সোমবার, ৪ মে, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকা মহানগর বিএনপিতে নতুন কমিটির গুঞ্জন, আলোচনায় যারা

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০২৬, ১১:২৫ এএম

শেয়ার করুন:

ঢাকা মহানগর বিএনপিতে নতুন কমিটির গুঞ্জন, আলোচনায় যারা

# সাংগঠনিক সংস্কার ও গতিশীলতা আনার লক্ষ্য

# হাইব্রিড মুক্ত ও ক্লিন ইমেজেদের নেতৃত্ব চায় তৃণমূল


বিজ্ঞাপন


# নজর কাড়ার চেষ্টায় পদ প্রত্যাশীরা 

# ত্যাগীদের মূল্যায়ন না হলে দলে সংকট বাড়বে: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের পর দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়েছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ কমিটিকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংসদীয় দায়িত্ব ও সরকারি পদের কারণে শীর্ষ নেতাদের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় দলের ‘চেইন অব কমান্ড’ ও কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনাই এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ এই দুই ইউনিটে নতুন নেতৃত্ব আনতে নীতিনির্ধারকরা এখন মাঠের ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাদের মূল্যায়নের দিকে ঝুঁকছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগত তদারকির মাধ্যমে নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং বিগত দিনের আন্দোলনে ভূমিকার বিষয়টি যাচাই করছেন।


বিজ্ঞাপন


এবার কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করা হতে পারে-এমন গুঞ্জনও রয়েছে। অর্থাৎ, যারা বর্তমানে সরকারে আছেন বা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের মহানগরের নেতৃত্বে না রাখার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। একই সঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদেরও নতুন কমিটিতে গুরুত্ব দেওয়ার আলোচনা রয়েছে দলটির ভেতরে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই দলের সাংগঠনিক শক্তির মূল কেন্দ্রবিন্দু ঢাকার এই দুই ইউনিটে নবীন ও প্রবীণ নেতাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ কমিটি ঘোষণার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমিনুল হক সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন এবং দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ফেনী-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় কাজে তাদের প্রবল ব্যস্ততার কারণে মহানগরের সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা ও শৃঙ্খলার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

দক্ষিণ বিএনপিতে আলোচনায় যারা

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সম্ভাব্য কমিটির শীর্ষ পদের জন্য আলোচনায় আছেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দীর্ঘদিনের কমিশনার কাজী আবুল বাশার, বর্তমান সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, যুগ্ম আহ্বায়ক আ ন ম সাইফুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন, দফতর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টু।

তানভীর আহমেদ রবিন ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচন করলেও বিজয়ী হতে পারেননি। যদিও তিনি অভিযোগ করেছেন, পরিকল্পিতভাবে তাকে পরাজিত করা হয়েছে। প্রতিকার চেয়ে তিনি আইনী পদক্ষেপও নিয়েছেন। সে কারণে তার প্রতি দলের ‘সিম্পেথি’ কাজ করতে পারে এমন গুঞ্জন আছে।

কাজী আবুল বাশার দীর্ঘ ১৮ বছর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র ছিলেন। রাজপথের আন্দোলনে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি পুরান ঢাকায় রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী। অন্যদিকে, ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা ও বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে।

এছাড়াও সাইদুর রহমান মিন্টু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা এবং দলের দুর্দিনে দফতর সামলানোর ক্ষেত্রে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন। তৃণমূল ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার ভালো সমন্বয় থাকায় তাকেও নেতৃত্বে দেখার প্রত্যাশা করছেন অনেকে।

উত্তর বিএনপিতে আলোচনায় যারা 

উত্তর বিএনপিতে আমিনুল হকের পাশাপাশি সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় আলোচনায় আছেন দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা মামুন হাসান, সাবেক কমিশনার আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার এবং কফিল উদ্দিন আহমেদ। বিগত দিনের আন্দোলনগুলোতে তাদের সক্রিয় ভূমিকা হাইকমান্ডের নজর কেড়েছে। ফলে শীর্ষ পদে তাদের মধ্যে থেকেও বেছে নেওয়া হতে পারে।

সাবেক যুবদল নেতা মামুন হাসান মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় মহানগর কমিটিতে ভালো অবস্থানে থাকতে পারেন বলে আলোচনা হচ্ছে। আবার প্রতিমন্ত্রী হলেও সাবেক জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক আমিনুল হককে রেখে দেওয়া হতে পারে এমন আলোচনাও আছে দলটির ভেতরে।

অন্যদিকে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন ও যুগ্ম আহ্বায়ক এবিএম আব্দুর রাজ্জাকেরও শীর্ষ পদে আসার আলোচনা আছে। এদের মধ্যে সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুর রাজ্জাক ১৯৮৮ সাল থেকে দলের সঙ্গে যুক্ত এবং ২০১৮ সাল থেকে মহানগরের প্রতিটি কমিটিতে দফতরের দায়িত্ব পালন করছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে তাকে অসংখ্যবার গ্রেফতার, রিমান্ডেও যেতে হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিগত ১৭ বছর যারা মামলা-হামলায় জর্জরিত হয়েও মাঠ ছাড়েননি, তাদের মূল্যায়ন করে একটি শক্তিশালী মহানগর কমিটি গঠন করাই এখন বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর এখন অনেকেই বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। এদের অনেকে শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ারও চেষ্টা করছেন। নতুন কমিটিতে কখনো কখনো এসব লোকজনও গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেয়। তাই রাজনীতির মাঠে ‘হাইব্রিড’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া নেতাদের ভিড়ে যেন ত্যাগীরা হারিয়ে না যায় সেদিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলে অনেকেই ভিড় করতে পারেন সুবিধা নিতে, কিন্তু আন্দোলন-সংগ্রামে কতজন, কারা ছিলো তাদের খুঁজে বের করতে হবে। যদি ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেই দলের সংকট বাড়বে। বিএনপির নেতৃত্বকে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজর রাখা উচিত।’

কমিটি নিয়ে যে প্রত্যাশা নেতাদের

দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বিকল্প নেই। তৃণমূলের দাবি, চাটুকার, ব্যবসায়ী বা বিত্তবৈভবের মালিকদের পরিবর্তে যারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, তাদেরই গুরুত্ব দেওয়া হোক।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিএনপি এখন সরকার গঠন করেছে, তাই জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা বেড়েছে। যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে সেগুলো এক এক করে দেওয়া হবে এবং সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিতরাই স্থান পাবেন।’

এদিকে কমিটি নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে কাজী আবুল বাশার ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মাঠের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা সৎ, দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব তৈরি হবে। চেয়ারম্যান তারেক রহমান ত্যাগীদের মূল্যায়নের কথা বলেছেন এবং তা বাস্তবায়ন করলে কর্মীরা আনন্দিত হবে।’

ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘দলীয় প্রধান তারেক রহমান রাজনীতিতে নতুনত্ব আনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন তাতে নিজেকে যোগ্য মনে করছি। কারণ বিগত সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে থাকার চেষ্টা করেছি, ব্যবসা বাণিজ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কিন্তু দল ছেড়ে যাইনি। দলের সুসময়েও অন্যায় কাজে জড়িত হইনি। আশা করি দল মূল্যায়ন করবে।’

নতুন কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার আলোচনায় থাকা মহানগর দক্ষিণের দফতর সম্পাদক সাইদুর রহমান মিন্টু ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘তৃণমূলের কর্মী হিসেবে বিশ্বাস করি দল ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে। তাই নতুন কমিটি যখনই হবে সেখানে আন্দোলন-সংগ্রামের পরিচিত মুখ, কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, কর্মীবান্ধব, ক্লিন ইমেজের নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে সেটাই প্রত্যাশা।’

ঢাকা উত্তরের দফতর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জেল ও রিমান্ডের মুখেও মাঠে ছিলাম। তৃণমূলের কর্মীদের সঙ্গে লম্বা সময় ধরে সরাসরি যোগাযোগ আছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দল থেকে দেওয়া হলে আস্থার প্রতিদান দিতে পারব সেই আত্মবিশ্বাস আছে।’

বিইউ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর