সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলার পর তার সঙ্গে মরিয়মের বিয়ের শরিয়াহসম্মত বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, গাজী নজরুল ছিলেন তার আপন খালু। একই সময়ে নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ছিলেন মরিয়মের দাদি মাছুমার আপন বোন। ফলে প্রথম স্ত্রী জীবিত ও বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থায় তার বোনের নাতনিকে বিয়ে করার বৈধতা নেই বলে জানিয়েছেন ইসলামি ফিকাহ বিশেষজ্ঞরা।
ইসলামি শরিয়তে একই পুরুষের জন্য এমন দুই নারীকে একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে রাখা নিষিদ্ধ, যাদের একজন অন্যজনের ফুফু বা খালা। সহিহ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো নারীকে তার ফুফুর সঙ্গে এবং কোনো নারীকে তার খালার সঙ্গে একই ব্যক্তির বিবাহবন্ধনে একত্র করা যাবে না।
এই নিষেধাজ্ঞা শুধু সরাসরি খালা বা ফুফুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়—ফিকহের আলোচনায় সম্পর্কের ঊর্ধ্বতন স্তরের খালা-ফুফুর ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর মাজমুউ ফাতাওয়া-তে এ বিষয়ে সরাসরি একটি প্রশ্নের জবাব রয়েছে। সেখানে এমন এক ব্যক্তির প্রসঙ্গ আনা হয়েছে, যিনি কোনো ব্যক্তির খালাকে বিয়ে করার পর ওই ব্যক্তির মেয়েকেও বিয়ে করতে চেয়েছেন। জবাবে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, একই সঙ্গে ওই খালা ও তার ভাইয়ের মেয়েকে বিবাহবন্ধনে রাখা বৈধ নয়। তিনি বলেন, চার ইমামের কাছে হাদিসটির বিধান এমন খালার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যিনি স্ত্রীর বাবার খালা বা মায়ের খালা।
আরও স্পষ্টভাবে তিনি লিখেছেন, কোনো নারীকে তার পিতার খালা, মাতার খালা, পিতার ফুফু কিংবা মাতার ফুফুর সঙ্গে একই ব্যক্তির বিবাহে একত্র করা মুসলিম ইমামদের কাছে হারাম।
ইবনে তাইমিয়া (রহ.) আরও উল্লেখ করেন, একজনকে বিয়ের পর তার সঙ্গে নিষিদ্ধ সম্পর্কের অন্য নারীকে বিয়ে করা হলে পরবর্তী বিয়েটি বাতিল হবে; ওই দ্বিতীয় বিয়ের জন্য আলাদা তালাকের প্রয়োজন হয় না।
ফিকহের আরেকটি ব্যাখ্যাতেও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর ভাইয়ের মেয়ের মেয়ে বা বোনের মেয়ের মেয়েকে বিয়ে করতে পারবেন না, যতক্ষণ ওই নারীকে নিষিদ্ধ সম্পর্কের নারী হিসেবে একই বিবাহবন্ধনে রাখা হয়।
মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহর বক্তব্য ও প্রকাশিত পারিবারিক সম্পর্কের তথ্য সঠিক হলে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ছিলেন মরিয়মের বাবার আপন খালা। অর্থাৎ মাকসুদা ছিলেন মরিয়মের পিতার খালা।
ফিকহের ভাষায়, একজন পুরুষ একই সময়ে এমন নারী ও ওই নারীর পিতার খালাকে স্ত্রী হিসেবে রাখতে পারেন না। ইবনে তাইমিয়ার উদ্ধৃত ফতোয়ায় এ সম্পর্কটি সরাসরি নিষিদ্ধ সম্পর্কের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মাকসুদা নজরুলের বৈবাহিক সম্পর্কে থাকা অবস্থায় মরিয়মকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করা হয়ে থাকলে, ওই দ্বিতীয় নিকাহের শরিয়াহগত বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
গত জুলাইয়ে গাজী নজরুল ইসলামের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি জানান, ভিডিওতে থাকা তরুণী মরিয়ম খাতুন তার দ্বিতীয় স্ত্রী। পরে ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে। এরপর ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম ও মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলার পর গাজী নজরুল ও মাকসুদা ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তারা রিমান্ডে রয়েছেন।
জেবি




