সদকাতুল ফিতর ইসলামি সমাজব্যবস্থার এক অনুপম সৌন্দর্য। একদিকে এটি যেমন রোজাদারের সিয়াম পালনে ঘটে যাওয়া ভুলত্রুটির ক্ষতিপূরণ, অন্যদিকে এটি অভাবী মানুষের ঈদের আনন্দ নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম। তবে সদকাতুল ফিতর আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের অনেকের মধ্যেই কিছু অস্পষ্টতা কাজ করে, বিশেষ করে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এর হিসাব ও বিধান নিয়ে। আজকের আলোচনায় আমরা সদকাতুল ফিতরের গুরুত্ব, এর নিসাব এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরতদের জন্য এর সঠিক বিধানগুলো সহজভাবে তুলে ধরব।
ইসলামি শরিয়তে ‘ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন ও নারী-পুরুষ সবার ওপরই সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব’ (সহিহ বুখারি: ১৫১২)। এমনকি পবিত্র রমজানের শেষ দিনেও যে নবজাতক দুনিয়ায় এসেছে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার পক্ষ থেকেও সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/১৯২)
বিজ্ঞাপন
যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে যাওয়ার আগেই সদকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। তবে জাকাতের মতো রমজান মাসের যেকোনো সময়েও তা আদায় করা যায়।
প্রবাসী ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তিনি চাইলে সে দেশে সদকাতুল ফিতরা আদায় করতে পারেন, আবার চাইলে নিজে দেশেও প্রতিনিধির মাধ্যমে বা পরিবারের সদস্যের মাধ্যমে আদায় করতে পারবেন। এক্ষেত্রে বিধান হচ্ছে- যে দেশে অবস্থান করছেন সেই দেশের ফিতরার মূল্য ধরেই তা আদায় করতে হবে।
আরও পড়ুন: এবার সর্বনিম্ন ফিতরা ১১০ টাকা
ধরেন, কেউ যদি আরব আমিরাতের প্রবাসি হন তাহলে আরব আমিরাতের খাদ্যমূল্য অনুযায়ী তাকে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে; বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী নয়। আমিরাতে যত দিরহাম সদকাতুল ফিতর নির্ধারিত, সেটাকে বাংলায় কনভার্ট করে ওই টাকা সদকা দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
একইভাবে বিদেশে অবস্থানরত অভিভাবক যদি দেশে বসবাসরত অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ফিতরা আদায় করতে চান, তিনি দেশে বা প্রবাসে যেখানে খুশি সেখানেই তা আদায় করতে পারবেন, তবে তাকে বিদেশের হিসাব অনুযায়ী তা আদায় করতে হবে। কারণ নাবালেগ সন্তানের সদকাতুল ফিতর আদায় করা পিতার ওপর আবশ্যক। আর শরিয়তে ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে যার ওপর আবশ্যক সে যে স্থানে অবস্থান করছে সেখানকার দ্রব্যমূল্য ধরে আদায় করতে হবে, যাদের পক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে তাদের অবস্থান ধর্তব্য নয়।
বিষয়টি ব্যতিক্রম দেশে অবস্থানরত স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ক্ষেত্রে। প্রবাসে থেকে কেউ যদি দেশে থাকা স্ত্রী ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সদকা আদায় করতে চান, তাহলে তাকে দেশের হিসাবেই সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশের হিসেবে করলে আদায় হবে না। কারণ, স্ত্রী ও বালেগ সন্তানের সদকাতুল ফিতর তাদের নিজের ওপর আবশ্যক হয়, স্বামী বা বাবার ওপর নয়। তাই তাদের ফিতরা স্বামী বা বাবা আদায় করলে মূলত আদায়কারী তারা নিজেরাই। এজন্য তাদের অবস্থানস্থলের দ্রব্যমূল্য হিসাবে সদকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।
এই মূলনীতি জানা থাকলে এ ধরনের সব বিষয়ে সমাধান চলে আসে। যেমন বিদেশের অবস্থানরত কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে বাবা যদি দেশে নিজ সম্পদ দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করেন, তাহলে বিদেশের হিসাব অনুযায়ী আদায় করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার: ২/৩৫৫)
আরও পড়ুন: স্ত্রীর ফিতরা স্বামীর আদায় করা জরুরি?
সদকাতুল ফিতরের নিসাব জাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ। অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা তার সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অতিরিক্ত সম্পদ ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় কারো কাছে বিদ্যমান থাকলে তার ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। এতে জাকাতের মতো বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল কাদির: ২/২৮১)
পাঁচ ধরণের খাদ্যদ্রব্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা যায়। খেজুর, পনির, জব, কিসমিস এবং গম। সদকাতুল ফিতরের পরিমাণ সম্পর্কে শরিয়তে দুটি মাপকাঠি নির্ধারণ করা হয়েছে, তা হচ্ছে ‘এক সা’ বা ‘অর্ধ সা’। ১) খেজুর, পনির, জব ও কিশমিশ দ্বারা আদায়ের ক্ষেত্রে এক ‘সা’ বা ৩২৭০.৬০ গ্রাম (প্রায়)—অর্থাৎ তিন কেজি ২৭০ গ্রামের কিছু বেশি। ২) গম দ্বারা আদায় করতে চাইলে ‘অর্ধ সা’ বা ১৬৩৫.৩১৫ গ্রাম, অর্থাৎ এক কেজি ৬৩৫ গ্রামের কিছু বেশি প্রযোজ্য হবে। (আওজানে শরইয়্যাহ, পৃ-১৮)
দুটির যে কোনো একটিকে পরিমাপ ধরে আদায় করলে ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। অবশ্য যিনি সামর্থ্য অনুযায়ী যত বেশি আদায় করবেন তিনি তত বেশি সওয়াবের অধিকারী হবেন।




