নামাজ ইসলামের স্তম্ভ। ঈমানের পরই এর স্থান। পবিত্র কোরআনে নামাজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা বারবার এসেছে। নামাজ প্রতিষ্ঠার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা এবং কাতার সোজা করা। নামাজের কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, কাতারের মাঝখানে ফাঁকা না রাখা- এসব নামাজের অন্যতম সৌন্দর্য।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের কাতারগুলো সোজা করে নিবে, কেননা কাতার সোজা করা সালাতের সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত।’ (সহিহ বুখারি: ৭২৩)। নামাজের কাতার সোজা করার বিস্তারিত পদ্ধতি ও নিয়ম-কানুন নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।
বিজ্ঞাপন
কাতার সোজা করার প্রায়োগিক পদ্ধতি
১. কাঁধ ও পায়ের গোড়ালি মেলানো: আবু মাসউদ আনসারি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) নামাজে আমাদের কাঁধ স্পর্শ করতেন এবং বলতেন, সোজা হয়ে দাঁড়াও এবং বিভিন্নরূপে দাঁড়াইও না, তাতে তোমাদের অন্তরসমূহ বিভিন্ন হয়ে যাবে। (মুসলিম, মেশকাত: ১০৮৮)
সুয়াইদ ইবনে গাফালা (রহ) বলেন, নামাজের সময় বেলাল (রা.) আমাদের কাঁধ ও পা সোজা করতেন।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ৩৫৫৪; ফাতহুল বারি: ২/২৬১)
আবু উসমান আননাহদি (রহ) বলেন, আমি কাতার সম্পর্কে হজরত ওমরের চেয়ে অধিক যত্নশীল আর কাউকে দেখিনি। নামাজ আরম্ভের আগ মুহূর্তে সবার কাঁধ ও পায়ের দিকে তাকাতেন এবং (সামনের কাতার ফাঁকা থাকলে) লোক পাঠিয়ে পেছনের মুসল্লিদের সামনের কাতারে নিয়ে দাঁড় করাতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ৩৫৫৭)
আরও পড়ুন: নামাজে যেভাবে দাঁড়ানো অনুচিত
২. গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়ানো: নবীজি (স.) বলেন, ‘নবীজি (স.) বলেন, শোন! তোমরা ফেরেশতাদের মতো কাতারবন্দি হও। আমরা বললাম, তারা কীভাবে কাতারবন্দি হয়? নবীজি বললেন, তারা আগের কাতার পূর্ণ করে এবং গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়ায়। (সুনানে আবু দাউদ: ৬৬১; সহিহ মুসলিম: ৪৩০)
অন্য হাদিসে নবীজি (স.) বলেন, ‘তোমরা (চেপে চেপে দাঁড়িয়ে) কাতার মজবুত কর, কাতার কাছাকাছি কর এবং কাঁধ বরাবর কর। আল্লাহর কসম! আমি শয়তানকে কালো ছোট ছাগল ছানার মতো কাতারের মাঝে ঢুকতে দেখি।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৬৬৭; সুনানে নাসায়ি: ৮১৫)
বিজ্ঞাপন
অতএব, খালি জায়গা রেখে দাঁড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. কাতারে নরম ও বিনয়ী আচরণ: নবীজি (স.) বলেন, ‘কাতার ঠিক কর, কাঁধ সোজা কর, খালি জায়গা পূর্ণ কর, নরম হও।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৬৬৬)
‘তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে, নামাজে যার কাঁধ সবচেয়ে বেশি নরম। (অর্থাৎ কাতার সোজা করা বা খালি জায়গা পূরণ করার জন্য কেউ আগ-পর হতে বা ডানে বামে মিলতে বললে বিনয়ের সাথে তা গ্রহণ করে) (মুসান্নাফ আবদুর রাজজাক: ২৪৮০)
কাতার সোজা করতে বলা হলে বা জায়গা নিতে বলা হলে বিনয়ের সাথে সাড়া দেওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
আরও পড়ুন: নামাজের যেসব ভুল শোধরানো জরুরি
কাতারের শৃঙ্খলা বজায় রাখার নিয়ম
১. শ্রেণিবিন্যাস: প্রাপ্তবয়স্কদের সামনের কাতারে এবং শিশু-কিশোরদের পেছনের কাতারে দাঁড়ানো। হজরত ওমর (রা.) শিশুকে সামনের কাতারে দেখলে পেছনে পাঠিয়ে দিতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ৪১৯২)
২. দাঁড়ানোর ক্রম: ইমামের সরাসরি পেছন থেকে দাঁড়ানো শুরু করে ডানে ও বামে সমানভাবে কাতার পূর্ণ করতে হবে। (হাশিয়াতুত তাহতাবি, পৃ. ৩০৫; আলবাহরুর রায়েক: ১/৬১৮)
৩. সামনের কাতার আগে পূর্ণ করা: নবীজি (স.) বলেন, ‘প্রথমে সামনের কাতার পূর্ণ কর, অতঃপর তার পরের কাতার।’ (সুনান আবু দাউদ: ৬৭১)
প্রথম কাতারের ফজিলত অপরিসীম। নবীজি (স.) বলেন, ‘প্রথম কাতারের ফজিলত যদি তারা জানত, তাহলে সেখানে দাঁড়ানোর জন্য তারা অবশ্যই প্রতিযোগিতা করত।’ (সহিহ বুখারি: ৭২১)
৪. খালি জায়গা পূরণ করা: সামনে খালি জায়গা দেখলে দ্রুত সেখানে দাঁড়ানো গুরুত্বপূর্ণ আমল। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘কাতারের খালি জায়গা পূরণের জন্য যে কদম দেওয়া হয়, তার চেয়ে দামি কোনো কদম নেই।’ (মুসান্নাফ আবদুর রাজ্জাক: ২৪৭১)
আরও পড়ুন: জুমার আদব: মুসল্লিদের টপকে সামনে যাওয়া নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
সতর্কতা ও সাধারণ ভুল
১. কাতার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া: নবীজি (স.) সতর্ক করেছেন, ‘যে কাতারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করবে, আল্লাহ তার রহমত থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করবেন।’ (সহিহ ইবনে খুজাইমা: ১৫৪৯)
২. জামাতের জন্য দৌড়ানো: নামাজ শুরু হয়ে গেলে দৌড়ে যাওয়া নিষেধ। বরং শান্তভাবে হেঁটে এসে খালি জায়গায় দাঁড়ানোই আদব। ‘তোমাদের উচিত স্থিরতা ও গাম্ভীর্য অবলম্বন করা। তাড়াহুড়া করবে না। ইমামের সাথে যতটুকু পাও তা আদায় করবে, আর যা ছুটে যায় তা পূর্ণ করবে। (সহিহ বুখারি: ৬৩৬)
নামাজের কাতার সোজা করা নামাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাঁধ ও গোড়ালি মিলিয়ে, গায়ে গায়ে লেগে, সামনের কাতার প্রথমে পূর্ণ করে এবং খালি জায়গা দ্রুত পূরণ করার মাধ্যমে আমরা নামাজের কাতার সঠিকভাবে সোজা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নামাজের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




