শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে দ্বিমুখী চাপ, ক্রয়াদেশ নিয়ে শঙ্কা

মহিউদ্দিন রাব্বানি
প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২১ পিএম

শেয়ার করুন:

ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে দ্বিমুখী চাপ, ক্রয়াদেশ নিয়ে শঙ্কা
পোশাক শিল্প। ছবি: এআই
  • ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমছে বেশি হারে
  • চীন-ভিয়েতনামের অগ্রগতিতে বাড়ছে প্রতিযোগিতার চাপ
  • বিক্ষোভের চেয়ে বড় উদ্বেগ অর্থনৈতিক মন্থরতা
  • সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধে বাড়তি ব্যয়ের চাপ
  • ক্রয়াদেশ চলে যেতে পারে প্রতিযোগী দেশগুলোতে

ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বাংলাদেশের রফতানি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। বিপরীতে চীন ও ভিয়েতনাম থেকে পোশাক আমদানি বেড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ এবং সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধের কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যে ইউরোপের অর্থনৈতিক মন্থরতা ও বিভিন্ন দেশে অসন্তোষের প্রভাবও পোশাকের চাহিদায় পড়তে পারে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা থাকা ক্রয়াদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউর মোট পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের বাজার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রফতানি আরও দ্রুত কমেছে। এই ব্যবধান বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য ৬২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ৬০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানির মূল্য ১৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ১১ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে। এতে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো।

রফতানি কমার পেছনে শুধু পোশাকের চালান হ্রাস নয়, গড় মূল্য কমে যাওয়ারও প্রভাব রয়েছে। আট মাসে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক সরবরাহের পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় একক মূল্য ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে, যা ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।

অর্থাৎ, কম পরিমাণ পোশাক রফতানির পাশাপাশি প্রতি কেজিতে কম আয়ও সামগ্রিক রফতানি মূল্য কমিয়েছে। অবশ্য পোশাকের ধরন ও মানের পরিবর্তনও গড় মূল্য কমার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

অন্যদিকে, একই সময়ে ইইউর বাজারে চীন থেকে পোশাক আমদানি বেড়েছে ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ফলে সামগ্রিক বাজারে চাহিদা কমলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর রফতানি বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

তবে পুরো চিত্র একমুখী নয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এতে বোঝা যায়, নির্দিষ্ট সময়ের পরিসংখ্যান ও হিসাবের ভিত্তি বিবেচনায় নিয়েই বাজারের প্রবণতা মূল্যায়ন করা জরুরি।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আবাসন সংকট নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব পোশাকের চাহিদায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রফতানিকারকেরা। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোক্তারা পোশাকসহ অপ্রয়োজনীয় পণ্যে ব্যয় কমাতে পারেন। এতে খুচরা বিক্রেতাদের নতুন পণ্য কেনার পরিকল্পনা ও আমদানিকারকদের ক্রয়াদেশ প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের রফতানি কমার জন্য বিক্ষোভকেই এককভাবে দায়ী করছেন না খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্থরতা, ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানিয়েছেন, ফ্রান্সের এক ক্রেতা আগে সমঝোতা হওয়া একটি ক্রয়াদেশ স্থগিত রাখতে বলেছেন। ফ্রান্সে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। তবে ওই ক্রয়াদেশ স্থগিতের সঙ্গে বিক্ষোভের সম্পর্ক কতটা, তা নিশ্চিত নয়।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বারও মনে করেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে, স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলামের মতে, ক্রয়াদেশ কমার পেছনে বিক্ষোভের চেয়ে ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রভাব বেশি।

ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের মে মাসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ১ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পোশাকের চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়লেও প্রবৃদ্ধি কমার সঙ্গে আমদানি একই হারে কমবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

ইউরোপের বাজারে চাহিদা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দিতে নিট পোশাকে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করেছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের আমদানি করা সুতার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হচ্ছে। রফতানি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পর গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে।

রফতানিকারকদের দাবি, এতে আমদানি প্রক্রিয়া জটিল হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। তাঁরা জানান, আমদানি করা প্রতি কেজি ৩০ কাউন্টের কম্বড সুতার দাম ৩ দশমিক ১৫ ডলার। একই ধরনের সুতা দেশে কিনতে খরচ হয় ৩ দশমিক ৭৫ ডলার। তাঁদের হিসাবে, দেশীয় সুতা ব্যবহারে প্রতি পোশাকের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৫ সেন্ট বাড়তে পারে। অথচ ইউরোপের অধিকাংশ ক্রেতা বাড়তি দাম দিতে রাজি নন বলে দাবি তাঁদের।

আগামী এক মাসের মধ্যে সুতা আমদানির বিধিনিষেধ প্রত্যাহার না হলে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা থাকা কিছু ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও পাকিস্তানে চলে যেতে পারে।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের চ্যালেঞ্জ এখন শুধু চাহিদা কমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রফতানির গড় মূল্য হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগীদের এগিয়ে যাওয়ার চাপও একসঙ্গে কাজ করছে। ইউরোপের বিক্ষোভ এই পরিস্থিতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তবে রফতানি কমার প্রধান কারণ হিসেবে এর প্রভাব এখনো নিশ্চিত নয়। ক্রয়াদেশ ধরে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কাঁচামালের প্রতিযোগিতামূলক দাম নিশ্চিত করা, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার করাই এখন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এমআর/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর