বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ তুলে বিরোধী সদস্যরা আপত্তি জানালেও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা তিনটি অধ্যাদেশ বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।
আলাদা দুটি বিল পাসের মাধ্যমে এসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিল দুটি পাস হয়।
বিজ্ঞাপন
এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। আর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং এর সংশোধনী অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
ফলে আপাতত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য আলাদা কোনো আইন থাকছে না। সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনগত ভিত্তিও থাকছে না।
এতে বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম আগের কাঠামোয় ফিরে যাচ্ছে।
যেভাবে জারি হয়েছিল সচিবালয় অধ্যাদেশ
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ১৯৯৫ সালে বিসিএস বিচার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মাসদার হোসেনসহ কয়েকজন বিচারক নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করার দাবিতে মামলা করেন।
সেই মামলায় ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় দেন।
এর ২৬ বছর পর বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠনের পদক্ষেপ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের ২০ নভেম্বর এ বিষয়ে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং ৩০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।
অধ্যাদেশ কার্যকর হলে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা, ছুটি ও নিয়োগসংক্রান্ত দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের হাতে ন্যস্ত হওয়ার কথা ছিল।
১১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে সচিবালয়টি। সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪–এ এটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
বিরোধীদের আপত্তি
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিলটি অবিলম্বে বিবেচনার প্রস্তাব সংসদে তোলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এতে আপত্তি জানান বিরোধী সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান।
পাবনা-১ আসনের এই সদস্য বলেন, বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। তার দাবি, ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমনের চেষ্টা চলছে।
আরও পড়ুন: ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউট
তিনি বলেন, বিচার বিভাগ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কিছু বিচারককে শোকজ করা হয়েছে। অতীতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ না মানলে বিচারকদের দূরবর্তী জেলায় বদলি করা হতো বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নাজিবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন অসাংবিধানিক ঘোষিত হওয়ায় বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলা বিষয়ে ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট রায় বহাল থাকা অবস্থায় সচিবালয় বিলুপ্ত করতে বিল আনা আদালত অবমাননার শামিল। বিলটি জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর প্রস্তাবও দেন তিনি।
আইনমন্ত্রীর জবাব
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না, তা আদালত বলতে পারে, কিন্তু সংসদকে আইন প্রণয়নে নির্দেশ দিতে পারে না। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদেরই।
তিনি বলেন, সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় এবং তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে অতীতে বিচার বিভাগের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
বিচারকদের শোকজ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কেউ কোচিং সেন্টারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না। এ ধরনের কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগেই নোটিস দেওয়া হয়েছে।
পরে কণ্ঠভোটে নাজিবুর রহমানের আপত্তি নাকচ হয়ে বিলটি পাস হয়।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিলেও আপত্তি
পরে বিচারক নিয়োগ রহিতকরণ বিল পাসের প্রস্তাব তোলা হলে এতে আপত্তি জানান জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, অতীতে বিচারক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রবল, যার ফলে দলীয় আনুগত্যসম্পন্ন ও বিতর্কিত ব্যক্তিরাও বিচারপতি হয়েছেন।
তার মতে, রাষ্ট্রপতির নিয়োগক্ষমতা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শনির্ভর হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে বিচারপতি নিয়োগের জন্য একটি জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল, যেখানে বয়স, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও চারিত্রিক মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল।
সরকারের অবস্থান
আইনমন্ত্রী বলেন, অতীতে বিচারক নিয়োগে গুরুতর সমস্যা ছিল এবং সরকারও চায় এ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হোক।
তিনি জানান, বিচারক নিয়োগের বিষয়টি সংবিধানে নয়, আইনের মাধ্যমে নির্ধারণের বিষয়ে সরকার কাজ করছে এবং এ জন্য বৃহত্তর সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পরে কণ্ঠভোটে আখতার হোসেনের আপত্তিও নাকচ হয়ে বিলটি পাস হয়।
বিলে যা আছে
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় রহিতকরণ বিল, ২০২৬ অনুযায়ী ২০২৫ সালের মূল অধ্যাদেশ ও এর সংশোধনী বাতিল হবে এবং সচিবালয় বিলুপ্ত হবে। এর অধীনে থাকা বাজেট, প্রকল্প ও পদ আইন ও বিচার বিভাগে হস্তান্তর করা হবে।
তবে অন্যান্য আদালত ও দপ্তরের বিদ্যমান কাঠামো, পদ ও সম্পদ বহাল থাকবে।
অন্যদিকে বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল হলেও এর অধীনে ইতোমধ্যে করা নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বৈধ থাকবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থায়ী আইনগত কাঠামো নিশ্চিত করা এবং অধ্যাদেশের বিধানগুলো আরও যাচাই-বাছাই করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও অধিবেশনে ক্রীড়া, জ্বালানি, ক্রয়, অভিবাসন, শ্রম, স্থানীয় সরকার ও আইনগত সহায়তাসংক্রান্ত একাধিক সংশোধনী বিলও পাস হয়েছে।
এআর




