অষ্টম পর্ব
গতপর্বে কথা ছিলো এই পত্রটি কয়েক পর্বে আলোচনা করা হবে। কারণ এই পত্রটি বেশ বড়। এতো বৃহৎ পত্র এক পর্বে শেষ করলে তা পাঠকের ওপর চাপ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যে মহান কবি এটি লিখেছেন, সেই কবি ও অনিন্দ্য পত্রটির প্রতিও সবিশেষ অবিচার হয়। তাই আজ পত্রটির মধ্যাংশের মূলবার্তা নিয়ে কিছু আলোচনা হবে।
যাক, কাজের কথাগুলো বলে নেই আগে।
আমায় এখনো ধরেনি, তার প্রমাণ এই চিঠি। তবে আমি ধরা দেওয়ার দিকে হয়তো এগোচ্ছি। ধরা পড়া আর ধরা দেওয়া এক নয়, তা হয়তো বোঝো। ধরা দিতে চাচ্ছি, নিজেই এগিয়ে চলেছি শত্রু-শিবিরের দিকে, এর রহস্য হয়তো বলতে পারি। এখন বলব না। অত বিপুল যে সমুদ্র, তারও জোয়ারভাটা আসে অহোরাত্রি। এই জোয়ার-ভাটা সমুদ্রেই খেলে, আর তার কাছাকাছি নদীতে; বাঁধ-বাঁধা ডোবায়, পুকুরে জোয়ার-ভাটা খেলে না। মানুষের মন সমুদ্রের চেয়েও বিপুলতর। খেলবে না তাতে জোয়ার-ভাটা! যদি না খেলে, তবে তা মানুষের মন নয়। ঐ শান-বাঁধানো ঘাট-ভরা পুকুরগুলোতে কাপড় কাঁচা চলে, ইচ্ছে হলে গলায় কলসি বেঁধে ডুবে মরাও চলে, চলে না ওতে জাহাজ, দোলে না ওতে তরঙ্গদোলা, খেলে না ওতে জোয়ার-ভাটা... আমি একবার অন্তরের পানে ফিরে চলতে চাই, যেখানে আমার গোপন সৃষ্টি-কুঞ্জ, যেখানে আমার অনন্ত দিনের বধূ আমার জন্য বসে মালা গাঁথছে। যেমন করে সিন্ধু চলে ভাটিয়ালি টানে, তেমনি করে ফিরে যেতে চাই গান-শ্রান্ত ওড়া-ক্লান্ত আমি। আবার অকাজের কথা এসে পড়ল। পুষ্প-পাগল বনে কাজের কথা আসে না, গানের ব্যথাই আসে, আমায় দোষ দিও না।
‘অগ্নি-বীণা’ বেঁধে দিতে দেরি করছে দফতরি, বাঁধা হলেই অন্যান্য বই ও 'অগ্নি-বীণা' পাঠিয়ে দেবো একসাথে। ডি.এম. লাইব্রেরিকে বলে রেখেছি। আর দিন দশকের মধ্যেই হয়তো বই পাবে। আমার পাহাড় ও ঝর্নাতলে তোলা ফটো একখানা করে পাঠিয়ে দিও। গ্রুপের ফটো একখানা (যাতে হেমন্তবাবু ও ছেলেরা আছে), আমি, বাহার ও অন্য কে একটি ছেলেকে নিয়ে তোলা যে ফটোর তার একখানা এবং আমি ও বাহার দাঁড়িয়ে তোলা ফটোর একখানা পাঠিয়ে দিও আমায়। ফটোর সব দাম আমার বই বিক্রির টাকা হতে কেটে নিও।
এখন আবার কোনদিকে উড়ব, ঠিক নেই কিছু। যদি না ধরে কোথাও হয়তো যাব, গেলে জানাব। এখন তোমার চিঠিটার উত্তর দিই। তোমার চিঠির উত্তর তোমার ভাবীই দিয়েছে শুনলাম। আরো শুনলাম, সে নাকি আমার নামে কতগুলো কী সব লিখেছে তোমার কাছে। তোমার ভাবীর কথা বিশ্বাস কোরো না। মেয়েরা চিরকাল তাদের স্বামীদের নির্বোধ মনে করে এসেছে। তাদের ভুল, তাদের দুর্বলতা ধরতে পারা এবং সকলকে জানানোই যেন মেয়েদের সাধনা। তুমি কিন্তু নাহার, রেগো না যেন। তুমি এখনও ওদের দলে ভিড়োনি। মেয়েরা বড্ড অল্পবয়সে বেশি প্রভুত্ব করতে ভালোবাসে। তাই দেখি, বিয়ে হবার এক বছর পর