শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

উপমহাদেশে আবার বিতর্কিত জাতপাত প্রথার পদধ্বনি, শঙ্কিত মানুষ

মনজুরুল আলম মুকুল
প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

উপমহাদেশে আবার বিতর্কিত জাতপাত প্রথার পদধ্বনি, শঙ্কিত মানুষ
মনজুরুল ইসলাম মুকুল। ছবি: সংগৃহীত

এক সময় দেখা যেত এক শ্রেণির লোকদের রাস্তায় যাতায়েতের খুব বেশি প্রয়োজন হলে গলায় ঘণ্টা বেঁধে রাস্তায় চলত। সেই ঘণ্টার শব্দ শুনে উচ্চবর্ণের লোকেরা সাবধান হত কেননা অস্পৃশ্য বা দলিতদের স্পর্শতো দূরের কথা তাদের মুখ দেখলে ও ছায়া ডিঙ্গালে নাকি ধর্ম নষ্ট হয়ে যেত। আর এই নিয়ম ভঙ্গের কারণে আরও বড় ধরনের নিগৃহীতের শিকার হতে হতো, নেমে আসত আরও বড় ধরনের শাস্তি।

আবার কিছু লোকদের গলায় বা কোমরে পাত্র বা মগ বেঁধে রাখতে বাধ্য করা হতো, যাতে তাদের থুতু মাটিতে পড়ে দূষণ সৃষ্টি না করে৷ তাছাড়া ঐ পাত্রটি ছিল তাদের সামাজিক অবস্থানের এক ভয়াবহ অস্পৃশ্যতার প্রতীক। অর্থাৎ সব ধরনের ছোঁয়াছুয়ির উর্ধ্বে থেকে অন্য কাউকে যাতে কোনরূপ অপবিত্র হবার বিড়ম্বনায় পড়তে না হয় সেজন্যেই এ ব্যবস্থা।  পাবলিক টিউবওয়েল, কূপ, পুকুর বা অন্য কোন পানির  উৎস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হতে হতো, সেগুলো ছোঁয়ার অধিকার তাদের ছিলনা। পানির তেষ্টা পেলে টিউবওয়েল বা অন্য কোন উৎসের পাশে বা কোন হোটেল বা চা-দোকানের বাইরে থেকে মগটা বাড়িয়ে দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে  কেউ হয়তো দয়া করে নিরাপদ অবস্থান থেকে ওই মগটিতে পানি ঢেলে দিতো। কিংবা টাকা দিয়ে দোকান থেকে চা খেতে চাইলেও চায়ের কাপ স্পর্শ করার অধিকার নেই বলে গরম চা ওই মগেই ঢেলে দেয়া হতো। আরেকটি বাধ্যবাধকতা ছিল, পেছন দিকে ঝাড়ু বেঁধে রাখা যাতে অন্যদের চোখে পড়ার আগে তাদের পায়ের ছাপ মুছে যায়৷  পরিস্কার-পরিছন্নতা ও অন্য কোনো কাজের বিনিময়ে খাবার দিলে বাড়ির বাইরে কলাপাতায় বা বাড়ির অব্যবহারযোগ্য পাত্রে বা তাদের নিজস্ব বাসনে খাবার দেওয়া হত, খাবার পানি দেওয়া হত বদনায়। নিরাপদ অবস্থান থেকেও খাবার দেওয়া হত এবং খাওয়ার পর সে সব পাত্র ফেলে দেওয়া হতো বা কুকুর বিড়ালের খাবার দেওয়ার জন্য রেখে দেওয়া হতো। 

এক কাতারে বসা ও খাওয়া তো দূরের কথা, তাদের উচ্চবর্ণের মানুষের বাড়ি বা মন্দিরে প্রবেশ, ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং পবিত্র স্থান ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা ছিল। বলা হয় কোন উচ্চবর্ণের ব্যক্তির সঙ্গে একই আসনে বসে তা হলে তার কোমরে ছেঁকা লাগিয়ে দাগ দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে কিংবা তার পাছা খানিকটা কেটে দেবে।

ডক্টর ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের জীবন থেকে জানা যায়, অস্পৃশ্যের সন্তানদের স্কুলে শ্রেণি কক্ষের বেঞ্চে তাদের বসতে দিত না, তাদের বসার স্থান ছিল ক্লাশের একেবারে পেছনে ছালার চটে। উচ্চবর্ণের পণ্ডিতেরা তার বইখাতা স্পর্শ করত না, থুথুর ছোঁয়ায় বাতাস দুষিত হবে বলে তাকে ক্লাসে কোনো পড়া জিজ্ঞাসা করা হতো না, এমনকি খড়িমাটি অপবিত্র হয়ে যাবে এই শংকায় তাকে বোর্ডে পর্যন্ত লিখতে দেয়া হতো না। স্কুলে স্বহস্তে পানি পান করতে পারত না। মুখের উপর পাত্র উঁচু করে পানি ঢেলে দেয়া হতো। উঁচু বর্ণের সহপাঠীদের টিফিন বক্সগুলোয় যাতে কোনরূপ ছোঁয়া না লাগে সেজন্য সাবধানে দূরে সরিয়ে রাখাত।

জাতিভেদ ব্যবস্থায় মানুষের সামাজিক অবস্থান ও পেশা অনেকাংশে জন্মের ওপর নির্ভর করত। বলা হতো তারা সম্পদের মালিক হতে পারবেনা। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পরিচ্ছন্নতাকর্ম, মৃতদেহ সৎকার, অন্যের বাড়ির  এঁটো কুড়িয়ে, কাটা ক্ষেতের পরিত্যক্ত ফসল কুড়িয়ে, মরা পশুর চামড়া ছাড়িয়ে বিক্রি করে, চামড়ার কাজ করে, আর মরা পশুর মাংস খেয়ে জীবন কাটানো থেকে থাকা নানা ধরনের নিম্নমানের কাজ করতে হত। অর্থাৎ সমাজের যে কোন সামাজিক কর্মকাণ্ডে এদের শ্রমের প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার ছিল না। আবার কোনো উচ্চবর্ণের বা কুলীন পরিবারের সদস্য যদি অজান্তে কোনো নিম্নবর্ণের বা অস্পৃশ্য মানুষের ঘরে যাতায়াত প্রবেশ করত, তবে কুলাকুল বিচার করে সেই পরিবারের কৌলীন্য কেড়ে নেওয়া হতো এবং তাদের সমাজচ্যুত বা একঘরে করে রাখা করে হতো।

সবচেয়ে নিগৃহীতের শিকার হতো, দলিত মহিলারা। তাদের ইচ্ছারমত ও ভাল পোশাক পরিধানে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কোথাও কোথাও দলিত নারীদের বক্ষদেশ ঢেকে রাখায় নিষেধাজ্ঞা ছিল, নিয়ম ছিল বক্ষদেশের উপর কাপড় রাখতে হলে ট্যাক্স দিতে হবে। বলা হতো, মৃত লোকের কাপড় এদের আচ্ছাদন (পোশাক) হবে; এরা ভাঙা পাত্রে ভোজন করবে; এদের অলঙ্কার হবে লৌহনির্মিত; এবং এরা সকল সময়ে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াবে। অর্থাৎ একই স্থানে বাস করবে না। তাদের বসবাসের ব্যবস্থাও সেরকমই। এলাকায় বা গ্রামের বাইরে  তাদের বসবাস করতে বাধ্য করা হতো। ভদ্রপাড়া থেকে দূরে স্বতন্ত্র কোন বস্তি বা পল্লীতে এই অন্ত্যজ শ্রেণী মানুষের গোষ্ঠীগত বসবাস। 

মোটকথা, মানব সভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায় জাতপাত প্রথা। ভারতীয় সমাজে এই বৈষম্যের ইতিহাস বহু পুরোনো। সমাজের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষের উপর তৈরি হয়েছে নানা ধরনের নির্মম উদাহরণ। জাতপাত প্রথা এসেছে মূলত হিন্দু ধর্মের মধ্য থেকে।  তবে প্রভাব বিস্তারকারী ভারতীয় সংস্কৃতি ও সময়ের সঙ্গে এই বিভাজন শুধু হিন্দুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; মুসলিম, খ্রিস্টান, জৈন ও বৌদ্ধদের মধ্যেও জাতপরিচয়ের কমবেশি প্রভাব দেখা যায়।

ভারতের আদমশুমারিতে জাতপাত

ভাইসরয় লর্ড মেয়োর অধীনে ১৮৭২ সালে ভারতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ আদমশুমারি হয়েছিল এবং জাতপরিচয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়ে ছিল। এরপর থেকে প্রায় প্রতি ১০ বছর অন্তর অন্তর থেকে নিয়মিতভাবে এই শুমারি হয়ে আসছে। এভাবে ১৯৩১ সালের আদমশুমারি পর্যন্ত  জাতপাতের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়ে আস ছিল। ১৯৪১ সালে  শুমারি হয়ে ছিল তবে যুদ্ধের কারণে ফলাফল প্রকাশ হয়নি।   স্বাধীনোত্তর ভারতের প্রথম আদমশুমারি হয় ১৯৫১ এবং এর পর থেকে কোন আদমশুমারিতে জাতপাতের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। এ বিষয়ে ভারতের একজন বিশিষ্ট সামাজিক উন্নয়ন কর্মী পুনম মুত্ত্রেজা বলেন, 'স্বাধীনতার পর ভারতীয় রাষ্ট্র সচেতনভাবেই আদমশুমারিতে জাত গণনা থেকে সরে এসেছিল। তাদের ধারণা ছিল, জাতকে গুরুত্ব না দিলেই তা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতভিত্তিক বৈষম্য আপনাআপনি দূর হয়ে যাবে। 'ভারতে শেষ আদমশুমারি ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৬তম আদমশুমারি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু COVID-19 মহামারির কারণে স্থগিত  হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার  আকস্মিকভাবে ঘোষণা করে যে, আসন্ন জাতীয় আদমশুমারিতে ১৯৩১ সালের পর প্রথমবারের মতো জাতপাতের বিষয়টি  উঠে আনা হবে।  স্থগিত  হওয়া আদমশুমারি  হিমালয় রাজ্যগুলোর জন্য ১লা অক্টোবর ২০২৬ থেকে শুরু হয়েছে এবং বাকি রাজ্যগুলোর জন্য ১লা মার্চ ২০২৭ থেকে শুরু হবে।

যুগে যুগে লাঞ্ছনার শিকার

মানুষ মানুষই। রক্ত মাংসে গড়া সকল মানুষই সমান। কিন্তু যুগে যুগে জাতপাত প্রথা পরিচয়ের মাধ্যম হিসাবে দাঁড়িয়ে ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক ছিলেন রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন, যিনি রিচার্ড এম ইটন নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন ভারত উপমহাদেশে কঠোর জাতিভেদ প্রথা, বর্ণবাদ ও ধর্মীয় নির্যাতন-নিপীড়ন এতই লক্ষণীয় ছিল যে, নিম্নবর্ণের বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ বাঁচার তাদিগে বন-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে ছিল। রাজা বল্লাল সেনের (১১৬০–১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) সময়ে  কৌলীন্য প্রথা জোরালোভাবে অনুসরণের কারণে বাংলার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী সামাজিক নিপীড়নের শিকার হয়ে নিম্ন ও জলাভূমিতে আশ্রয় নিয়েছিল।  পরবর্তীতে এই জনগোষ্ঠীই ইতিহাসে দীর্ঘকাল 'চণ্ডাল' বা 'নমঃশূদ্র' নামে পরিচিত হয়। ইসলাম ধর্ম জাতিভেদকে অস্বীকার করলেও সুলতানি ও মোঘল আমলের মুসলিম শাসকরা ভারতীয় সমাজের অভ্যন্তরীণ সমাজ কাঠামোতে খুব একটা হস্তক্ষেপ করেনি। ফলে সুলতানি ও মোঘল আমলে উপমহাদেশের নিম্নবর্ণের মানুষের অবস্থা সামগ্রিকভাবে পূর্বের মতো বেশ কঠিন, বৈষম্যমূলক এবং শোষিত ছিল। তারা গ্রামের মূল সীমানার বাইরে বসবাস করতে বাধ্য হয়। উচ্চবর্ণের লোকেদের কুয়া বা জলাশয় ব্যবহার, ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রবেশ এবং ভালো পোশাক পরিধানের ওপর তাদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে ইসলাম ধর্মের জাতিভেদ প্রথা না থাকার কারণে হিন্দু বা সনাতন ধর্মের ভিতরেও ধারণার পরিবর্তন আসে। শ্রীচৈতন্যের মত অনেকে ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে প্রচার করেন যে ঈশ্বরের চোখে সবাই সমান।

ইংরেজ আমলে যুক্ত হয় তফসিলি সম্প্রদায় যা  নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নিয়ে গঠিত এবং সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অনুন্নত বলে বিবেচিত একটি রাজনৈতিক শ্রেণি। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে দক্ষতা ও সাহসিকতার সাথে কাজ করে আসলেও বর্ণহিন্দুদের প্ররোচনায় অস্পৃশ্যতার ধূয়া তুলে ১৮৯২ সালে ইংরেজ সরকারের এক আদেশ বলে অস্পৃশ্যদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। যদিও  ড. আম্বেদকরের আপ্রাণ চেষ্টায় বৃটিশদের শেষ দিকে সেনাবাহিনীতে পুনরায় মাহারদের (অস্পৃশ্য) নিয়োগদান চালু হয়ে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের লোকদের চণ্ডাল নামে অবিহিত করে।  এই ঐতিহাসিক ঘটনার পেছনে সামাজিক স্তরবিন্যাস, বর্ণহিন্দুদের প্রভাব এবং ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে জড়িত ছিল।  তবে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ১৯১১ সালের আদমশুমারিতে ব্রিটিশ সরকার এই অবমাননাকর ‘চণ্ডাল’ নাম পরিবর্তন করে তাদের ‘নমঃশূদ্র’ রাখে।

লক্ষণীয় যে, ইংরেজ আমলে জাতে উঠার জন্য এই অঞ্চলের মানুষ এক বিশেষ প্রতিযোগিতায় নেমে ছিল। কলকাতায় ফটোকপির দোকানের মত অসংখ্য দোকান গড়ে উঠেছিল। সে সব দোকানে দুই এক পুরুষের নাম বললে, একটা বংশ তালিকা তৈরি করে দিত। কম টাকা দিলে একটু ছোট বংশ, আর বেশি টাকা দিলে বড় বংশ, একেবারে মিথিলা- কনৌজের উচ্চ বংশের সাথে জোড়া লাগিয়ে দিত।

ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতে নবজাগরণের যে উন্মেষ ঘটেছিল তা মূলত সমাজের উচ্চ সংস্কৃতিসম্পন্ন শিক্ষিত মহলেই  সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজের নিম্নস্তরের জীবন ছিল একই জায়গায় আবদ্ধ।  মর্লি-মিন্টো সংস্কার-এর (১৯০৯) সময় থেকে বাংলার মুসলমানরা যখন তাদের রাজনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণে স্বতন্ত্র নির্বাচনের অধিকার লাভ করে, তখন থেকে হিন্দু অনুন্নত শ্রেণির সংগঠনগুলিও তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণে অনুরূপ সুবিধালাভের দাবি জানিয়ে আসছিল।

আরও পড়ুন

উপমহাদেশে সিস্টেম চেঞ্জের ঢেউ

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়

এদিকে ৩০ এর দশক থেকে ভারত উপমহাদেশে মুসলিম লীগ যতই শক্তশালী হতে থাকে তখন অনেক চাপে পড়ে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা  দলভারী করার জন্য দলিতদের ব্যাপারে কিছুটা নমনীয় হতে থাকে।  সাইমন কমিশন রিপোর্ট ও গোলটেবিল বৈঠক অনুন্নত শ্রেণির লোকদের রাজনৈতিক স্বীকৃতি দানের জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ প্রদান করে। অবশেষে কংগ্রেসও পুনা প্যাক্টে (১৯৩২) তাদের দাবি মেনে নেয়। অনুন্নত শ্রেণি বা অস্পৃশ্য কথার মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক কালিমা জড়িয়ে আছে তা অপনোদনের জন্য বঙ্গীয় সরকার ১৯৩২ সালে ৭৬টি হিন্দু নিম্নবর্ণের লোকদের তফসিলি সম্প্রদায় অভিধায় আখ্যায়িত করে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের প্রথম তফসিলে এদের উল্লেখ রয়েছে। এ আইনে বলা হয়েছে যে, যেসব বর্ণ সম্প্রদায়, জাতিগোষ্ঠী ও উপজাতি ইতঃপূর্বে অনুন্নত শ্রেণি হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন থেকে তারা তফসিলি সম্প্রদায় রূপে আখ্যায়িত হবে। এ আইনে বঙ্গীয় আইনসভার ২০% আসন তফসিলি সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষিত হয়। মুসলমানদের ন্যায় তারা সংরক্ষিত আসনের বাইরেও সাধারণ আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার লাভ করে। এভাবে ১৯৩৭, ১৯৪৬ ও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে তফসিলি সম্প্রদায় পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষাকারী একটি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ১৯৩৭ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত যে সকল মন্ত্রিসভা গঠন করে তা আইন পরিষদে তফসিলী সম্প্রদায়ের সদস্যদের সমর্থনেই গঠিত হয়। পাকিস্তানের সংবিধানে (১৯৫৬) নীতিগতভাবে পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি রহিত করা হয়। এরপর থেকে পাকিস্তানে এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশে সকল নির্বাচন সম্মিলিত নির্বাচকমন্ডলী পদ্ধতির অধীন প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। 

জাতিভেদের রোগটা যায়নি

সূত্র মতে, ভারতে প্রায় ৪৬ লাখ সাব কাস্ট আছে। বর্ণবাদ, জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে লড়েছেন স্বামী বিবেকানন্দ, ভীমরাও রামজি আম্বেদকর, মহাত্মা গান্ধী, জ্যোতিরাও ফুলে, সাবিত্রীবাই ফুলে, নারায়ণ গুরু, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর ও ফকির লালন শাহ সহ অনেকে। স্বামী বিবেকানন্দ চেয়েছিলেন কোনো জাতি ভেদাভেদ থাকবে না। মহাত্মা গান্ধীর ভাবনায় ছিল, দেশে জাতিভেদ থাকবে না। ভারতে অস্পৃশ্যতা নিরোধক আইন পাস হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। বলা হয়েছিল, অস্পৃশ্যতার চৰ্চা এক শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ভারতীয় সংবিধানও ১৭ নম্বর ধারায় অস্পৃশ্যতার অনুশীলন নিষিদ্ধ করেছে। ১৫ নম্বর ধারা অনুসারে ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ এবং জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য আইনবিরুদ্ধ। তা সত্ত্বেও, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অস্পৃশ্যতার ভয়ঙ্কর রূপ অনেককে ত্রস্ত, সন্ত্রস্ত, আতঙ্কিত করে। তথাকথিত উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের বিভেদ আজও অনেক  জায়গায় বহাল তবিয়তে টিকে আছে।   এক সাথে খাওয়া-দাওয়া ও মেলামেশা তো দূরের কথা, শহর এলাকায় একই লিফ্‌ট ও শৌচালয়ের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ইন্ডিয়া হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট সার্ভে অনুসারে, ভারতে প্রায় ৯৫ শতাংশ বিয়ে একই জাতের মধ্যে হয় আর মাত্র ৫ শতাংশ বিয়ে আন্তঃজাত বিয়ে—অর্থাৎ ভিন্ন জাতের মধ্যে হয়। একই ধরনের বিভাজন দেখা যায় বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র ও অন্যান্য সামাজিক পরিসরেও। 

আদমশুমারির নামে শুভংকরের ফাঁকি

ভারতের ১৬তম আদমশুমারি নিয়ে হিসাবনিকাশের মারপ্যাঁচ ও কূটকৌশল আছে বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে। ভারত অনেক ধর্ম ও ভাষাভাষীর দেশ। এবার ছোট ধর্ম ও ভাষাগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে। যেমন ঝাড়খণ্ডে স্বর্ণা নামের একটি সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। তারা নিজেদেরকে আলাদা ধর্মের লোক মনে করে। এবার তারা টিকে থাকতে পারবে কিনা সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এবারের সেনসাসে ধর্ম ও ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি অপশনে ধর্ম হিসাবে বিশেষ কয়েকটি  ধর্মের নাম থাকবে ও বিবিধ বা others বিষয়টি তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে নিদিষ্ট করে কাউকে বলতে হবে সে কোন ধর্মের লোক।  এক্ষেত্রে তাকে আদিবাসী বা বনবাসি বলা হবে। ছোট ছোট ধর্মের  লোকদের হিন্দু ধর্মের সাথে মিশিয়ে ফেলার চেষ্টা রয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ।

আবার কেউ যদি হিন্দু না হয় তাহলে তার সুযোগ সুবিধা কমে যাবে।  আবার মাতৃভাষা হিসাবে অনেকেই হিন্দি বলতে হবে।

অনেকের মতে, সময়ের সঙ্গে জাত বিভাজনের প্রাচীর কিছুটা দুর্বল হলেও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এখনও বিভিন্ন জাতের মধ্যে সম্পদ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় বড় ধরনের পার্থক্য রয়ে গেছে। পিছিয়ে পড়া জাতগুলোর মধ্যে এখনও অশিক্ষা, অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি অনেক বেশি। মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রেও তারা কম সুবিধা পায়। তাছাড়া ভারত সরকারের কাছে জাতপাত সম্পর্কিত সঠিক কোন সঠিক বা নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। কোন জাতের কত মানুষ আছে, আর কারা এগিয়ে আর কারা পিছায়ে, সরকারের কাছে এমন তথ্য থাকলে পিছায়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য সরকার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারবে এমন যুক্তিও অনেকে দেখাচ্ছেন।

তবে পক্ষে যুক্তি যতই থাকুক মানব সভ্যতার অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যয় জাতপাত প্রথা নিয়ে প্রায় ১০০ বছর পর আবার প্রশ্ন করা হবে এ বিষয় নিয়ে অনেকেই বিস্মিত। জাতপাত প্রথার জন্য সমাজের এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে শত শত বছর ধরে কষ্ট, বঞ্ছনা ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে, সেটাকে নতুন করে টেনে তোলা মানে, কাঁটা গায়ে নুন ছিটানো। সমাজে এর চর্চা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। জাতিগত জনসংখ্যার পরিসংখ্যান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ভোটের সমীকরণ, গোষ্ঠীগত প্রতিনিধিত্ব এবং সংরক্ষণের দাবির মত নানা ঘটনা পূর্বের জাতপাত কে উস্কে দিতে পারে এবং  সামাজিক বিভাজনকে বাড়িয়ে দিতে পারে। নতুন করে জাতপ্রথার চর্চা মানে ফকির লালন শাহ, ডক্টর আম্বেদকরের মত লোকদের প্রচেষ্টাগুলোকে অস্বীকার করা, তাদেরকে অপমান করা। 

ভারতে কীভাবে আদমশুমারী হবে, সেটা ভারতের নিজস্ব ব্যাপার। বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী  কোন দেশের নাগরিকের এই বিষয়ে কথা বলার কোন অধিকার না থাকাটাই স্বাভাবিক। এটা শুধু কোন একটা রাষ্ট্রের ব্যাপার নয়, এর সাথে যুক্ত হয়ে যায় ধর্ম ও সমাজ। আমাদের সমাজেও এর প্রভাব পড়বে না এটা কেউ জোর করে বলতে পারেনা।  

সমাজ বিজ্ঞানী, রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের মতে জাতপাত কোন জাতির বা অঞ্চলের কোনও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি। বরং জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতা পুরোপুরি সমাজকে বিশৃঙ্খল ও নীতিভ্রষ্ট করে দিয়েছে। এটা মানবসমাজে বিভেদের প্রাচীর সৃষ্টি করেছে, মনুষ্যত্বের পক্ষে ক্ষতিকর এবং সাম্য প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করেছে। তিনি মনে করতেন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য এ অঞ্চল থেকে বর্ণ-বৈষম্য শোষণ নির্মূল করা দরকার। 

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর