পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনার পূর্ণতা ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জনে ‘সদকাতুল ফিতর’ বা ফিতরা এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ঈদের আনন্দ যেন সমাজের প্রতিটি স্তরে, বিশেষ করে অভাবী মানুষের ঘরে পৌঁছে যায়- ইসলাম সেই চমৎকার ব্যবস্থা রেখেছে এই ফিতরার মাধ্যমে। তবে ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে পরিবার ও অধীনস্তদের নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন জাগে। বিশেষ করে, স্ত্রীর ফিতরা আদায় করা স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকা প্রয়োজন।
সদকাতুল ফিতরের আবশ্যকতা ও নিসাব
ঈদুল ফিতরের দিন আদায় করা সদকাকেই মূলত সদকাতুল ফিতর বলা হয়। ইসলামি শরিয়তে এটি অত্যন্ত গুরুত্ববহ। হাদিস শরিফে এসেছে- ‘ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন ও নারী-পুরুষ সবার ওপরই এটি ওয়াজিব।’ (সহিহ বুখারি: ১৫১২)
আরও পড়ুন: ফিতরা কেন দেবেন, কাকে দিলে বেশি সওয়াব পাবেন
যার ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব, তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন, তেমনি নিজের অধীনদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। ফিতরার নিসাব হলো জাকাতের নিসাবের সমপরিমাণ সম্পদ থাকা। তবে জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদের ওপর পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত হলেও, ফিতরার ক্ষেত্রে এই বর্ষ অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়। (ফাতহুল কাদির: ২/২৮১)
এমনকি পবিত্র রমজানের শেষ দিনেও যদি কোনো নবজাতক দুনিয়ায় আসে কিংবা কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে, তবে তার পক্ষ থেকেও এই ফিতরা আদায় করতে হবে। (ফতোয়ায়ে আলমগিরি: ১/১৯২)
বিজ্ঞাপন
ফিতরা আদায়ের উদ্দেশ্য
রাসুলুল্লাহ (স.) সদকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন মূলত দুটি মহৎ উদ্দেশ্যে-
- রোজ পালনকালে অবচেতনভাবে হওয়া অর্থহীন ও অশালীন কথা বা কাজের মাধ্যমে রোজার যে ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ বা পবিত্রতা অর্জন।
- সমাজের নিঃস্ব ও অসহায় মানুষের আহারের সংস্থান করা। (আবু দাউদ: ১৬০৯)
আরও পড়ুন: সর্বনিম্ন কত টাকা থাকলে জাকাত ফরজ?
স্ত্রীর ফিতরা ও স্বামীর দায়িত্ব
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে- স্ত্রীর ফিতরা কি স্বামীকেই আদায় করতে হবে? অর্থাৎ স্ত্রীর পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা কি স্বামীর জন্য ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক?
নির্ভরযোগ্য ইসলামি আইনবিদ ও ফিকহবিদদের মতে, এর উত্তর হলো- ‘না’। অর্থাৎ স্ত্রীর পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করা স্বামীর জন্য ‘ওয়াজিব’ নয়। তবে স্ত্রীর ফিতরা স্বামী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আদায় করে দিলে তা আদায় হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ফিতরা আদায়ের আগে স্ত্রীকে অবগত করে নেওয়া উত্তম; তবে না জানালেও ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। (ফতোয়া খানিয়া: ১/২২৮; আলবাহরুর রায়েক: ২/২৫২; ফতোয়া বাজজাজিয়া: ৪/১০৬; তাতারখানিয়া: ২/৪২৪; হেদায়া: ১/২০৯; দুররে মুখতার: ৩/৩৮৫)
সন্তান ও গৃহকর্মীদের ফিতরা
- নাবালেগ সন্তান: নাবালেগ সন্তানের পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর আদায় করা পিতার ওপর ওয়াজিব। তবে সন্তান যদি নিজেই মালিকে নিসাব হয় (নিজস্ব সম্পদ থাকে), তবে তার সম্পদ থেকে ফিতরা আদায় করা হবে। (শরহে বেকায়া: ১ম খণ্ড)
- বালেগ সন্তান: বুদ্ধিমান ও প্রাপ্তবয়স্ক (আকেল-বালেগ) সন্তানের ফিতরা আদায় করা বাবার জন্য জরুরি নয়। কিন্তু সন্তান যদি বাবার লালন-পালনে থাকে এবং পিতা নিজের থেকে আদায় করে দেন, তবে তা জায়েজ হবে। (বাহরুর রায়েক: ২/২৫২; হেদায়া: ১/২০৯; বাদায়েউস সানায়ে: ২/৫৩৩-৫৩৬)
- গৃহকর্মী: নিজ ঘরের কাজের লোকদের পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর আদায় করা সওয়াবের কাজ এবং তা করা উচিত, তবে এটি বাধ্যতামূলক বা আবশ্যক নয়। (কিতাবুল ফতোয়া: ৩/৩৫৭)
সদকাতুল ফিতর কেবল একটি দান নয়, বরং এটি সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য নিদর্শন। পরিবারের কর্তা হিসেবে সামর্থ্য থাকলে স্ত্রী ও পরিজনের ফিতরা আদায় করে দেওয়া সৌহার্দ্য ও সওয়াবের পরিচায়ক। রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে ইবাদতকে আল্লাহর দরবারে কবুল করানোর এই সুযোগ আমাদের সবার হাতছাড়া করা উচিত নয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহভাবে শরিয়তের বিধানগুলো পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।




