শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট বন্ধ, বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকি কতটা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট বন্ধ, বাংলাদেশের ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকি কতটা?
সাইবার হামলার আশঙ্কা, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ। ছবি: সংগৃহীত

সাইবার হামলার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটেও। পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে বন্ধ রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইট। তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও দেশের ব্যাংকিং লেনদেন স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের ভাষ্য, লেনদেন চললেও গতি কিছুটা কমেছে। ফলে ওয়েবসাইটের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও গ্রাহকদের ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্নের খবর পাওয়া যায়নি।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায়নি। সাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে সাময়িকভাবে সেবা বন্ধ থাকার বার্তা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিবিসি বাংলাকে জানান, বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে যত দ্রুত সম্ভব এটি চালুর চেষ্টা চলছে। তবে কবে নাগাদ ওয়েবসাইট চালু হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও লেনদেন চলছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও দেশের ব্যাংকিং কার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, তাঁদের ব্যাংকের লেনদেন বা কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও জানিয়েছেন, লেনদেন চলছে, তবে গতি কিছুটা কম। ওয়েবসাইটে কোনো ত্রুটি রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে সাইট বন্ধ থাকায় ঠিক কোন কোন সেবা ব্যাহত হচ্ছে, তা তিনি জানাতে পারেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সাধারণত অর্থনৈতিক তথ্য, নীতিমালা, প্রজ্ঞাপন ও পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। এসব তথ্য সংগ্রহ করেন সাধারণ মানুষ, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষকেরা। ফলে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় এসব তথ্য পেতে সাময়িক অসুবিধা হচ্ছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট মূলত তথ্য সরবরাহের জন্য। এর সঙ্গে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক নেই।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেনও জানান, ওয়েবসাইট ও ব্যাংকের লেনদেনব্যবস্থা আলাদা। গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেন পরিচালিত হয় পৃথক কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে।

পিএইচপির ত্রুটিতে কী ঝুঁকি?

পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা। অনলাইন শপ, উইকিপিডিয়া ও ওয়ার্ডপ্রেসসহ অসংখ্য ওয়েবসাইট ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এটি ব্যবহৃত হয়।

সম্প্রতি এই প্রোগ্রামিং ভাষায় দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হয়েছে। এসব ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা ঝুঁকিপূর্ণ সার্ভারে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করতে এবং বিভিন্ন নির্দেশনা কার্যকর করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বাংলাদেশের সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের চিফ ডিজিটাল অফিসার খালিদ হোসেনের ভাষ্য, এসব ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হ্যাকাররা কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এতে ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য পরিবর্তন বা বিকৃত করা কিংবা নিজেদের পছন্দমতো বার্তা ও ছবি প্রদর্শন করা সম্ভব।

তবে কোনো ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়া মানেই গ্রাহকদের অর্থ বা লেনদেনের তথ্য চুরি হয়ে যাওয়া নয়। সাধারণত ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি, বার্ষিক প্রতিবেদন ও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত তথ্য থাকে। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সংরক্ষিত থাকে আলাদা ব্যবস্থায়।

খালিদ হোসেন জানান, ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা পৃথক কোডিং ও প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হয়। এসব ব্যবস্থায় একাধিক স্তরের নিরাপত্তা থাকে। সাইবার হামলার আশঙ্কার পর তাঁদের ব্যাংক নিজেদের চার-পাঁচটি ওয়েব পোর্টালের নিরাপত্তা পরীক্ষা করেছে। কয়েকটি পোর্টাল সাময়িকভাবে বন্ধ রেখে প্রয়োজনীয় হালনাগাদ করার পর আবার চালু করা হয়েছে।

তবে সাইবার হামলার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।

হামলার আশঙ্কায় ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার কারণ

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাইবার হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা যেতে পারে। এতে নিরাপত্তার ত্রুটি কাজে লাগিয়ে হ্যাকারদের প্রবেশের ঝুঁকি কমানো এবং প্রয়োজনীয় হালনাগাদ ও পরীক্ষা চালানোর সুযোগ তৈরি হয়।

খালিদ হোসেনের মতে, বিশ্বজুড়েই এ ধরনের পরিস্থিতিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকা ওয়েবসাইট অফলাইনে নেওয়ার চর্চা রয়েছে। নিরাপত্তা হালনাগাদের পর সেটি পরীক্ষা ও পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিতে সময় লাগে।

ফাহিম মাশরুরও মনে করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে যথাযথ। তবে ওয়েবসাইটটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। নিরাপত্তা ত্রুটি সমাধান করে কত দ্রুত সাইট চালু করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকগুলোকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটির কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রায় ১৫ দিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছিল। তবে সেই নির্দেশনায় বর্তমান সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত ছিল না।

গত ১৯ অক্টোবর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের এক পরিপত্রে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে নিয়মিত নিরাপত্তাঝুঁকি যাচাই, সন্দেহজনক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, বিশেষায়িত দল গঠন, গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যাকআপ রাখা এবং হামলার পর দ্রুত কার্যক্রম স্বাভাবিক করার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হয়।

এরপর গত বৃহস্পতিবার বিজিডি ই-গভ সার্ট পিএইচপির দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে সতর্কতা জারি করে। পিএইচপি ব্যবহারকারী সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। তাৎক্ষণিকভাবে হালনাগাদ সম্ভব না হলে সার্ভারে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়।

খালিদ হোসেন জানান, গত বুধবার দুপুর থেকেই সার্ট ব্যাংকগুলোকে অভ্যন্তরীণভাবে সাইবার হামলার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করছিল।

বিশ্বজুড়ে ওয়েবসাইট বন্ধ

পিএইচপির নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। রয়টার্সের খবরে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে।

ফিনল্যান্ডের সরকার, এডিনবরা কাউন্সিল ও বিবিসি তাদের কিছু সাইট বা পেজ অফলাইনে নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাও তাদের ওয়েবসাইট সরিয়ে নিয়েছে। উইকিমিডিয়াসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা উইজের গবেষকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় ত্রুটিগুলো শনাক্ত করেন। সংস্থাটি এগুলোকে এআইয়ের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে বর্ণনা করেছে। ওপেনএআইও আবিষ্কারটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ত্রুটিগুলোর প্রযুক্তিগত বিবরণ প্রকাশ্যে আসায় আগামী সপ্তাহগুলোতে এগুলো কাজে লাগিয়ে হামলার চেষ্টা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় না বা নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত সম্পদ নেই, সেগুলো বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়েবসাইট বন্ধ থাকলেও ব্যাংকিং লেনদেন চলছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর ওয়েবসাইটটি আবার চালু করাই এখন কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য।

এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর