মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আলোচনায় একযোগে ৩৪ এমপির বিদেশ সফর, ‘স্বাভাবিক’ বলছে জামায়াত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৫ এএম

শেয়ার করুন:

আলোচনায় একযোগে ৩৪ এমপির বিদেশ সফর, ‘স্বাভাবিক’ বলছে জামায়াত
জামায়াত এমপিদের সাত দিনের এই সফরে সঙ্গে রয়েছে পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭১ জন / সংগৃহীত ছবি

রাজপথে ১১ দলীয় ঐক্যের ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি, সামনে আরও লংমার্চ ও মহাসমাবেশ— এমন রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর ৩৪ সংসদ সদস্যের একযোগে বিদেশ সফর নিয়ে চলছে নানা সমালোচনা। ১৭ দিনের এই সফরে এমপিদের সঙ্গে রয়েছেন পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭১ জন। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন ঘুরে সৌদি আরবে ওমরাহ পালনের কথা রয়েছে তাদের। তবে লংমার্চ কর্মসূচির সময় দলের এতসংখ্যক এমপির একসঙ্গে দেশের বাইরে অবস্থান করাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন মোটামুটি সরগরম।

জামায়াতের পক্ষ থেকে অবশ্য বিষয়টিকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখানো হচ্ছে। দলটির নেতাদের ভাষ্য, সফরটি আকস্মিক নয়; আগে থেকেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জাতীয় সংসদের অধিবেশন না থাকায় এমপিরা নিজেদের উদ্যোগে একসঙ্গে বিদেশ সফরে গেছেন। দলের পক্ষ থেকে সফরটিকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও অভিজ্ঞতা অর্জনের কর্মসূচি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। কারও কারও ভাষ্যে, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, সংসদীয় রীতি, অর্থনীতি ও উন্নয়ন সম্পর্কে ধারণা নেওয়াই এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রাপ্ততথ্য অনুযায়ী, সফরকারী দলের সদস্যরা ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর দুই দফায় মালয়েশিয়ায় পৌঁছান। সেখানে কয়েক দিন অবস্থানের পর ১৭ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে যান। এরপর ফিলিপাইনে পৌঁছেছেন তারা। ২৪ সেপ্টেম্বর ফিলিপাইন থেকে সৌদি আরব যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পথে বাহরাইনে যাত্রাবিরতির পর ওমরাহ পালন শেষে ৩০ সেপ্টেম্বরের দিকে দেশে ফেরার কথা রয়েছে সফরকারীদের।

সফরে থাকা ৩৪ এমপির মধ্যে ২৫ থেকে ২৬ জন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়েছেন বলে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, সাবেক এমপি মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান এবং লেখক জিয়াউল হক। সব মিলিয়ে সফরকারী দলের সদস্য সংখ্যা ৭১ জন।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানকালে জামায়াতের এমপিরা দেশটির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও কেদিলান রাকাইয়াতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক ব্যুরোর প্রধান মাসজলি মালিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি ও কুয়ালালামপুরের বিভিন্ন স্থাপনা পরিদর্শন করেন তারা। মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য এই সফর আলোচনার আরেকটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিঙ্গাপুরে গিয়ে এমপিরা নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করেন এবং একটি সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। সেখানে সিঙ্গাপুরের উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফিলিপাইনেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে সফরটি পুরোপুরি পারিবারিক ভ্রমণ, নাকি এর পাশাপাশি অভিজ্ঞতা ও মতবিনিময়ের কিছু কর্মসূচিও রয়েছে— এ নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে সফরের সময়কাল নিয়ে। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য যখন একাধিক দাবিতে ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে, তখন দলের ৩৪ এমপির একযোগে বিদেশে অবস্থান রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছে ঐক্যটি। এসব কর্মসূচিতে ঐক্যের শীর্ষ নেতারা অংশ নিলেও সংসদ সদস্যদের বড় একটি অংশ তখন দেশের বাইরে ছিলেন।

বিশেষ করে ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চের সময়ও ৩৪ এমপির বিদেশ সফর চলমান ছিল। এ কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, একটি বিরোধী ঐক্য যখন রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি দিচ্ছে এবং সংসদ সদস্যদেরও সেই কর্মসূচিতে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার প্রত্যাশা রয়েছে, তখন এতসংখ্যক এমপির একসঙ্গে বিদেশে থাকা কতটা স্বাভাবিক। অন্যদিকে জামায়াতের বক্তব্য হলো, সফরটি আগে থেকেই নির্ধারিত এবং সংসদের অধিবেশন না থাকায় এমপিদের ব্যক্তিগত সময় ব্যবহারের বিষয়টি দলীয় কর্মসূচির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।

দলটির নেতারা আরও বলছেন, সফরটি কোনো রাষ্ট্রীয় সফর নয়। এটিকে আনুষ্ঠানিক দলীয় রাজনৈতিক সফর হিসেবেও দেখছে না জামায়াত। বরং বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ও সংসদীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটানো এবং ওমরাহ পালন— সব মিলিয়েই সফরটির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

জামায়াতের সফরকারী কয়েকজন এমপির বক্তব্যেও একই ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য, দলের অনেক নতুন সংসদ সদস্যের আগে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। উন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো, সংসদীয় সংস্কৃতি এবং উন্নয়নের অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখার উদ্দেশ্যে সফরটি করা হচ্ছে। এ কারণে তারা এটিকে প্রশিক্ষণ বা জ্ঞানার্জনের সফর হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

এর মধ্যেই সামনে রয়েছে ১১ দলীয় ঐক্যের আরও ধারাবাহিক কর্মসূচি। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা অভিমুখে এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করার কথা রয়েছে। এরপর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ আয়োজন করা হবে।

ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচির মূল দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাস সংকট নিরসন। ১৪ নভেম্বরের মহাসমাবেশকে সামনে রেখে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য।

ফলে একদিকে যখন ঐক্যের রাজপথের কর্মসূচি ধাপে ধাপে এগোচ্ছে, অন্যদিকে দলের ৩৪ এমপির বিদেশ সফরও চলমান। এই দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রেখেই রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার পরিসর তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে লংমার্চের মতো কর্মসূচির সময় সংসদ সদস্যদের বড় একটি অংশের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা। তবে জামায়াত বলছে, সফরটি পূর্বপরিকল্পিত এবং ব্যক্তিগত ও প্রশিক্ষণমূলক হওয়ায় এটিকে চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে আলাদা করে দেখা উচিত।

এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় প্রচার এবং মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের ঢাকা মেইলকে বলেন, এটি তাদের ব্যক্তিগত সফর। তারা যেতেই পারেন; এটা স্বাভাবিক। যেহেতু বর্তমানে জাতীয় সংসদে তেমন কোনো সেশন নেই, তাই সবাই আলাপ-আলোচনা করে একসঙ্গে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। এটি কোনো দলীয় বা রাষ্ট্রীয় সফর নয়, একান্তই তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সফর। বিভিন্ন দেশ ঘুরে দেখার পাশাপাশি তারা প্রবাসী ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সৌজন্য মতবিনিময় করছেন। বিভিন্ন দেশের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যেই এই আয়োজন। এরমধ্য দিয়ে তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ হচ্ছে।

এদিকে একযোগে ৩৪ এমপির বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্কের জায়গাটি মূলত সফরের উদ্দেশ্য নয়, সময়কাল ও পরিসরকে ঘিরে। একটি রাজনৈতিক দলের ৩৪ সংসদ সদস্য, তাদের পরিবারের সদস্যসহ ৭১ জনের বহর নিয়ে একাধিক দেশ সফরে থাকা এবং একই সময়ে দলটির নেতৃত্বাধীন ঐক্যের ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচি চলা— দুই ঘটনাই এখন রাজনৈতিক আলোচনার অংশ।

টিএই/এফএ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর