একজন মানুষ যখন বিদেশে পাড়ি জমান, তার চোখে থাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করার স্বপ্ন, নিজের একটি ঘর করার স্বপ্ন। কেউ কারখানায় কাজ করেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ দোকানে, কেউ রেস্টুরেন্টে, কেউবা অফিসে। মাস শেষে কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ দেশে পাঠান। সেই অর্থে চলে সংসার, সন্তানের পড়াশোনা, বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসা কিংবা নতুন কোনো স্বপ্নের শুরু। কিন্তু কখনো কখনো সেই স্বপ্নের মানুষটিই আর জীবিত হয়ে দেশে ফেরেন না। ফেরেন একটি কফিনে।
তখন পরিবারের কাছে বিদেশ আর স্বপ্নের জায়গা থাকে না। দূরদেশের একটি শহর হয়ে ওঠে শোকের ঠিকানা। আর শুরু হয় আরেকটি সংগ্রাম-প্রিয় মানুষটির মরদেহ কীভাবে দেশে ফিরবে? এ প্রশ্নটি যতটা মানবিক, ততটাই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রবাসে বাংলাদেশি কর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা কম নয়। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩ জন প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। ২০২৩ সালেও এই সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫৫২।
এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি মা, একজন স্ত্রী, কয়েকটি সন্তান, কিছু অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং একটি অপেক্ষমাণ বাড়ি।
আমরা যখন প্রবাসীদের কথা বলি, তখন সাধারণত রেমিট্যান্সের কথা বলি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কথা বলি। অর্থনীতিতে তাদের অবদানের কথা বলি। কিন্তু প্রবাসীর জীবনের শেষ অধ্যায়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
প্রশ্ন হলো, একজন প্রবাসী জীবিত অবস্থায় দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন, অথচ মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারকে যদি অনিশ্চয়তা, কাগজপত্র, অর্থসংকট ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে আমাদের প্রবাসী কল্যাণনীতিকে আরও মানবিক ও কার্যকর করার প্রয়োজন নেই কি?
অবশ্যই রাষ্ট্রের কিছু ব্যবস্থা রয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সনদে প্রবাসে মৃত কর্মীদের মরদেহ দেশে ফেরত আনা এবং আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডও মৃত কর্মীর পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর পর পরিবারকে ৩ লাখ টাকা আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাতেও এর উদাহরণ দেখা গেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্যে নিহত এক প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনার পর ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পক্ষ থেকে দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা, তাৎক্ষণিক ৫০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তার কথা জানানো হয়।
অর্থাৎ ব্যবস্থা একেবারেই নেই, তা বলা যাবে না। বরং প্রশ্ন হলো, ব্যবস্থাটি কি আরও দ্রুত, সহজ, পর্যাপ্ত এবং পরিবারবান্ধব করা যায় না?
কারণ শোকের মুহূর্তে একটি পরিবারকে শুধু টাকা নয়, একটি সহজ পথও প্রয়োজন।
বিদেশে মৃত্যু হলে মরদেহ দেশে পাঠানোর আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মৃত্যু সনদ, চিকিৎসা বা ফরেনসিক কাগজপত্র, পাসপোর্ট, দূতাবাসের অনুমোদন, বিমান কার্গো এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। ইউরোপের বিভিন্ন বাংলাদেশি মিশনের নির্দেশনাতেও এ ধরনের নথিপত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ রয়েছে।
কাগজপত্রের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু শোকাহত পরিবার যেন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে না হয়, সেটিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
বিশেষ করে যেসব পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল, তাদের জন্য বিষয়টি আরও কঠিন। বিদেশে কর্মরত একজন মানুষ অনেক সময় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যু মানে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া। তার ওপর যদি মরদেহ দেশে ফেরানোর জন্য বড় অঙ্কের অর্থের ব্যবস্থা করতে হয়, তাহলে শোকের সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি অর্থনৈতিক সংকট।
তখন দেখা যায়, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এবং প্রবাসী কমিউনিটির মানুষের কাছে সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কেউ কেউ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়াচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে মানবিকতার সুন্দর দৃষ্টান্ত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জায়গায় একটি পরিবারকে বারবার সামাজিক অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হবে কেন?
প্রবাসীদের জন্য একটি জাতীয় মরদেহ প্রত্যাবাসন নীতি আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি।
প্রথমত, প্রতিটি বাংলাদেশি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে মরদেহ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি ২৪ ঘণ্টার জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যরা একটি নম্বরে ফোন করে জানতে পারবেন, কী করতে হবে, কোন কাগজ লাগবে, কোথায় আবেদন করতে হবে এবং কত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা।
দ্বিতীয়ত, পুরো প্রক্রিয়াকে একটি ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সিস্টেমের আওতায় আনা যেতে পারে। পরিবার দেশে বসেই আবেদন করবে, প্রয়োজনীয় নথি আপলোড করবে এবং অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি দেখতে পারবে।
তৃতীয়ত, সরকার বিভিন্ন দেশের বিমান সংস্থা, কার্গো কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা করতে পারে, যাতে মরদেহ পরিবহনের খরচ কমানো যায় এবং জরুরি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে পরিবহনের ব্যবস্থা করা যায়।
চতুর্থত, প্রবাসীদের জন্য কম খরচে একটি Repatriation Insurance বা মরদেহ দেশে ফেরানোর বিমা চালু করা যেতে পারে। বিদেশে যাওয়ার আগে সামান্য একটি প্রিমিয়ামের মাধ্যমে একজন কর্মী এই সুরক্ষার আওতায় আসতে পারেন। সরকার, নিয়োগকর্তা ও কর্মী-তিন পক্ষের অংশগ্রহণে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।
পঞ্চমত, প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশিদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে আরও কার্যকর গবেষণা প্রয়োজন। ২০২৪ সালে ৪ হাজার ৮১৩টি মরদেহ দেশে ফেরার তথ্য শুধু প্রত্যাবাসনের হিসাব নয়; এটি একটি জনস্বাস্থ্য ও শ্রম-নিরাপত্তার প্রশ্নও। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার পাশাপাশি স্ট্রোক, হৃদ্রোগ ও অন্যান্য অসুস্থতার কথাও উঠে এসেছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দেশভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। পরিবারটি কী অবস্থায় আছে, সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, ঋণ কীভাবে পরিশোধ হবে, স্ত্রী বা মা-বাবার ভবিষ্যৎ কী হবে-এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
একজন প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর সঙ্গে একটি পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও অনেক সময় শেষ হয়ে যায়।
তাই মৃত কর্মীর পরিবারের জন্য বিদ্যমান আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ নন। তারা বাংলাদেশের অর্থনীতির অংশ, পরিবারের স্বপ্নের বাহক এবং দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারের প্রতিনিধি। তাদের ঘামের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। তাই তাদের জীবনের নিরাপত্তার পাশাপাশি মৃত্যুর পর মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ হওয়া উচিত।
২০২৬ সালের জুনে সংসদীয় আলোচনাতেও প্রবাসী কল্যাণ, দ্রুত পাসপোর্ট সেবা, বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের সহায়তা এবং মৃত কর্মীদের মরদেহ দেশে ফেরানোর জটিলতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নীতির আলোচনার অংশ।
একজন বাবা বিদেশে গিয়েছিলেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। একজন স্বামী গিয়েছিলেন পরিবারের অভাব দূর করতে। একজন সন্তান গিয়েছিলেন বৃদ্ধ মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় যখন তিনি আর জীবিত ফেরেন না, তখন অন্তত তার শেষ যাত্রাটি যেন পরিবারের জন্য নতুন কোনো যুদ্ধ না হয়।
আমরা চাই না কোনো মা তার সন্তানের মরদেহ দেশে আনার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরুন। কোনো স্ত্রীকে যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বামীর কফিনের জন্য অর্থ সহায়তা চাইতে না হয়। কোনো সন্তান যেন বাবার শেষ বিদায়ের খরচ নিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রের কাছে তাই আমাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়। শুধু চাই, প্রবাসীর শেষ যাত্রাটুকু যেন মর্যাদাপূর্ণ হয়।
জীবিত অবস্থায় যে মানুষটি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন, মৃত্যুর পর তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বও রাষ্ট্র মানবিকতার সঙ্গে পালন করবে-এটাই একটি কল্যাণরাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
বিদেশের মাটিতে মৃত্যু হয়তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু মৃত্যুর পর দেশে ফেরার পথটি যেন কোনো পরিবারের জন্য অসহনীয় কষ্টের না হয়, সেটি নিশ্চিত করা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, পর্তুগাল বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (PBCCI); সম্পাদক, ইউরোবাংলা




