বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ইসলামে চাষাবাদের মর্যাদা: এক ঐশী নির্দেশনা

ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:৫৭ পিএম

শেয়ার করুন:

ইসলামে চাষাবাদের মর্যাদা: এক ঐশী নির্দেশনা

চাষাবাদ মানবসভ্যতার প্রাচীনতম ও মৌলিক পেশা। ইসলামে এই পেশাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যা কোরআন ও হাদিসের অসংখ্য দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

নবীদের চাষাবাদ: এক মহান ঐতিহ্য

মানব ইতিহাসের প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে বহু নবী চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নবী করিম (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমি তোমাদের আদম (আ.) সম্পর্কে বলব। তিনি কৃষিকাজ করতেন।’ (মুসতাদরাক হাকেম: ৪১৬৫) হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ব্যাপারে এসেছে, ‘আমি তোমাদের ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে বলব। তিনি চাষবাস করতেন।’ (মুসতাদরাক হাকেম, হাদিস: ৪১৬৫)

স্বয়ং প্রিয়নবী (স.) জারফ নামক স্থানে চাষাবাদ করেছেন। (আল-মাবসুত লিস সারাখসি: ২/২৩)

কোরআনের দৃষ্টিতে কৃষিকর্ম

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা চাষাবাদের গুরুত্ব অত্যন্ত সৌন্দর্যের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন- ‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর আমি তা দিয়ে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি; তারপর তা থেকে সবুজ ফসল নির্গত করি, যা থেকে ঘন শস্যদানা উৎপাদন করি এবং খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি বের করি...।’ (সুরা আনআম: ৯৯)


বিজ্ঞাপন


আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন- ‘তোমরা কি ওই বীজগুলো দেখো না, যা তোমরা মাটিতে ফেলে দাও? তোমরা তা অঙ্কুরিত কর, না আমি অঙ্কুরিত করি?’ (সুরা ওয়াকিয়া: ৬৩-৬৪)

কোরআনে বীজ ও উদ্ভিদের বৃদ্ধি মানব প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা ও আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন: গাছের যত্ন না নিলে কি গুনাহ হয়?

হাদিসে কৃষি ও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (স.) চাষাবাদ ও বৃক্ষরোপণকে সদকার সমতুল্য সওয়াবের কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছেন- ‘যখন কোনো মুসলিম গাছ লাগায়, অথবা কোনো ফসল বোনে, আর মানুষ, পাখি বা পশু তা থেকে খায়, এটা রোপণকারীর জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। (সহিহ বুখারি: ২৩২০; সহিহ মুসলিম: ১৫৫৩)

‘যদি কারো হাতে ছোট একটি খেজুরগাছ থাকে এবং কেয়ামত সংঘটিত হয়, সে যেন গাছটি রোপণ করে।’ (মুসনাদে আহমদ: ১২৯০২)

জমি চাষ ও আইনি মর্যাদা

ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট একটি নীতি অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় অনাবাদি জমি আবাদ করলে সেই ব্যক্তি তার অধিক হকদার হয়। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো জমি আবাদ করে, যা কারো মালিকানায় ছিল না, সে ওই জমির অধিক হকদার।’ (বুখারি: ২৩৩৫)

আরও পড়ুন: বৃক্ষরোপণের পুরস্কার সম্পর্কে হাদিসে যা আছে

কৃষকের অধিকার ও সম্মান

ইসলাম কৃষকের অধিকার রক্ষায় অনন্য নজির স্থাপন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, হজরত ওমর (রা.) এক কৃষকের নষ্ট হওয়া ক্ষেতের জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ১০ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ প্রদান করেছিলেন। (কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা: ১২৯)

যুদ্ধের সময়ও কৃষি সুরক্ষার নির্দেশ আছে। হজরত আবু বকর (রা.) সিরিয়ায় প্রেরিত সৈন্যবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন- ‘কোনো ফলবান বৃক্ষ কাটা যাবে না।’ (মুআত্তা ইমাম মালেক: ৯৬৫)

ফিকহের দৃষ্টিতে চাষাবাদ

ইসলামি স্কলারগণ চাষাবাদকে ফরজে কিফায়া হিসেবে গণ্য করেছেন। যেমন উল্লেখ আছে- ‘যৌথ বা ব্যক্তিগতভাবে চাষাবাদ করা ফরজে কিফায়া, কারণ এতে মানুষ ও প্রাণীর জীবনধারণের প্রয়োজন আছে।’ (আল-ফিকহ আলাল মাজাহিবিল আরবাআ: ৩/১২)

ইসলামের দৃষ্টিতে চাষাবাদ কেবল একটি পেশা নয়, এটি ইবাদতের মর্যাদা বহন করে। এটি মানবসভ্যতার টিকে থাকার মূল ভিত্তি এবং আল্লাহর নেয়ামতের সদ্ব্যবহারের উত্তম পদ্ধতি। তাই প্রতিটি মুসলিম সমাজের জন্য কৃষিকাজের উন্নয়ন ও প্রসার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর