বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও একসময় স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের কোনো আপত্তি নেই বলে আদালতে হলফনামা দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাতিল ইস্যুতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির এসব বলেন।
শিশির মনির বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয়ের পক্ষে মত দিয়েছিল। এমনকি তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল, যিনি বর্তমানে আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন, তিনিও আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছিলেন—সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় সরকারের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এখন সেই সচিবালয়ই বাতিল করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই জামায়াত নেতা বলেন, বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বাতিলের মাধ্যমে জনগণের আস্থার জায়গা ধ্বংস করা হয়েছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাকশাল ও সামরিক শাসনের কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
শিশির মনির বলেন, নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়োগ এখন তুলনামূলক স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হলেও বদলি, ছুটি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রয়েছে। ফলে বিচারকদের স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ সমস্যা সমাধানে প্রধান বিচারপতির অধীনে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যেখানে ১৫ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাও নিয়োগ পেয়েছিলেন।
বিজ্ঞাপন
জামায়াতের এই নেতার মতে, বিচারকদের ওপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলে তারা স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন না। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো রায় হলে সরকার আপিল করতে পারে, কিন্তু বিচারকদের পদোন্নতি আটকে দেওয়া, বদলি করা বা শাস্তির ভয় দেখানো স্বাধীন বিচার বিভাগের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
শিশির মনিরের ভাষ্য, ‘রাতে ৩টার সময় আদালত বসিয়ে যাকে ইচ্ছা সাজা দেওয়ার যদি অভিপ্রায় থাকে, তবেই আইন মন্ত্রণালয় বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। আর যদি সেই অভিপ্রায় না থাকে, তাহলে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ করবে সুপ্রিম কোর্ট। এখানে সরকারের বা আইন মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা থাকার কথা নয়।’
শিশির মনিরের দাবি, বদলি, ছুটি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা—এই চারটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে এসব ক্ষমতা থাকলে অধস্তন আদালত স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেই আইন মন্ত্রণালয় সচিবালয়ের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে চায়।
‘সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত সংবিধানসম্মত বা আইনসম্মত না হলে আদালত রায় দেবেন। সরকার অসন্তুষ্ট হলে আপিল করবে। কিন্তু বিচারকদের আবদ্ধ করে রাখা, পদোন্নতি না দেওয়া বা দূরবর্তী এলাকায় বদলি করার ভয় দেখানো স্বাধীন বিচার বিভাগের চরিত্র হতে পারে না।’
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে শিশির মনির বলেন, বাতিল হওয়া আইনে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিল। পাশাপাশি ৫০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন এবং বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষমতাও সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই হাজার বিচারক বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, এহসানুল মাহবুব জোবায়ের, নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন এবং মহানগর উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার।
টিএই/ক.ম