ষোলো-সতেরো বছর বয়সেই মেয়েরা হয়ে ওঠে গিন্নি। তাঁরা যেন কাজে-অকাজে, কারণে অকারণে-স্বামী বেচারিকে বকতে পারলে বেঁচে যায়। তাই সদাসর্বদা বেচারা পুরুষের পেছনে তারা লেগে থাকে গোয়েন্দা পুলিশের মতো। এই দেখো না ভাই, ছটাকখানেক কালি ঢেলে ফেলেছি চিঠি লিখতে লিখতে একটা বই-এর ওপর, এর জন্য তোমার ভাবীর কী তম্বিহ, কী বকুনি। তোমার ভাবী বলে নয়, সব মেয়েই জমনি। স্ত্রীদের কাছে স্বামীরা হয়ে থাকে একেবারে বেচারাম লাহিড়ী।
একটা কথা আগেই বলে রাখি, তোমার কাছে চিঠি লিখতে কোনো সঙ্কোচের আড়াল রাখিনি। তুমি বালিকা এবং বোন বলে তার দরকার মনে করিনি। যদি দরকার মনে করো, আমায় মনে করিয়ে দিও। আমি এমন মনে করে চিঠি লিখিনি, যে কোনো পুরুষ কোনো মেয়েকে চিঠি লিখছে। কবি লিখছে চিঠি তার প্রতি শ্রদ্ধান্বিতা কাউকে, এই মনে করেই চিঠিটা নিও। চিঠি লেখার কোথাও কোনো ত্রুটি দেখলে দেখিয়ে দিও।
আমার ‘উচিত আদর’ করতে পারোনি লিখেছ, আর তার কারণ দিয়েছ; পুরুষ নেই কেউ বাড়িতে এবং অসচ্ছলতা। কথাগুলোয় সৌজন্য প্রকাশ করে খুব বেশি, কিন্তু ওগুলো তোমাদের অন্তরের কথা নয়। কারণ, তোমরাই সবচেয়ে বেশি করে জানো যে তোমরা যা আদর-যত্ন করেছ আমার, তার বেশি করতে কেউ পারে না। তোমরা তো আমার কোথাও ফাঁক রাখোনি আমার শূন্যতা নিয়ে অনুযোগ করবার। তোমরা আমার মাঝে অভাবের অবকাশ তো দাওনি তোমাদের অভাবের কথা ভাববার; এ আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। আমি সহজেই সহজ হতে পারি সকলের কাছে, ওটা আমার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, কিন্তু তোমাদের কাছে যতটা সহজ হয়েছি-অতটা সহজ বুঝি আর কোথাও হইনি। সত্যি নাহার আমায় তোমরা আদর-যত্ন করতে পারনি বলে যদি সত্যিই কোনো সংকোচের কাঁটা থাকে তোমাদের মনে, তবে তা অসংকোচে তুলে ফেলবে মন থেকে। অতটা হিসেব-নিকেশ করবার অবকাশ আমার মনে নেই, আমি থাকি আপনার মন নিয়ে আপনি বিভোর। মানুষের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলতে বলতেও অন্যমনস্ক হয়ে পড়ি, খেই হারিয়ে ফেলি কথার। আমার গোপনতম কে যেন একেবারে নিশ্চুপ হয়ে থাকতে আদেশ করে। আর আর্থিক অসচ্ছলতার কথা লিখেছ।
অর্থ দিয়ে মাড়োয়ারিকে, জমিদার মহাজনকে বা ভিখিরিকে হয়তো খুশি করা যায়, কবিকে খুশি করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের ‘পুরস্কার’ কবিতাটি পড়েছ? ওতে এই কথাই আছে। কবি রাজদরবারে গিয়ে রাজাকে মুগ্ধ করে রাজপ্রদত্ত মণি-মাণিক্যের বদলে চাইলে রাজার গলার মালাখানি। কবি লক্ষ্মীর প্যাঁচার আরাধনা কোনো কালে করেনি, সরস্বতীর শতদলেরই আরাধনা করেছে-তাঁর পদ্মগন্ধে বিভোর হয়ে শুধু গুনগুন করে গান করেছে আর করেছে। লক্ষ্মীর ঝাঁপির কড়ি দিয়ে কবিকে অতিবন্দনা করলে কবি তাতে অখুশি হয়ে ওঠে। কবিকে খুশি করতে হলে দিতে হয় অমূল্য ফুলের সওগাত। সে সওগাত তোমরা দিয়েছ আমার অঞ্জলি পুরে।
কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবি চায় পূজা। কবিত্ব আর দেবত্ব এইখানে এক। কবিতা আর দেবতা-সুন্দরের প্রকাশ। সুন্দরকে স্বীকার করতে হয় সুন্দর যা তাই নিয়ে। রূপার দাম আছে বলেই রূপা অত হীন। হাটে-বাজারে মুদির কাছে, বেনের কাছে ওজন হতে হতে এর প্রাণান্ত ঘটল; রূপের দাম নেই বলেই রূপ এত দুর্মূল্য, রূপ এত সুন্দর, এত পূজার। রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে। রূপের হাটের বেচা-কেনা অদ্ভুত। যে যত বিনা দামে কিনে নিতে পারে, সে তত বড় রূপ-রসিক সেখানে। কবিকে সম্মান দিতে পারোনি বলে মনে যদি করেই থাক, তবে তা মুছে ফেল।
কোকিল পাপিয়াকে বাড়িতে ডেকে ঘটা করে খাওয়াতে পারনি বলে তারা তো অনুযোগ করেনি কোনোদিন। সে-কথা ভাবেওনি কোনোদিন তারা। তারা তাই বলে তোমার বাতায়নের পাশে গান গাওয়া বন্ধ করেনি। তাছাড়া কবিকে হয়তো সম্মান করা যায় না-কাব্যকে সম্মান করা যায়। তুমি হয়তো বলবে, গাছের যত্ন না নিলে ফুল দেয় না। কিন্তু সে যত্নেরও তো ত্রুটি হচ্ছে না। অনাত্মীয়কে লোকে সংবর্ধনা করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে; বন্ধুকে গ্রহণ করে হাসি দিয়ে, হৃদয় দিয়ে।
উপদেশ আমি তোমায় দেইনি। যদি দিয়ে থাকি, ভুলে যেয়ো। উপদেশ দেওয়ার চাণক্য আমি নই। দিয়েছি তোমার অনাগত বিপুল সম্ভাবনাকে অঞ্জলি-তোমার মাঝের অপ্রকাশ সুন্দরকে প্রকাশ-আলোতে আসার আহ্বান জানিয়েছি শঙ্খধানি করে। উপদেশের ঢিল ছুঁড়ে তোমার মনে বনের পাখিকে উড়িয়ে দেবার নির্মমতা আমার নেই, এ তুমি ধ্রুব জেনো। আমি ফুল-ঝরা দিয়ে হাসাই, শাখার মার দিয়ে কাঁদাইনে।”
উপরের পত্রাংশে বেশ কিছু দার্শনিক সত্য ফুটে উঠেছে। যেমন: ‘ধরা পড়া আর ধরা দেওয়া এক নয়’। এই বাক্যে কবি নজরুল নিজের ইচ্ছাশক্তির কথা বলেছেন। মূলত স্বাধীন সত্বার কথাই বলেছেন। তিনি পরিস্থিতির শিকার হয়ে ধরা পড়তে চান না; বরং নিজের সিদ্ধান্তে সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে চান। এর অর্থ হলো, তিনি স্বেচ্ছাধীন। আবার, ‘নিজেই এগিয়ে চলেছি শত্রু-শিবিরের দিকে’। এখানে শত্রু-শিবির শুধু বাইরের কোনো জায়গা নয়। এটি নিজের ভেতরের সত্যের মুখোমুখি হওয়ার প্রতীক। মানুষ অনেক সময় সত্য জেনেও তার কাছ থেকে পালিয়ে থাকে।
আরও পড়ুন: কাজী নজরুল ইসলামের পত্রের শিল্পরূপ
কবি নজরুল সেটি চাননি। তিনি ভন্ডামিকে মেনে নিতে পারেননি। যা সত্য, তা তিনি অসংকোচ প্রকাশ করবেনই। আরেকটি চরম সত্য তিনি প্রকাশ করেছেন, যা মানুষের জীবনের উত্থান-পতনের সাথে মিলিয়ে বলেছেন, তা হলো: ‘সমুদ্রেরও জোয়ারভাটা আসে’। সমুদ্রের মতো মানুষের মনও পরিবর্তনশীল। কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ, কখনো আশা, কখনো হতাশা। এসব মিলিয়েই মানুষের মন। মানুষের জীবনের এই ক্রমপরিবর্তনশীলতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কবি তাই বোঝাতে চান।
‘বাঁধ-বাঁধা ডোবায়... জোয়ার-ভাটা খেলে না’। এমন অতিদার্শনিকতা বাংলা সাহিত্যে খুব সহজলভ্য নয়। ‘গতিই জীবন। স্থিতিই মরণ।’ এমন গতিবাদের কথাই এখানে ধ্বনিত হয়েছে। স্থির ও সংকীর্ণ জীবনকে এখানে পুকুরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এমন জীবনে গভীর অনুভূতি বা বড় স্বপ্নের জায়গা কম। জীবনকে গতিশীল নদীর মতো ছেড়ে দিতে হবে। দুঃখ-বেদনা সব সঞ্চয় করেই, জীবন হয়ে উঠবে আদর্শ। আইকোনিক জীবন। অনুস্মরণীয় এবং অনুকরণীয়। এমন চেতনা থেকেই কবি খেছেন- ‘মানুষের মন সমুদ্রের চেয়েও বিপুলতর’। মানুষের মনের গভীরতা অসীম। সেখানে নানা অনুভূতি ও চিন্তার ঢেউ ওঠে। তাই মনকে এক জায়গায় আটকে রাখা যায় না। আবার, দিন শেষে কবি নীড়ে ফিরতে চান। মালিকহীন হতে চান না। তাই তার মনের আকুতি- ‘অন্তরের পানে ফিরে চলতে চাই’। শেষ পর্যন্ত মানুষ নিজের সত্যিকারের সত্বার কাছেই ফিরতে চায়। বাইরের ক্লান্তি পেরিয়ে নিজের ভেতরের শান্তি ও সৃষ্টিশীলতার কাছে ফিরে যাওয়াই এখানে মূল আকাঙ্ক্ষা। তবে স্বাধীন মন; অন্তর্দ্বন্দ্ব, পরিবর্তন এবং নিজের সত্যকে খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা বলে। আবর স্বাধীন মুক্ত জীবনের কথা। পাখির মতো স্বাধীনতার কথা। কবি নজরুলের এই স্বাধীনতার মহান বাণী তার কাব্য-গান, সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় প্রতিভাস্বরিত হয়েছে। ‘এখন আবার কোনদিকে উড়ব, ঠিক নেই কিছু।’ এই কথার মধ্যে জীবনের অনিশ্চয়তা ফুটে উঠেছে। মানুষ অনেক সময় নিজের পরবর্তী পথ জানে না। তবু তাকে চলতে হয়।
অনিশ্চয়তার মধ্যেই জীবনের আসল পরীক্ষা। ‘যদি না ধরে কোথাও হয়তো যাব, গেলে জানাব।’ এখানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আছে। কবি কোনো নির্দিষ্ট বন্ধনে নিজেকে আটকে রাখতে চান না। তার জীবন যেন চলমান পাখির মতো।
কবি নজরুলের রসবোধ ছিলো সহজাত। গভীর ও গম্ভীর পরিবেশকে তিনি হঠাৎ হঠাৎ হাসি-আনন্দে হালকা করে দিতেন। এই পত্রাংশে যেমন তিনি হঠাৎ লিখেছেন- ‘তোমার ভাবীর কথা বিশ্বাস কোরো না।’ কথাটির মধ্যে রসিকতা আছে। তিনি সম্পর্কের ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝিকে হাসির মাধ্যমে সহজ করে তুলেছেন। এতে চিঠির আন্তরিকতা প্রকাশ পেয়েছে। আর নারীদের স্বভাবজাত কর্তৃত্ববাদের বিষয়কেও আনন্দিত বর্ণনায় আলোকিত করেছেন। এরপরেই তাই কবি লিখেছেন- ‘মেয়েরা চিরকাল তাদের স্বামীদের নির্বোধ মনে করে এসেছে।’
এখানে লেখক মজা করে নারী-পুরুষের দাম্পত্য সম্পর্কের একটি চিরাচরিত চিত্র তুলে ধরেছেন। কথাটি আক্ষরিক সত্য নয়; বরং হাস্যরসের মাধ্যমে সংসারের পরিচিত টানাপোড়েন দেখানো হয়েছে। পরপর কয়েকটি বাক্যে তিনি দাম্পত্যের মধুরতা এভাবে তুলে ধরেছেন- ‘তাদের ভুল, তাদের দুর্বলতা ধরতে পারা এবং সকলকে জানানোই যেন মেয়েদের সাধনা।’
এই কথার মধ্যে দাম্পত্য জীবনের মজার দিকটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। কাছের মানুষ বলেই মানুষ তার ভুল বেশি দেখতে পায়। ভালোবাসার সম্পর্কেও তাই অভিযোগ ও খুনসুটি থাকেই। আরেকটি চরম হাস্যোউদ্দীপক বাক্য হলো- ‘মেয়েরা বড্ড অল্পবয়সে বেশি প্রভুত্ব করতে ভালোবাসে।’ এখানেও লেখক ব্যঙ্গের আশ্রয় নিয়েছেন। সংসারে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কীভাবে সম্পর্কের মধ্যে জায়গা করে নেয়, তিনি সেটি হাসির মাধ্যমে বলেছেন। ‘স্বামী বেচারিকে বকতে পারলে বেঁচে যায়।’ এটি মূলত রসিক মন্তব্য। সংসারের ঝগড়াকে তিনি গুরুতর করে দেখেননি। বরং হাস্যরস দিয়ে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ও বিরোধকে হালকা করেছেন। স্ত্রীর প্রতি সম্মান থাকা জরুরি। হাস্যরসের মধ্যে দ্যোতনা করলেও কবি সশ্রদ্ধভরে বলেছেন-‘স্ত্রীদের কাছে স্বামীরা হয়ে থাকে একেবারে বেচারাম লাহিড়ী।’
এই কথায় আত্মপরিহাস আছে। লেখক নিজেকেও সেই সাধারণ স্বামীর অবস্থানের মধ্যে রেখেছেন। নিজের দুর্বলতা নিয়ে হাসতে পারা তার সহজ ও প্রাণবন্ত মানসিকতার পরিচয়।
হাস্যরসের পর আবারও কবি মুড ব্যক্তিত্বে সুইং করেছে। তিনি যে এক ভক্তের কাছে পত্র লিখছেন। সেটি যেন ভুলে না যান, এই কারণে এবারবিলছেন, ‘তোমার কাছে চিঠি লিখতে কোনো সঙ্কোচের আড়াল রাখিনি।’ এখানে সম্পর্কের প্রতি তার গভীর বিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছে। তিনি কৃত্রিম ভদ্রতার দেয়াল রাখতে চাননি। সত্যিকারের সম্পর্কের ভিত্তি তার কাছে সরলতা ও বিশ্বাস। ‘তুমি বালিকা এবং বোন বলে তার দরকার মনে করিনি।’
কবি চিঠির সম্পর্ককে পারিবারিক ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক হিসেবে দেখেছেন। তাই কথাবার্তায় স্বাভাবিকতা এসেছে। ‘কবি লিখছেন চিঠি তার প্রতি শ্রদ্ধান্বিতা কাউকে।’ এই লাইনটি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে লেখক নিজের পরিচয়কে শুধু পুরুষ হিসেবে নয়, একজন কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার কাছে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মূল ভিত্তি লিঙ্গ নয়, শ্রদ্ধা ও মানবিকতা। আবার লেখার স্পর্ধার সীমারেখা নিজেই টেনে দিয়ছেন। ‘চিঠি লেখার কোথাও কোনো ত্রুটি দেখলে দেখিয়ে দিও’ এই বাক্যের মধ্য দিয়ে। এখানে লেখকের বিনয় প্রকাশ পেয়েছে। তিনি নিজের কথাকেও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখেননি। অন্যের মতামত গ্রহণ করার মানসিকতা তার মধ্যে ছিলো।
কবি নজরুল ছিলেন অত্যন্ত উঁচুমানের ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ। উদারতা ছিলো তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাই নিঃসংকোচে তিনি বলছেন, ‘তোমরা আমার আদর-যত্ন করতে পারনি বলে যদি সত্যিই কোনো সংকোচের কাঁটা থাকে... তুলে ফেলবে মন থেকে।’ এখানে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, ভালোবাসার মূল্য অর্থ দিয়ে মাপা যায় না। আন্তরিকতা থাকলে অভাবও বড় হয়ে ওঠে না। ‘তোমরা আমার মাঝে অভাবের অবকাশ তো দাওনি।’ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো আপনজনের ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থাকলে অনেক বাস্তব অভাবও অনুভূত হয় না। ‘আমি সহজেই সহজ হতে পারি সকলের কাছে... তোমাদের কাছে যতটা সহজ হয়েছি, অতটা সহজ বুঝি আর কোথাও হইনি।’ এখানে গভীর বিশ্বাসের কথা আছে।
মানুষের কাছে নিজের মনের দরজা খুলে দেওয়া সহজ নয়। যাদের কাছে আমরা নিরাপদ বোধ করি, তাদের কাছেই সবচেয়ে বেশি সহজ হতে পারি। ‘অর্থ দিয়ে মাড়োয়ারিকে, জমিদার মহাজনকে বা ভিখিরিকে হয়তো খুশি করা যায়, কবিকে খুশি করা যায় না।’ এই কথার মূল দর্শন হলো: সবকিছুর মূল্য টাকা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিল্পী অর্থের চেয়ে ভালোবাসা, সম্মান ও অনুভূতিকে বেশি মূল্য দেন। ‘কবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলি, কবি চায় প্রীতি, কবি চায় পূজা।’ এখানে ‘অঞ্জলি’ বলতে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বোঝানো হয়েছে। সত্যিকারের সম্মান কোনো বস্তু নয়। এটি হৃদয় থেকে আসে। ‘কবিত্ব আর দেবত্ব এইখানে এক।’ সৃষ্টিশীলতার মধ্যে এক ধরনের পবিত্রতা আছে। কবি সুন্দরকে সৃষ্টি করেন এবং সেই সুন্দর মানুষের মনে আনন্দ ও অনুভূতি জাগায়।
এখানে কবি অনেক দার্শনিক সত্য তুলে এনেছেন। যা ব্যাখ্যা করতে গেলে একেকটি অভিসন্দর্ভ হয়ে যাবে। তাই আলোচনা সংক্ষিপ্ততমই রাখলাম। ‘রূপার দাম আছে বলেই রূপা অত হীন। হাটে-বাজারে মুদির কাছে, বেনের কাছে ওজন হতে হতে এর প্রাণান্ত ঘটল; রূপের দাম নেই বলেই রূপ এত দুর্মূল্য, রূপ এত সুন্দর, এত পূজার। রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে। রূপের হাটের বেচা-কেনা অদ্ভুত। যে যত বিনা দামে কিনে নিতে পারে, সে তত বড় রূপ-রসিক সেখানে।’
এই তুলনাটি খুব গভীর। যে জিনিস বাজারে কেনাবেচা করা যায়, তার মূল্য অর্থে নির্ধারিত হয়। কিন্তু সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও শিল্পের কোনো নির্দিষ্ট দাম নেই। তাই এগুলো আরও মূল্যবান। নিঃসন্দেহে মহামূল্যবান। ‘রূপা কিনতে হয় রূপেয়া দিয়ে, রূপ কিনতে হয় হৃদয় দিয়ে।’
বস্তু পাওয়ার জন্য টাকা লাগে। কিন্তু সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে লাগে সংবেদনশীল মন। হৃদয় ছাড়া সত্যিকারের সৌন্দর্যকে অনুভব করা যায় না। ‘কোকিল পাপিয়াকে বাড়িতে ডেকে ঘটা করে খাওয়াতে পারনি বলে তারা তো অনুযোগ করেনি কোনোদিন। সে-কথা ভাবেওনি কোনোদিন তারা। তারা তাই বলে তোমার বাতায়নের পাশে গান গাওয়া বন্ধ করেনি। তাছাড়া কবিকে হয়তো সম্মান করা যায় না-কাব্যকে সম্মান করা যায়। তুমি হয়তো বলবে, গাছের যত্ন না নিলে ফুল দেয় না। কিন্তু সে যত্নেরও তো ত্রুটি হচ্ছে না।
-অনাত্মীয়কে লোকে সংবর্ধনা করে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে; বন্ধুকে গ্রহণ করে হাসি দিয়ে, হৃদয় দিয়ে।’ প্রকৃত ভালোবাসা বিনিময়ের হিসাব করে না। কোকিল যেমন কোনো প্রতিদান না চেয়ে গান গায়, তেমনি ভালোবাসাও স্বতঃস্ফূর্ত হওয়া উচিত। আনুষ্ঠানিক সম্মানের চেয়ে আন্তরিকতা বড়। অপরিচিতকে জাঁকজমক করে সম্মান করা যায়, কিন্তু বন্ধুকে গ্রহণ করতে লাগে ভালোবাসা।
কবি নজরুল উপদেশ দিতে কখনো স্বচ্ছন্দবোধ করতেন না। সেই বিষয়টি বলেই তিনি বলেছেন, ‘দিয়েছি তোমার অনাগত বিপুল সম্ভাবনাকে অঞ্জলি। এখানে লেখক কাউকে উপদেশ দিতে চাননি। তিনি তার ভেতরের সম্ভাবনাকে চিনতে সাহায্য করতে চেয়েছেন। মানুষের মধ্যে যে সুন্দর ও সৃষ্টিশীল শক্তি লুকিয়ে থাকে, সেটিকে প্রকাশ করাই তার উদ্দেশ্য। ‘তোমার মাঝের অপ্রকাশ সুন্দরকে প্রকাশ-আলোতে আসার আহ্বান জানিয়েছি।’ এটাই অংশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শন। একজন মানুষকে বদলে দেওয়ার চেয়ে তার নিজের ভেতরের ভালো দিকটিকে জাগিয়ে তোলা বেশি মূল্যবান। ‘আমি ফুল-ঝরা দিয়ে হাসাই, শাখার মার দিয়ে কাঁদাইনে।’
লেখকের শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতি কোমল। তিনি কঠোর শাসন নয়, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের মাধ্যমে মানুষকে জাগাতে চান। সব মিলিয়ে, এই অংশটির মূল কথা হলো: ভালোবাসার মূল্য অর্থে নয়, হৃদয়ে; সৌন্দর্যের মূল্য বাজারে নয়, অনুভবে; আর মানুষকে গড়ে তোলার শ্রেষ্ঠ পথ উপদেশ নয়, তার ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা। অনিশ্চিত জীবন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, দাম্পত্যের হাসি-ঠাট্টা, সম্পর্কের আন্তরিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা; এই বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে। হাস্যরসের আড়ালেও লেখকের একটি গভীর মানবিক মন দেখা যায়।
লেখক: শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার ও নজরুল গবেষক।




