ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক মাস বাকি। সারাদেশে ভোটের আমেজ। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দুটি বড় জোট। একটির নেতৃত্ব দিচ্ছে দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি, অন্যটির নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী।
এর মধ্যে বিএনপি জোটে রয়েছে অতীতে দলটির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণঅধিকার পরিষদ এবং গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলোসহ বিভিন্ন দল। আসন সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এই জোট। একই ভিত্তিতে আরেকটি জোট গড়েছে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলনসহ ১১টি দল।
বিজ্ঞাপন
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনে মূল লড়াই হবে এই দুটি জোটের মধ্যে। ইতোমধ্যেই বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী তাদের জোটে থাকা দলগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতা করছে। এটি করতে গিয়েই দুটি জোটের ভেতরেই এক ধরনের বিভক্তি, সংশয় এবং অবিশ্বাস ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হচ্ছে।
কোন দল কত আসন পাবে, কোন আসন কাকে দেওয়া হবে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে তৃণমূল নেতাদের বিদ্রোহী হয়ে ওঠা- এমন সংকট সামনে চলে এসেছে। জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে আসন ভাগাভাগি নিয়ে। আর বিএনপি জোটে বড় হয়ে উঠেছে, জোটের প্রার্থীকে ছেড়ে দেওয়া আসনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাওয়া।
একই আসন নিয়ে টানাটানি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের
বরিশাল সদরের চরমোনাই ইউনিয়ন। ইসলামী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র এখানে। চরমোনাই ইউনিয়নটি পড়েছে বরিশাল সদরের মধ্যে। এই আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম।
আবার এই একই আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। একই জোটে থাকা দুই দলের কেউই আসনটি ছাড়তে চান না। ফলে দুই প্রার্থী নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে দু’দলের মধ্যে।
বিশেষ করে যেখানে চরমোনাই পীরের মূল কেন্দ্র, সেখানে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়াকে ভালোভাবে নেয়নি ইসলামী আন্দোলন।
এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির ও বরিশাল-৫ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘আমরা তো জামায়াত আমির ডা. শফিক সাহেবের আসনে প্রার্থী দেই নাই। সেখানে আমাদের এখানে তাদের প্রার্থী দেওয়াটা অসুন্দর হয়েছে। এই এলাকায় আমাদের ভিত্তি। এখানে জোটের কেউ নির্বাচন করবে, এটা সম্ভব? এটা কি হওয়া উচিত?’
তবে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হলেও জামায়াত এই আসনটি ছাড়তে রাজি নয়। এর পেছনে দলটির যুক্তি হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বরিশাল- ৫ আসনের সঙ্গে বরিশাল- ৬ আসনেও প্রার্থী হয়েছেন। তাকে দুটি আসনে মনোনয়ন না নিয়ে বরিশাল- ৬ এ নিতে বলছে জামায়াত।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, ‘তিনি (সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম) দুটি আসনে প্রার্থী হয়েছেন। আমরা বলেছি আপনারা একটি নেন। সে হিসেবে বরিশাল- ৬ আসনটি নিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু তিনি দুটি আসনেই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একজন দুটি আসনে নির্বাচন করা, এটা তো জামায়াতের আমিরও করছেন না। আমরা আশা করি, এটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে।’
বিএনপির ৯০ শতাংশ লোক বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে
বরিশালে ইসলামী আন্দোলন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যখন টানাপোড়েন, তখন স্বস্তি নেই রাজনীতিতে জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও। উদাহারণ হিসেবে বলা যায়- বরিশালেরই পাশের জেলা পটুয়াখালীর কথা।
এই জেলাটির গলাচিপা এবং দশমিনা নিয়ে গঠিত পুটয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নেই। এখানে দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শরীক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে। কিন্তু জোটের মনোনয়ন পেলেও এলাকায় বিএনপির সমর্থন পাচ্ছেন না তিনি।
এ বিষয়ে নুরের দাবি, এলাকায় বিএনপির যে নেতাকর্মী আছে, তাদের ৯০ শতাংশই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান মামুন। যদিও সম্প্রতি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মামুন দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। সম্প্রতি গলাচিপা এলাকায় তার একটি ঘরোয়া বৈঠকে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদেরই দেখা যায়। উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের পদধারী অনেক নেতাই ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এসব কমিটির অধিকাংশই হাসান মামুনের তত্ত্বাবধায়নে গঠিত হওয়ায় নেতাকর্মীরা সরাসরি তার পক্ষেই কাজ করছেন।
এ ব্যাপারে হাসান মামুনের দাবি, বিএনপিকে বাঁচাতেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণে যখন ভুল হয়, তখন জনগণের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে। এই আসনটি যখন জোটকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে সেন্টিমেন্ট জাগ্রত হয়েছে যে, এখানে বিএনপির প্রার্থী থাকা উচিত। এখানে বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন। কারণ তারা জানে, এই সিট যদি আমরা গণঅধিকারকে ছেড়ে দেই, তাহলে আগামী ৩০ বছরেও এটি আর বিএনপি পাবে না।’
হাসান মামুন বিএনপির না হয়েও যেন বিএনপিরই প্রার্থী। কারণ স্থানীয় নেতাকর্মীরা মূলত: তার পক্ষেই কাজ করছেন। ফলে জোটের প্রার্থী হলেও আসনটিতে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মধ্যে। একইসঙ্গে শরিকদের অন্য আসনগুলোতেও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেটা পুরো জোটের মধ্যেই এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করেছে।
পটুয়াখালী-৩ আসনের প্রার্থী নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল, একটা ভারসাম্যপূর্ণ সংসদের জন্য বিএনপি ৪০ থেকে ৫০টি আসন মিত্রদেরকে ছেড়ে দিতে পারে। যেহেতু খুব অল্প সংখ্যক আসন ছেড়েছে, ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যেও একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, এটা ছাইড়া লাভ কী! এটাও আমরা নিয়ে নেই। কারণ এটা শুধু আমার বেলায় নয়, অন্য মিত্রদের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে।’
সমাধানের আশায় বিএনপি, জামায়াত জোটে মিশ্র অবস্থা
বিএনপি এখন পর্যন্ত শরীকদের জন্য আসন ছেড়েছে ১২টি। আরও যেসব আসন নিয়ে আলোচনা চলছে এর সবগুলোতেই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেটা জোটের শরীকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
যদিও বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেককেই বিএনপি বহিষ্কার করেছে। তবে এতেই সন্তুষ্ট নয় শরীক দলগুলো। কারণ রাজনীতিতে অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দল থেকে বহিষ্কার হলেও পরে আবার তাদের দলে ফেরত নেওয়া হয়। বিশেষ করে নির্বাচনে জিতে গেলে দলে ফিরতে সময় লাগে না।
এই কারণেই জোট শরীকদের সন্দেহ এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরানো না হলে ভোটের মাঠে জেতা কঠিন হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশে পাওয়া যাবে না।
এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী যেন না থাকে, সে বিষয়ে চেষ্টা চলছে।’
তিনি বলেন, ‘যারা দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন এটাকে সন্দেহ করলে সেটা করাই যায়। শরীক দলগুলো কিন্তু ভালো করেই জানে তারেক রহমান পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এখন শুনছে না। সময় তো এখনো শেষ হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে।’
বিএনপি তাদের ভাষায় সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু জামায়াতসহ ১১ দলের যে জোট, সেখানে এখনো পর্যন্ত আসন সমঝোতাই শেষ হয়নি। ফলে জামায়াতের এই জোটের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। যার মূল কেন্দ্রে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। দল দুটি প্রায় পৌনে তিনশ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জোটের ভবিষ্যত নিয়ে।
ইসলামী আন্দোলন অন্তত একশ আসন বা এর কিছু কমবেশি হতে পারে- এমন সংখ্যক আসন ছাড়া জোটের আসন বণ্টনে যাওয়াকে ‘সম্মানজনক’ মনে করছে না।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, ‘একশ আসন কিংবা এর উপরে বা এর আশেপাশে- এরকম হলে আমি মনে করি বণ্টনটা আমাদের জন্য সম্মানসূচক হয়।’
কিন্তু চূড়ান্ত সমঝোতায় যদি একশ আসনের চেয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন কম দেওয়া হয়, তাহলে কি জোট থাকবে- এমন প্রশ্নে ফয়জুল করীমের পাল্টা প্রশ্ন, ‘একশ আসন দেওয়া হবে না কেন? না হওয়ার যুক্তি কী? যদি কারও জন্য এটা না হয়, তাহলে সে দায়-দায়িত্ব তাকেই গ্রহণ করতে হবে।’
এটা স্পষ্ট যে, জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা না কাটলে সেটা জোট ভাঙার দিকেও গড়াতে পারে। এর বিপরীতে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভাঙন নিয়ে আশঙ্কা না থাকলেও শরীকদের মধ্যে বিএনপির তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
সবমিলিয়ে দুটি রাজনৈতিক জোট ভেতর থেকে যে সংশয় আর অবিশ্বাসের মুখোমুখি, তার সমাধান কীভাবে হয়, সেটির উপরই নির্ভর করছে নির্বাচনের আগে জোট দুটির ভবিষ্যত। শেষ পর্যন্ত কী হয়, তা সময়ই বলবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ

