ইসলামের ইতিহাসে কিছু ঘটনা এমন আছে, যা ঈমান ও ধৈর্যের অটল উদাহরণ হয়ে আছে যুগে যুগে। হজরত ইবরাহিম (আ.) ও স্বৈরাচারী শাসক নমরুদের ঘটনাটি তেমনই এক কালজয়ী দৃষ্টান্ত, যা আজও মুমিনের অন্তরে ঈমানের প্রদীপ জ্বালায়।
নমরুদের অহংকার ও ইবরাহিমের দাওয়াত
নমরুদ ছিল তৎকালীন এক অহংকারী রাজা, যে নিজেকে ইলাহ বলে দাবি করত। অথচ আল্লাহর নবী ইবরাহিম (আ.) মানবজাতিকে আহ্বান জানালেন এক আল্লাহর ইবাদতে; তাওহিদের বার্তায়। তিনি যখন মূর্তি ভেঙে তাওহিদের দাওয়াত দিলেন, তখন নমরুদের সঙ্গে তাঁর তীব্র বিতর্ক হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে- ‘আপনি কি সেই ব্যক্তিকে দেখেননি, যে ইবরাহিমের সঙ্গে তার রব সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? যখন ইবরাহিম বললেন, ‘আমার রব তিনিই, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান’, সে বলল, ‘আমিও জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।’ ইবরাহিম বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি সেটিকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করাও।’ ফলে কাফের হতবুদ্ধি হয়ে গেল।’ (সুরা বাকারা: ২৫৮)
আরও পড়ুন: মুসা (আ.)-এর কবুল হওয়া ৪ দোয়া
অগ্নিকুণ্ডের প্রস্তুতি ও দোয়ার আশ্রয়
বিতর্কে পরাজিত হয়ে নমরুদ ইবরাহিম (আ.)-কে আগুনে নিক্ষেপের আদেশ দিল। লোকেরা পর্বতের মতো কাঠ জমিয়ে বিশাল গর্তে আগুন জ্বালাল। যখন নবী ইবরাহিম (আ.)-কে নিক্ষেপযন্ত্রে (মিনজানিক) বেঁধে আগুনে ছোড়া হলো- মানুষের চোখে তখন মৃত্যু ছিল অনিবার্য। কিন্তু নবীর ঠোঁট থেকে উচ্চারিত হলো পূর্ণ তাওয়াক্কুলের সেই দোয়া- حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৭৩)
আল্লাহর অলৌকিক নির্দেশ
মুহূর্তেই আল্লাহর হুকুমে ভয়ংকর আগুন শান্ত ও শীতল হয়ে গেল। কোরআনে আল্লাহ বলেন- قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ ‘আমরা বললাম- হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া: ৬৯)
নিরাপদ মুক্তি ও নমরুদের পরিণতি
অলৌকিকভাবে ইবরাহিম (আ.) আগুন থেকে নিরাপদে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু নমরুদের অহংকার ভাঙল না। আল্লাহর নির্দেশে ইবরাহিম (আ.) হিজরত করলেন ইরাকের ব্যাবিলন থেকে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে। অন্যদিকে নমরুদ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত একটি ক্ষুদ্র মশার আঘাতে লাঞ্ছনাকর মৃত্যুর স্বাদ পেল।
আরও পড়ুন: ইবরাহিম (আ.)-এর স্ত্রী সারার চমকপ্রদ ঘটনা
দোয়ার ফজিলত ও প্রাসঙ্গিকতা
হাদিসে এই দোয়া পাঠের প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। নবী কারিম (স.)-এর সাহাবিরাও কঠিন বিপদের সময় এই দোয়া পড়তেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় যখন দশ হাজার সেনা মদিনা অবরোধ করেছিল, তখন সাহাবিরা এই দোয়া পড়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছিলেন।
(বুখারি: ৪৫৬৩-৪৫৬৪; তিরমিজি: ২৪৩১)
আজও জীবনের ভয়, চাপ, ও সংকটে এই দোয়াই মুমিনের অন্তরে আশার প্রদীপ জ্বালায়- ‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।’
আরও পড়ুন: ১০০ বছর পর জীবিত হয়েছিলেন যে নবী
শিক্ষা ও অনন্ত বার্তা
এই ঘটনাটি আমাদের শেখায়—
- তাওহিদের দৃঢ় বিশ্বাস: যেকোনো পরিস্থিতিতে এক আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা।
- তাওয়াক্কুলের গুরুত্ব: বিপদের মুহূর্তেও আল্লাহর হুকুমের প্রতি পূর্ণ নির্ভরশীলতা।
- সত্যের জয়: বাতিল যতই শক্তিশালী হোক, শেষ পর্যন্ত সত্যেরই বিজয় হয়।
- দোয়ার শক্তি: দোয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ও আশ্রয়।
ইবরাহিম (আ.)-এর এই দোয়া কেবল ইতিহাস নয়; এটি ঈমানের শক্তিশালী বার্তা। আগুন তাঁর দেহকে স্পর্শ করতে পারেনি, কারণ আল্লাহর হুকুমেই আগুনের প্রকৃতি বদলে গিয়েছিল। ঠিক তেমনি, মুমিনের জীবনের প্রতিটি সংকটে যদি থাকে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল ও দোয়া তাহলে আল্লাহর সাহায্যও আসবেই।




