক্ষাতের সময় সালাম বিনিময় করা সুন্নত। আখেরাতে ফেরেশতারাও জান্নাতিদের এভাবেই স্বাগত জানাবে। (সুরা রাদ: ২৪; সুরা জুমার: ৭৩)
আরও পড়ুন: জান্নাতি ও জাহান্নামি লোক চেনার যে উপায় বলেছেন নবীজি
জাহান্নামিদের দিকে দৃষ্টি ও ভীতি
আরাফবাসীদের দৃষ্টি যখন জাহান্নামের দিকে ফিরবে, তখন তারা শাস্তিপ্রাপ্তদের অবস্থা দেখে আল্লাহর কাছে দোয়া করবে-
‘হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালেম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।’ (সুরা আরাফ: ৪৭)
অহংকারীদের প্রতি ভর্ৎসনা
আরাফবাসীরা জাহান্নামের আগুনে শাস্তিপ্রাপ্ত প্রতাপশালী ও অহংকারী মানুষদের দেখে বলবে-
‘তোমাদের দলবল এবং তোমাদের অহংকার আজ কোনো কাজে আসল না।’ (সুরা আরাফ: ৪৮)
এ থেকেই স্পষ্ট হয়, দুনিয়ার ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা অহংকার আখেরাতে কোনো উপকারে আসবে না।
শিক্ষা ও অনুস্মারক
আসহাবে আরাফের ঘটনা মুমিনদের জন্য গভীর শিক্ষা বহন করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতা, সম্পদ বা দলবল নয়; আখেরাতে সফলতার মূল ভিত্তি হলো ঈমান, নেক আমল এবং আল্লাহর রহমত। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত গুনাহ থেকে বিরত থাকা, নেক আমল বৃদ্ধি করা, তাওবা-ইস্তেগফারে অভ্যস্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে উত্তম পরিণতির জন্য দোয়া করা।
তথ্যসূত্র: সুরা আরাফ: ৪৬–৪৮; তাফসিরে তাবারি; তাফসিরে ইবনে কাসির




