প্রথমে শ্রীলংকায় ঘটেছিল গণবিস্ফোরণ। সম্প্রতি হিমালয় কন্যা নেপালে দেখা গেল বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের চিত্র। মালদ্বীপ ও পাকিস্তানে রেজিম পরিবর্তন হয়েছে। মূলকথা, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক চিত্রে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। ভারত অনেক বড় দেশ সেখানে এই ধরনের গণআন্দোলন বা রেজিম পরিবর্তনের সুযোগ খুব কম তারপরও সাধারণ মানুষ যেন অস্থিরতার মধ্যে আছে।
বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকা তিনটি দেশ আলাদা হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা, বিদ্রোহের চরিত্র, জনতার অপ্রতিরোধ্য শক্তি এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া অভাবনীয়ভাবে একই রকমের। সবচেয়ে বড় মিল হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষ যেন আর গতানুগতিক রাজনীতির ওপর ভরসা করতে পারছে না। সবার একই ক্ষোভ প্রচলিত নিয়ম, রাজনৈতিক দল ও নেতা ও কর্মীদের ওপর।
বিজ্ঞাপন
তরুণ বা জেন-জিদের নজিরবিহীন আন্দোলনে ছিন্নভিন্ন হলো নেপালের মসনদ। তরুণদের সাথে যোগ দেয় জনতা এবং দীর্ঘ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
একের পর এক সরকারি ভবন ও দফতর দখল করে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালায়। আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রায় ৫০ জন নিহত হয়। এক পর্যায় প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। অনেকে পালিয়ে যান। বাংলাদেশের শেখ হাসিনার মতো প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির শেষ ভরসা হয়ে ওঠে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। যারা পালাতে পারেননি তাদের তাড়া করে মারপিট করেছে আন্দোলনকারীরা। সংসদ ভবন, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বাসভবন অগ্নিসংযোগ হয়েছে। সাবেকরাও বাদ যায়নি। মন্ত্রী ও বিভিন্ন নেতাদের বাড়ি খুঁজে খুঁজে হামালা চালানো হয় ও আগুন দেওয়া হয়। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়।
নেপালে ছাত্র এবং তরুণ প্রজন্মের স্লোগান ছিল ‘ওলি সরকার মুর্দাবাদ, জেন-জি জিন্দাবাদ, মন্ত্রীরা চোর, প্রচণ্ড চোর ইত্যাদি। আন্দোলনের সংগঠকরা বলছেন, শুধু ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদ নয় বরং এর পেছনে রয়েছে দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য, অকার্যকর প্রশাসন, দমননীতি, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক স্থবিরতা। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২০ দশমিক আট শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থান কেবল ইতিহাস নয় বরং স্বৈরচারী ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একটি মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আত্মপ্রকাশ করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে এবং অনেক সরকার প্রধানের পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস আছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একবারে এত লোক পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস কোথাও নেই। প্রধানমন্ত্রী, তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, আশপাশের লোকজন, দুই একজন বাদে বর্তমান ও সাবেক সব কেবিনেট সদস্য ও এমপিরা, কেন্ত্রীয় নেতা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারাসহ অনেক তৃণমূলের নেতারা পালিয়ে যান। পাশাপাশি অনেক সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী এমনকি মসজিদের ইমামও পালিয়ে যান।
বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে প্রায় ১৪০০ লোক নিহত হয়। নিহতদের বেশির ভাগ ছাত্র, চাকরিপ্রত্যাশী, তরুণ ও শিশু-কিশোর। প্রতিটি মৃত্যই যেন এক একটা শোক গাঁথা। সাভারের আশুলিয়াসহ বিভিন্ন জায়গার হত্যাকাণ্ডের ভিডিও প্রকাশ হয়েছে যেগুলো দেখে মানুষ বাকরুদ্ধ, অসুস্থ হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশে অনেক গণআন্দোলন হয়েছে। বন্দুকের নলের সামনে আগে আবু সাঈদের মতো কাউকে কখনো এমন বুকটান করে দাঁড়াতে দেখা যায়নি।
আবু সাঈদ সারা বাংলাদেশের প্রতীক, গুটি কয়েক পরিবার ছাড়া প্রায় সবার অবস্থা আবু সাঈদের মতো। এ দেশের লাখো শিক্ষার্থী কোনো না কোনো কষ্ট স্বীকার করে পড়াশোনা চালিয়ে যায়, একটি চাকরির আশায়, স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠনের আশায়। কোটা নামের বৈষম্য আর দুর্নীতি তাদের স্বপ্ন পূরণের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষ করে চাকরির জন্য ‘লাইনঘাট, ‘সিস্টেম’ আর ‘মামু খালুর’ সন্ধানে ব্যস্ত থাকতে হয়।
স্বাধীনতার এত বছর পর স্বচ্ছ ও প্রশ্নহীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারাটাই বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। শুধু নিয়োগ প্রতিষ্ঠান নয়, দেশের সব প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ধ্বংস হতে বসে ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর এদেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না। পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নির্বাচন কমিশন সবখানে একই অবস্থা।
সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার ও সংসদে সত্যিকার অর্থে বিরোধী দল খুবই আবশ্যক। আর তা না থাকলে কী ঘটে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জুলাই আন্দোলনের কয়েকটি জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল, দালালি না রাজপথ- রাজপথ, রাজপথ; অনাস্থা অনাস্থা, স্বৈরতন্ত্রে অনাস্থা; আঁর ন হাঁইয়্যে, বৌতদিন হাঁইয়্য’ (আর খেয়ো না, অনেক দিন খেয়েছ); চেটে নয় খেটে খাও; আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই, উই ওয়ান্ট জাস্টিস, রাষ্ট্র সংস্কার চাই ইত্যাদি।
বাংলাদেশে প্রথম যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল অন্যায্য কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে, শ্রীলঙ্কায় শুরু হয়েছিল জিনিসপত্রের উচ্চমূল্যের বিরুদ্ধে। ৯ জুলাই ২০২২ শ্রীলঙ্কার বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন দখল করে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে পলায়ন করেন পেছনের দরজা দিয়ে। বিমানবন্দর ও নৌবাহিনীর জাহাজে পালাতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সেনাবাহিনীর বিমানে করে মালদ্বীপ পৌঁছেন। এরপর সিঙ্গাপুর। সেখান থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান। বিক্ষোভকারীরা মন্ত্রী-এমপিদের বাড়ি ভঙচুর করে ও আগুন ধরিয়ে দেয়।
জনরোষ পড়ে দুই দশক ধরে কর্তৃত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী রাজাপাকসে পরিবারের ওপর। একই পরিবারের অন্তত সাতজন মন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। তাদের একনায়কত্ব, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুঃশাসনের জন্য অর্থনৈতিক মন্দা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সিংহলি ভাষায় লঙ্কানরা সেই অভ্যুত্থানকে বলছিলেন ‘আরগালয়। আরগালয় মানে, ‘সংগ্রাম’। শ্রীলঙ্কার আন্দোলনে জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল "We want system change", "No more corruption", "Power to the People" ও "দেশ আমাদের, লুটেরাদের নয়" ইত্যাদি।
ভারত উপমহাদেশের দেশগুলো মূলত ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন হয়। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে পুনরায় স্বাধীনতা লাভ করে। আশা করা হয়েছিল, স্বাধীনতার পর কোনো বৈষম্য থাকবে না, সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা পাবে। কিন্তু কিছু লোক তাদের সুবিধাবাদী চরিত্র বদলানোর পরিবর্তে আরও চরম আকারে চর্চা শুরু করে।
এই অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা ছিল সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলবে প্রতিটি দেশ। কিন্তু গণতন্তের আড়ালে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসে। ফ্যাসিবাদ হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রের এক বিশেষরূপ। জনগণকে মুলা দেখিয়ে জনগণের উপর ভর করে ক্ষমতা এসে জনগণের প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে, ভোটের অধিকার হরণ করে। ফ্যাসিবাদ নিজের দোষ স্বীকার করে না, মনে করে তারা যেটা করছে, সেটাই সঠিক।
একবার ক্ষমতায় আসলে আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। নির্বাচনী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে চায়। বাংলাদেশের মত শ্রীলঙ্কায় নির্বাচনী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা হয়ে ছিল। উপমহাদেশের মানুষ ভোটকে ‘উৎসব’ বলে মনে করে। ভোটের সময় দেশের গ্রাম-গঞ্জে গেলে বোঝা যায় মানুষ এই উৎসবে কতটা আগ্রহ নিয়ে সামিল হন। কিন্তু ইতিহাসের নিরিখে দেখা যায় মানুষ ও সাধারণ ভোটারদের খুব কমই মূল্যায়ন করা হয়েছে। লক্ষণীয় যে, ভোটার থাকতে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়া, পাতানো নির্বাচন, রাতের ভোট, ভোট ডাকাতি, ভোট জালিয়াতি, ভোট ম্যাকানিজম, বন্দুকের নল, বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচার, ভয়ভীতি দেখিয়ে সিল মারা, ভূতুড়ে ভোট, গায়েবি ভোট, টাকা পয়সার ছড়াছড়িসহ অনেক ঘটনা বারবারই বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা যে, ক্ষমতাসীন বা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো জাতীয় নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে ১৯৯১, ১৯৯৬ (১২ জুন), ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন মোটামুটি নিরপেক্ষ হয়েছিল এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল- এ বিষয়ে কারোর দ্বিমত থাকার কথা নয়। ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের উদ্যোগ নেন। ফলে যে তরি চড়ে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল, সেটা আর থাকল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া পরপর তিনটি নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র-ভোট তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সিন্ডিকেটের দখলে চলে যায়।
ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আছে নরেন্দ্র মোদীর বিজিপি। ইচ্ছামত আইন তৈরি করে, ধর্মকে কাজে লাগিয়ে, গণমাধ্যমসহ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করছে।
লক্ষণীয় যে, ভারত উপমহাদেশের প্রায় সব দেশে রাজনীতিজীবির সংখ্যা বা রাজনীতির ছত্রছায়ায় থেকে জীবিকা অর্জন বা দ্রুত ধনী হতে চায় এমন লোকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশে দেখা যায় অনেকে কাজ করে জীবিকা অর্জন করতে চায় না। রাজনৈতিক দল ও তার অন্য অঙ্গ সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে থাকে। গ্রাম বা মহল্লার চায়ের দোকান থেকে বড় বড় অফিস আদালত সর্বত্র তাদের আনাগোনা। বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি ভাতা ও উন্নয়ন কাজে জোঁকের মত লেগে থাকে। ব্রিটিশ আমল থেকে একটা সময় পর্যন্ত দেখা যায় উপমহাদেশের জাতীয় নেতাদের অনেকের শহরে বাড়ি ছিল না, তেমন ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না। কিন্তু এখন এসব তৃণমূল নেতাদের পক্ষে সম্ভব। রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্টতা যেন শক্তি বা ক্ষমতার মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দলের যুব, ছাত্র ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে ধরাকে সরা জ্ঞান কারতে চায়। যে কারণে তারা বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের নৃশংস, বর্বর, নির্যাতন, ভয়, দমন-পীড়নের মতো ঘটনা ঘটিয়ে থাকে।
বিভিন্ন পেশার ক্ষেত্রেও এমনটা দেখা যায়। অনেকে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে থাকতে চায় কেননা এতে সম্মান, অর্থ, পদোন্নতি অনেক প্রাপ্তি থাকে। তাইতো দেখা যায়, সচিবলায়, এনবিআর, আদালত, কলেজ-বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা, সাংবাদিকরা ও অন্যান্য সরকারি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কাজ কর্ম বাদ দিয়ে মিছিল মিটিং ও রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিক কাজে ব্যস্ত থাকে। এই সমস্ত কর্মকাণ্ড একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম ও বিশ্বব্যাংকের জরিপ থেকে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করতে খরচ হয় তা চীনসহ অনেক দেশ থেকে কয়েক গুণ বেশি। এমনকি ইউরোপের সড়ক নির্মাণের খরচের চেয়ে বেশি। আবার বছর না যেতেই সেসব রাস্তা নষ্ট হয়ে যায়, আবার নতুন করে টেন্ডার দিতে হয়।

পৃথিবীর অনেক দেশে দুর্নীতি, লুটপাট ও অপকর্ম রয়েছে। কিন্তু, আমাদের উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলাদেশের অপকর্ম-দুর্নীতি একটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে যায়। যার বর্ণনা দিতে একেক জনের জন্য বই ছাপানোর প্রয়োজন পড়ে। হাজার বিঘার ওপরে ভূমি, দেশে-বিদেশে অসংখ্য ফ্ল্যাট, প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট, দেশে-বিদেশের ব্যাংক ও কোম্পানিতে হাজার হাজার কোটি টাকা প্রভৃতি। অনেকে টাকা পাচারের জন্য নিজেরাই চালু করে মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান।
আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্সফামের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের অনেক দেশের মত ভারত উপমহাদেশে সম্পদের বড় অংশ কিছু গোষ্ঠী বা লোকের কাছে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে, বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক অনুসারে, ১১২টি দেশের ৬৩০ কোটি মানুষের ওপর পরিচালত গবেষণায় দেখা গেছে ১১০ কোটি মানুষ তীব্র দারিদ্রের মধ্যে বাস করছে। চরম দারিদ্র্যে থাকা জনগোষ্ঠীর ৮৩ শতাংশের বেশি বসবাস করেন আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে।
সূচক অনুযায়ী, দেশ হিসাবে বিশ্বে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দরিদ্র মানুষের বসবাস ভারতে। দেশটির ১৪০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ২৩ কোটি ৪০ লাখই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে আছেন। এর পরই রয়েছে পাকিস্তান (৯ কোটি ৩০ লাখ)। দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশুরা।
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ১৭ লাখ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৬.১৪ লাখ কোটি টাকা ও মাথাপিছু ঋণ ৯৫ হাজার ১৯ টাকা। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের তকমা পেলেও তাদের প্রায় ১০০ কোটি মানুষেরই পছন্দসই পণ্য কেনা বা সেবা গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত অর্থের অভাব রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠিত হয়ে ছিল। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দেড় দশক ধরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। প্রতিবছর পাচার করা অর্থের পরিমাণ ছিল গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার।
নিউইয়র্কভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স জানিয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সম্পদ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী শীর্ষস্থানীয় ছিল। গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ৫০ লাখ ডলার বা তারচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক এমন মানুষের সংখ্যা বছরে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে বাড়ছে। এই হার ভিয়েতানামকেও ছাড়িয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গণবিস্ফোরণ, গণঅভ্যুত্থান, গণঅসন্তোষ, বিদ্রোহ কোন অস্বাভাবিক বিষয় নয়। একনায়কতন্ত্রী, কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিবাদ ও সিস্টেমবাজনীতি পরিহার করে জনগণের বাস্তব সমস্যা সমাধানে সবাইকে তৎপর হওয়া উচিত।
এটা প্রমাণিত হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের চালিকাশক্তি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল নয়; বরং তরুণ সমাজ ও জনতা। উপমহাদেশের প্রতিটি দেশের রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারণীমহল বিশেষ করে যারা শাসন কার্যক্রমের সাথে জড়িতরা দ্রতসম্ভব জনগণের মনোভাব ও আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করতে পারাটাই সবার জন্য মঙ্গলকর।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

