আগের জায়গায় কি ফিরতে পারবেন জাহাঙ্গীর?

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:০৭ পিএম
আগের জায়গায় কি ফিরতে পারবেন জাহাঙ্গীর?

গাজীপুরের রাজনীতিতে অনেকটা হঠাৎ করেই উত্থান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমের। ২০১৩ সালে মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন গাজীপুর সদর উপজেলার সাবেক এই ভাইস চেয়ারম্যান। তবে সেই বার আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের অনুরোধে সরে দাঁড়ান তিনি। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী আজমত উল্লাহ খানের পরাজয়ে তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। ২০১৮ সালে গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হন জাহাঙ্গীর। মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও পান। এতে ঢাকার পাশের গুরুত্বপূর্ণ এই সিটিতে বেশ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তরুণ এই রাজনীতিক।

আরও পড়ুন: শর্তসাপেক্ষে গাজীপুরের জাহাঙ্গীরকে ক্ষমা করল আ.লীগ

কিন্তু ২০২১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঘরোয়া আলোচনার রেকর্ড ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর কোণঠাসা হয়ে পড়েন জাহাঙ্গীর। খুব অল্প সময়ের মধ্যে সবকিছু বদলে যায়। বহিষ্কার করা হয় দল থেকে। বরখাস্ত করা হয় মেয়র পদ থেকেও।

তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে দল তার প্রতি নমনীয় হয়েছে। শর্তসাপেক্ষে জাহাঙ্গীরের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করেছে আওয়ামী লীগ। আনুষ্ঠানিকভাবে দলের এমন সিদ্ধান্ত আসার পর অনেকটা উজ্জীবিত জাহাঙ্গীরপন্থীরা। যদিও জাহাঙ্গীর নিজে এখনও অনেকটা নীরব। ঘনিষ্ঠজনরা বলছেন, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন সাবেক এই ছাত্রলীগ নেতা।

বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হওয়ার পর তিনি মেয়র পদ ফিরে পেতে পারেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন এলজিআরডিমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। অবশ্য মেয়র পদ পেলেও জাহাঙ্গীর আবার দলে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় আছে ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যেও।

jahangir2

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দল থেকে ক্ষমা পেতে পারেন এমন সিদ্ধান্ত শোনার পরই চাঙ্গা হয়ে উঠতে থাকেন জাহাঙ্গীরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতরা। তবে গাজীপুরের পদধারী নেতাদের মধ্যে সেভাবে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়নি।

আরও পড়ুন: মেয়র পদ ফিরে পাচ্ছেন জাহাঙ্গীর!

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাক্ষরিত চিঠি গত ১ জানুয়ারি ইস্যু করা হলেও শনিবার (২১ জানুয়ারি) চিঠির বিষয়টি সামনে আসে। এরপর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আরও বেড়ে গেছে।

অন্যান্য বছর ইজতেমাকে ঘিরে বেশ সক্রিয় থাকলেও এবার সেভাবে সরব দেখা যায়নি জাহাঙ্গীরকে। পাশাপাশি দলে ফেরার গ্রিন সিগন্যাল পেলেও কোনো দলীয় কর্মকাণ্ডে তার দেখা মেলেনি বলে জানা গেছে।

কী ছিল সেই ভিডিওতে

ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করতে শোনা যায় জাহাঙ্গীরকে। এরপর আওয়ামী লীগের একটি অংশ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভে নামে। জেলায় জেলায় তার বিরুদ্ধে দেওয়া হয় মামলা। ফলে হঠাৎ যেন শূন্যে নেমে আসেন এই রাজনীতিক।

এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভের মধ্যে ২০২১ সালের ৩ অক্টোবর জাহাঙ্গীরের ব্যাখ্যা চায় আওয়ামী লীগ। তাকে ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়। ১৮ অক্টোবর তিনি লিখিতভাবে ব্যাখ্যা দেন। ব্যাখ্যা মনোপূত না হওয়ায় ওই বছরের ১৯ নভেম্বর দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে জাহাঙ্গীরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

jahangir3

তাকে বহিষ্কারের পর গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয় মো. আতাউল্লাহ মণ্ডলকে। তিনি মহানগর কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

কী কী কারণে মেয়র পদ হারান

এদিকে দল থেকে বহিষ্কারের সপ্তাহ না পার হতেই ওই বছরের ২৫ নভেম্বর জাহাঙ্গীর আলমকে মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনে কী কী কারণে জাহাঙ্গীর আলমকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাও উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন: ‘জাহাঙ্গীরের মেয়র পদে ফেরার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন’

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া দরপত্র, নির্দিষ্ট কোম্পানিকে দর দেওয়ার অনুরোধসংক্রান্ত (আরএফকিউ) দরপত্রে অনিয়ম, বিভিন্ন পদে অযৌক্তিক লোকবল নিয়োগ, ভুয়া ভাউচার, অর্থ আত্মসাৎ, হাটবাজার ইজারার টাকা নির্ধারিত খাতে জমা না রাখার অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এছাড়া ভূমি দখল ও ক্ষতিপূরণ ছাড়া রাস্তা প্রশস্তকরণসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের মতামত জানতে চাওয়া হলেও মতামত দেওয়া হয়নি।

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, উল্লিখিত অভিযোগগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার, বিধিনিষেধের পরিপন্থী কার্যকলাপ দুর্নীতি ও ইচ্ছাকৃত অপশাসনের শামিল, যা সিটি করপোরেশন আইনানুযায়ী অপসারণযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ তদন্ত কার্যক্রম শুরু করার মাধ্যমে সিটি করপোরেশন অপসারণের কার্যক্রমও শুরু করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলমকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়রের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।

সক্রিয়তা দেখা যায় দুদকেরও

মেয়র পদ হারানোর পর জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সিটি করপোরেশনের নামে ‘ভুয়া’ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। গত বছরের ২৬ জুন এই সিদ্ধান্ত জানায় দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।

আরও পড়ুন: জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে মানহানি মামলার কার্যক্রম হাইকোর্টে স্থগিত

jahangir4

ওই ‘ভুয়া’ অ্যাকাউন্টে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সিটি করপোরেশনের নামে কয়েক কোটি টাকা জমা এবং উত্তোলনের কথা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

যে প্রক্রিয়ায় ক্ষমা পেলেন জাহাঙ্গীর

রাজনীতিতে সব ধরনের ক্ষমতা হারিয়ে যখন ‘একা’ হয়ে পড়েন এক সময়ের প্রভাবশালী জাহাঙ্গীর তখন তার মতো দল থেকে বহিষ্কার করা আরও অনেককে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ। দল থেকে ক্ষমা করে দেওয়ার যে চিঠি দেওয়া হয় জাহাঙ্গীরকে, তা গত শনিবার গণমাধ্যমের হাতে আসে।

শুরু থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও দলের চিঠিতে বলা হয়েছে, ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ায় ভবিষ্যতে সংগঠনের গঠনতন্ত্র, নীতি ও আদর্শ পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপে সম্পৃক্ত হবেন না মর্মে লিখিত অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। যে কারণে গত ১৭ ডিসেম্বর ভবিষ্যতে সংগঠনের স্বার্থপরিপন্থী কর্মকাণ্ড ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে ক্ষমা করার কথা বলা হয়।

ভবিষ্যতে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে আর ক্ষমা মিলবে না বলেও হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।

বিইউ/জেবি