শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

সমঝোতার আসনেও ‘বিদ্রোহীদের চাপে কোণঠাসা’ বিএনপির মিত্ররা

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

সমঝোতার আসনেও ‘বিদ্রোহীদের চাপে কোণঠাসা’ বিএনপির মিত্ররা
  • বিএনপি থেকে আসন ছাড় পেয়েও টেনশনে মিত্ররা
  • তৃণমূলের সহযোগিতা পেতে কেন্দ্রের দারস্থ শরিকরা
  • বহিষ্কারেও থামছেন না বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা
  • শিগগিরই কড়া বার্তা যাচ্ছে তৃণমূলে

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে বিএনপি। সংখ্যায় আসন কম হলেও এমন সিদ্ধান্তে শরিক দলগুলোর মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও ভোটের মাঠে নেমে চাপে পড়েছেন তাদের প্রার্থীরা। বিএনপি যেসব আসন শরিকদের ছেড়ে দিয়েছে, সেগুলোর বড় অংশেই স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সহযোগিতা পাচ্ছেন না মিত্র দলের প্রার্থীরা। বরং অনেক এলাকায় বিএনপির স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের দাপটে তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।


বিজ্ঞাপন


এমন পরিস্থিতিতে মাঠ ধরে রাখতে মিত্র দলের নেতারা সরাসরি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কাছে বার্তা পাঠাচ্ছেন। তারা দলীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে কঠোর ও স্পষ্ট নির্দেশনার দাবি জানাচ্ছেন।

একাধিক মিত্র দলের শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিকভাবে আসন ছাড় দেওয়া হলেও তৃণমূল বিএনপিকে এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা না দেওয়ায় মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। হাইকমান্ডকে বিষয়টি জানানোর পর কিছু এলাকায় অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেও তা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এ কারণে সমঝোতার আসন পাওয়া নেতারা মনে করছেন, বিএনপির হাইকমান্ডের লিখিত ও প্রকাশ্য নির্দেশনা ছাড়া পূর্ণ সহযোগিতা পাওয়া কঠিন।

অন্যদিকে শরিকদের এই অসন্তোষের বিষয়টি আমলে নিয়েছে বিএনপিও। দলটির পক্ষ থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী ও অসহযোগিতায় যুক্ত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। ইতোমধ্যে হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে শরিকদের সহযোগিতার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


গত ৩০ ডিসেম্বর দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচন করায় ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, সাইফুল আলম (নীরব), কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুনসহ ৯ জনকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তবে তারা এখনো মাঠ ছাড়েননি।

যেসব আসনে ভাগ-বাটোয়ারা করেছে বিএনপি
বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও বিএনপিতে যোগ দেওয়া নেতাদের সঙ্গে যেসব আসনে ছাড় দিয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- বগুড়া-২ (নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না), পিরোজপুর-১ (জাতীয় পার্টি, কাজী জাফর, মোস্তফা জামাল হায়দার), নড়াইল-২ (এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ), যশোর-৫ (ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাস), পটুয়াখালী-৩ (নুরুল হক নুর), ঝিনাইদহ-৪ (রাশেদ খাঁন), ঢাকা-১২ (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক), ঢাকা-১৩ (এনডিএমের ববি হাজ্জাজ), ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ (গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি), লক্ষ্মীপুর-১ (বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম), কিশোরগঞ্জ-৫ (এহসানুল হুদা) এবং কুমিল্লা-৭ (এলডিপির ড. রেদওয়ান আহমেদ)।

এছাড়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এসব আসনে দলীয় প্রতীক খেজুর গাছ নিয়ে নির্বাচন করবেন জমিয়তের প্রার্থীরা।

অবশ্য শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরবর্তীতে মোস্তফা জামাল হায়দারের আসনে বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে প্রার্থী করা হয়েছে।

উল্লেখিত প্রার্থীদের মধ্যে ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খাঁন, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেদওয়ান আহমেদ ও ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন।

5

বেকায়দায় যেসব মিত্র প্রার্থী
নির্বাচন ঘিরে বিএনপির শরিক দলগুলোকে ছাড় দেওয়া একাধিক আসনে মনোনয়ন ঘিরে বিদ্রোহ, বহিষ্কার ও সমঝোতার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক জায়গায় জোট প্রার্থীরা নিজ দলের বিদ্রোহী ও জামায়াত প্রার্থীর চাপে বেকায়দায় পড়েছেন।

ঢাকা-১২ আসনে জোট প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হকের বিপরীতে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাইফুল আলম নীরব মাঠে রয়েছেন।

ভোলা-১ আসনে জোটের শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থকে প্রার্থী করায় আগে মনোনয়ন পাওয়া বিএনপি নেতা গোলাম নবী আলমগীর বিদ্রোহী অবস্থানে আছেন। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পার্থকে একক প্রার্থী ঘোষণা হয়নি।

বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়ন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। ঋণখেলাপির অভিযোগে প্রার্থিতা বাতিল হলেও এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছেন মান্না। কিন্তু তার আসনে রয়েছেন বিএনপির মীর শাহে আলম বিদ্রোহী প্রার্থী।

পটুয়াখালী-৩ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের বিপরীতে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হাসান মামুন শক্তভাবে মাঠে আছেন। ফলে উদ্বেগ বাড়ছে নুরের। বুধবার তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতা চেয়েছেন।

ঝিনাইদহ-৪ আসনে গণঅধিকার পরিষদ থেকে বিএনপিতে আসা রাশেদ খাঁনের বিপরীতে বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে আছেন। যে কারণে এখনো নেতাকর্মীরা রাশেদের পক্ষে কাজ করছেন না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকির বিপরীতে একাধিক বিএনপি বিদ্রোহী মাঠে আছেন।

যশোর-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাসের বিরুদ্ধে বিএনপির শহীদ ইকবাল স্বতন্ত্র হিসেবে মাঠে আছেন।

নীলফামারী-১ আসনে জোট প্রার্থী মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দির পক্ষে বিএনপি নেতাকর্মীদের কাজ করতে অনেকটা অনীহা দেখাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মনির হোসাইন কাসেমীর বিপক্ষে বিএনপির দুই বহিষ্কৃত নেতা থাকায় জোট প্রার্থী চাপে আছেন।

সিলেট-৫ আসনে মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুকের বিপরীতে বিএনপি বহিষ্কৃত মামুনুর রশিদ মাঠে আছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের বিরুদ্ধে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও এস এন তরুণ দে মাঠে থাকায় জোট প্রার্থী বেকায়দায় পড়েছেন। যদিও এদের দুজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

নড়াইল-২ আসনে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদের বিপরীতে বিএনপি নেতা মনিরুল ইসলাম স্বতন্ত্র হয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। সহযোগিতা চেয়ে ইতোমধ্যে ফরহাদ বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন।

কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপি থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে ফেরা ড. রেদোয়ান আহমেদের বিপক্ষে আতিকুল আলম শাওন বিদ্রোহী প্রার্থী। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদাকে মনোনয়ন দেওয়ায় আগের প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল স্বতন্ত্র হয়ে মাঠে নামলেও তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। তবে তার ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা এহসানুল হুদার পক্ষে কাজ করছেন না।

তবে এসব নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে স্বস্তিতে আছেন শাহাদাত হোসেন সেলিম। আগে বিএনপির রাজনীতি করায় তৃণমূলে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। অনেক দিন অন্য দলে থাকলেও আবার বিএনপিতে ফেরায় পরিস্থিতি অনেকটা অনুকূলে।

ঢাকা মেইলকে শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘আমার আসনে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সবাই নিরলসভাবে কাজ করছে। অন্য দলগুলোর নেতারা কিছুটা সমস্যায় পড়লেও আমি স্বস্তিতে আছি।’

যা বলছেন বিএনপির মিত্ররা?
গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নিজ এলাকার পরিস্থিতি তুলে ধরে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বহিষ্কার করা হলেও বাস্তবে নেতাকর্মীরা তার সঙ্গেই কাজ করছে। কারণ কমিটিগুলো তারই করা। দল থেকে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আমার পক্ষে কাজ করার নির্দেশ না আসে, তাহলে নির্বাচনে বড় প্রভাব পড়বে। তাহলে আসন সমঝোতারই বা মূল্য কী।’

গত বুধবার রাতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন নুরুল হক নুর। সঙ্গে ছিলেন দল থেকে বিএনপিতে যাওয়া রাশেদ খাঁন।

বৈঠকে জোটের শরিকদের ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার না করে আলোচনার মাধ্যমে বসিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান নুর। জবাবে তারেক রহমান বিষয়টি ইতিবাচকভাবে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি।

সাইফুল হক তার আসনের কথা তুলে ধরে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শুরুর দিকে পরিস্থিতি কঠিন ছিল। হাইকমান্ড অবহিত হওয়ার পর মহানগরের নেতারা নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন কিছুটা সহযোগিতা পাচ্ছি। আশা করি পরিস্থিতি আরো উন্নত হবে। কিন্তু এখনো বিএনপির বহিষ্কার হওয়া নেতা মাঠে আছেন। এটা কিছুটা বিব্রতকর।’

মাঝে মাঠের পরিস্থিতি তুলে ধরে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদ্রোহী প্রার্থীর বিষয়ে হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বলেও জানা গেছে।

বিএনপি নেতার মনোনয়ন বাতিল হলেও নেতাকর্মীদের একটি অংশের সহযোগিতা না পাওয়ার কথা তুলে ধরে এহসানুল হুদা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ভোটারদের সাড়া ভালো, কিন্তু বিএনপির কর্মীরা পুরোপুরি পাশে নেই। স্বতন্ত্র প্রার্থীর পেশিশক্তি থাকায় অনেকে ভয় পাচ্ছেন। আশা করি হাইকমান্ড বিষয়গুলো দেখে দ্রুত নির্দেশনা দেবেন।’

এহসানুল হুদা আরো বলেন, ‘আমি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। দেখতে চাই বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি কী করে।’

গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে বিএনপিতে আসা রাশেদ খাঁন নিজের এলাকার পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। নেতাকর্মীরা অনেকেই কাজ করছেন। এখনো যারা সহযোগিতা করছেন না আশা করি দ্রুতই সমাধান হবে। এই আসনে বিএনপির একজন নেতা স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন, ফলে নেতাকর্মীরা কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে হয়তো আছেন।’

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান নজরুল ইসলাম খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় সমস্যা হচ্ছে, এটা অস্বীকার করছি না। তবে আমরা বিষয়টি দেখছি। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাইকে প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করতেই হবে। যদি কোথাও সমস্যা হয় তাও দেখা হবে।’

বিইউ/এমআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর