সৃষ্টিগতভাবেই নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)–এর পর হজরত হাওয়া (আ.)–কে তাঁর সঙ্গী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁদেরকে বৈধ দাম্পত্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও এবং তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম: ২১)
বিয়ের মাধ্যমে যেমন ইবাদতের সওয়াব রয়েছে, তেমনি পার্থিব ও মানসিক অনেক উপকারও রয়েছে। নিচে কোরআন, হাদিসের আলোকে বিয়ের ১৫টি উপকার তুলে ধরা হলো।
বিজ্ঞাপন
১. অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে আত্মরক্ষা
বিয়ে যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ ও অশ্লীলতা থেকে সুরক্ষা দেয়। নবী কারিম (স.) বলেছেন, ‘হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ে করতে সক্ষম, সে যেন বিয়ে করে। কেননা, বিয়ে দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে আর যে করতে পারে না, সে যেন রোজা রাখে। কেননা রোজা যৌন আকাঙ্ক্ষা দমনে সহায়ক।’ (সহিহ বুখারি: ৫০৬৬)
২. ইসলামি পরিবার ও সমাজ গঠন
বিবাহিত জীবন পরিবার ও সমাজকে নৈতিকভাবে দৃঢ় করে। নবী (স.) বলেছেন, ‘যখন বান্দা বিয়ে করে, তখন সে দ্বীনের অর্ধেক পূরণ করে। অতএব, বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (তাবারানি: ৯৭২; মুসতাদরাক হাকিম: ২৭২৮)
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: নবীজির দাম্পত্য দর্শন: সুখী পরিবারের সোনালি নীতি
৩. নারীর সম্মান ও নিরাপদ জীবন
বিয়ে নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। কোরআন ইরশাদ করেছে, ‘পুরুষরা নারীদের তত্ত্বাবধায়ক।’ (সুরা নিসা: ৩৪)
৪. বিশ্বাসযোগ্য জীবনসঙ্গী
বিবাহিত জীবন একজন নির্ভরযোগ্য সঙ্গী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহচর দেয়। নবী (স.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার সর্বোৎকৃষ্ট সম্পদ (উপভোগ্য উপকারণ) হলো সতী-সাধ্বী স্ত্রী।’ (সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭; মুসনাদে আহমদ: ৬৫৬৭)
৫. মানববংশের বৈধ বিস্তার
বিয়ে মানববংশের বৈধভাবে বিস্তার ঘটায়। নবী (স.) বলেছেন, ‘এমন নারীকে বিয়ে করো, যে প্রেমময়ী এবং অধিক সন্তান প্রসব করতে সক্ষম। কেননা আমি অন্যান্য উম্মাতের কাছে তোমাদের সংখ্যাধিক্যের কারণে গর্ব করবো।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২০৫০)
৬. যৌন চাহিদার বৈধ ও নিরাপদ উপায়
বিয়ে যৌন আকাঙ্ক্ষার বৈধ ও নিরাপদ পরিপূরণ নিশ্চিত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাদের (অর্থাৎ স্ত্রীদের) সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করো।’ (সুরা নিসা: ১৯) এখানে ‘সৎভাবে জীবন যাপন’ এর অন্যতম দিক হলো- সঙ্গমের মাধ্যমে তার পবিত্র জীবন যাপনের প্রতি যত্নশীল হওয়া। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা: ৩০/১২৭)
আরও পড়ুন: স্ত্রীর সাক্ষ্যই প্রমাণ করে আপনি কেমন মুসলিম
৭. মানসিক শান্তি ও সান্ত্বনা
পবিত্র কোরআন ইরশাদ করেছে, ‘তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।’ (সুরা আরাফ: ১৮৯)
৮. নবী (স.)–এর সুন্নত অনুসরণ
বিয়ে নবী (স.)–এর সুন্নত। নবী (স.) বলেছেন, ‘আমি সালাত আদায় করি, নিদ্রা যাই এবং মেয়েদেরকে বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নতের প্রতি বিরাগ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়। (বুখারি: ৫০৬৩)
৯. সন্তানের সঠিক লালন‑পালন ও পরিচয়
বিবাহিত পরিবার সন্তানদের পরিচয় ও লালন‑পালন নিশ্চিত করে। কোরআন ইরশাদ করেছে, ‘জেনে রেখো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য এক পরীক্ষা। আর মহা পুরস্কার রয়েছে আল্লাহরই কাছে।’ (সুরা আনফাল: ২৮)
আরও পড়ুন: সন্তানের প্রতি মা-বাবার ১১ দায়িত্ব
১০. রিজিক ও বরকত বৃদ্ধি
বিবাহিত জীবন রিজিক ও জীবনে বরকত বৃদ্ধি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে করিয়ে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ন, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। (সুরা নুর: ৩২)
১১. শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা ও রোগ‑ঝুঁকি হ্রাস করে
বিবাহিত জীবন মানসিক চাপ কমাতে এবং একাকিত্ব দূর করতে সাহায্য করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনুসন্ধান দেখায়, বিবাহিত ব্যক্তিরা হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং মানসিক সমস্যার ঝুঁকি কমে। এটি সামাজিক এবং মানসিক সাপোর্ট সিস্টেমের কারণে সম্ভব। (ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নাল: ২০১৯; জার্নাল অব ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি: ২০১৮)
১২. সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা
বিবাহ সমাজে নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে। কোরআন ইরশাদ করেছে, ‘ব্যভিচারের কাছেও যেও না।’ (সুরা ইসরা: ৩২)
১৩. পুরুষ‑নারী উভয়কে দায়িত্বশীলতা শেখায়
বিবাহ ব্যক্তি ও পরিবারকে দায়িত্বশীল করে তোলে। নবী (স.) বলেছেন, ‘প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বাধীন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮)
আরও পড়ুন: সহবাসে সাড়া না দিলে স্ত্রী কি গুনাহগার হবেন?
১৪. সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও জীবনসাথীর দৃঢ় সমর্থন
নবী করিম (স.) যখন নবুয়ত লাভের প্রথম সময়ে আতঙ্কিত হন, তখন হজরত খাদিজা (রা.) তাঁকে সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে নবুয়তের কাজকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছেন। (সীরাতুন নবী, খণ্ড ১, পৃ. ৯৫-৯৬)
১৫. দ্বীন, ঈমান ও নৈতিক জীবনের নিরাপদ পরিবেশ
বিয়ে ঈমান ও নৈতিকতা রক্ষা করে এবং মানুষকে অশ্লীলতা ও ভুল পথ থেকে রক্ষা করে। নবী (স.) বলেছেন, ‘সতী-সাধ্বী স্ত্রী দ্বীনদার পুরুষের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৫৫)
বিয়ে কোনো সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রদত্ত এক মহান নেয়ামত। বিয়ে পুরুষ ও নারী উভয়কেই শান্তি, দায়িত্ব, সম্মান ও ঈমানের সঙ্গে জীবন গঠনের সুযোগ দেয়। এটি পারিবারিক, সামাজিক ও জাতিগত উন্নয়নের ভিত্তি, যেখানে সত্যিকারের নৈতিকতা ও ধর্মপ্রাণ জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়।

