পবিত্র ঈদুল আজহা মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য, ত্যাগের মহিমা এবং সামাজিক ভ্রাতৃত্বের অনন্য নিদর্শন। কোরবানির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশুর গোশত সঠিকভাবে বণ্টন করা। তবে অনেক সময় দেখা যায়, কেবল নিজেদের ফ্রিজ ভর্তি করার চিন্তায় আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের হকের কথা আমরা ভুলে যাই। এ বিষয়ে শরিয়তের সুনির্দিষ্ট বিধান জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি।
কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা
কোরবানির গোশত বণ্টনের বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুঃস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’ (সুরা হজ: ২৮) অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যে অভাবী মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায়, তাদেরকে খেতে দাও।’ (সুরা হজ: ৩৬)
রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা কোরবানির গোশত সংরক্ষণ করো, নিজেরা খাও এবং অন্যকে খাওয়াও।’ (সহিহ বুখারি: ৫৫৮৯) এসব দলিলের ভিত্তিতে ফিকহবিদগণ একমত হয়েছেন যে, কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করা মুস্তাহাব বা উত্তম। এক-তৃতীয়াংশ নিজের পরিবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর জন্য এবং অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনদের জন্য। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২২৪)
আরও পড়ুন: কোরবানির চামড়ার হক গরিবের, কিন্তু পাচ্ছে কারা?
আত্মীয়দের হক কতটুকু?
শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। আত্মীয়-স্বজনের হক এখানে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত। বিশেষ করে যারা অভাবী অথচ লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতেন না, তারা আমাদের কোরবানির গোশতের প্রধান দাবিদার। আত্মীয়দের না দিয়ে সবটুকু গোশত নিজেরা রেখে দেওয়া সুন্নাহর আদর্শ ও ইসলামের উদারতার পরিপন্থী।
আত্মীয়দের না দিলে কি গুনাহ হবে?
মাসয়ালাগতভাবে, যদি কোনো ব্যক্তি কোরবানির সবটুকু গোশত নিজের পরিবারের জন্য রেখে দেয়, তবে তার কোরবানি নষ্ট হবে না এবং একে সরাসরি ‘গুনাহ’ বলা যাবে না। তবে এটি একটি ‘খিলাফে আউলা’ বা অনুত্তম কাজ। এর ফলে ওই ব্যক্তি সুন্নাহর বরকত এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার যে মহান সওয়াব, তা থেকে বঞ্চিত হবেন। মনে রাখা প্রয়োজন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামে ফরজের কাছাকাছি গুরুত্ব পেয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪) তাই কোরবানির সুযোগে আত্মীয়দের বঞ্চিত করা রূহানিয়াত ও সামাজিক সম্প্রীতির অন্তরায়।
আরও পড়ুন: কোরবানির গোশত বণ্টনে যে ভুল করা যাবে না
একটি বিশেষ সতর্কতা: মান্নতের কোরবানি
সাধারণ কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া জায়েজ হলেও ‘মান্নত’ বা ওসিয়তের কোরবানির ক্ষেত্রে বিধান ভিন্ন। যদি কেউ কোনো মান্নত পূরণের উদ্দেশ্যে কোরবানি করেন, তবে সেই পশুর গোশত কোরবানিদাতা নিজে বা তার কোনো ধনী আত্মীয় খেতে পারবেন না। ওই পশুর সমস্ত গোশত দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ৫/২৯১)
কোরবানিকে সার্থক করতে হলে আমাদের মনের সংকীর্ণতা পরিহার করতে হবে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এবং গরিব-দুঃখীদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই হলো প্রকৃত কোরবানি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্নাহ অনুযায়ী সঠিকভাবে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




