সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

পাহাড়ের শোক, উন্নয়নের এপিটাফ

মোনছেফা তৃপ্তি
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

পাহাড়ের শোক, উন্নয়নের এপিটাফ
মোনছেফা তৃপ্তি। ছবি: সংগৃহীত

‘শুধু বিঘে-দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবই গেছে ঋণে। বাবু বলিলেন, ‘বুঝেছ উপেন? এ জমি লইব কিনে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপেনের সেই দুই বিঘা জমিই নয়, আমাদের পাহাড়ের শত শত বিঘা জমি একের পর এক 'বাবু'র হাতে চলে যাচ্ছে। পার্থক্য শুধু এতটুকুই-আজকের বাবুরা আরও প্রভাবশালী, আরও ক্ষমতাবান, আরও সংগঠিত।

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড় ধস, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় বহু প্রাণ ঝরে গেছে। লাখো মানুষ পানিবন্দী, হাজারো পরিবার ঘরহারা। সংবাদ মাধ্যম নিজেদের নিয়মে পরিসংখ্যানগত কিছু তথ্য দিয়েছে কিন্তু সত্যিকার সংখ্যাটা নিশ্চয়ই আরও বেশি। সংবাদমাধ্যম কয়েকদিন এই খবর প্রাসঙ্গিক রাখবে। এরপর নতুন কোনো ঘটনা আসবে, আর পাহাড়ের খবর হারিয়ে যাবে। কিন্তু পাহাড়ের কান্না থামবে না।

আমরা প্রায়ই বলি যে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। আসলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় না; প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। সেই ভারসাম্য নষ্ট করেছি আমরা। পাহাড় কেটেছি, বন উজাড় করেছি, প্রাকৃতিক জলধারা বন্ধ করেছি, পাহাড় দখল করেছি, উন্নয়নের নামে কংক্রিট চাপিয়েছি। পাহাড় বহুদিন ধরে আমাদের সতর্ক করেছে। কিন্তু আমরা তার ভাষা শুনিনি; শুনলেও অবজ্ঞা করেছি, আমলে নিইনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত যে হবে, কমবেশি আমরা সবাই জানতাম। এই বৃষ্টি হয়তো আমরা থামাতে পারব না, কিন্তু পাহাড় কাটা, বন ধ্বংস, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত নির্মাণ তো আমাদেরই সিদ্ধান্ত। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অন্যদিকে বিপর্যয় তৈরি করছে আমাদের উন্নয়ন-দর্শন।

পাহাড় শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বন, মাটি ও শিলাস্তরের সমন্বয়ে পাহাড় পানি ধারণ করে, ভূমির ভারসাম্য রক্ষা করে এবং ঢালকে স্থিতিশীল রাখে। বাংলাদেশ এমন একটি ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে অবস্থিত, যা ভারতীয় প্লেট, ইউরেশীয় প্লেট ও বার্মা মাইক্রোপ্লেটের পারস্পরিক প্রভাবের কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। গত এক বছরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। পাহাড় কেটে ফেললে সরাসরি ভূমিকম্প হয়- তা বলছি না। তবে পাহাড় কাটা ঢালের স্থিতিশীলতা কমিয়ে দেয়, ফলে ভূমিকম্প বা অতিবৃষ্টির সময় ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন

শুধু জ্বালানি নয়—বড় হুমকি হতে পারে পানি সংকটও

শুধু যে পাহাড়ি ঢলে পাহাড় কাঁদছে, তা নয়। পাহাড় প্রতিদিন কাঁদে। বিশুদ্ধ পানির সংকটে, স্বাস্থ্যসেবার অভাবে, শিক্ষার সীমিত সুযোগে, নিরাপদ যোগাযোগের অভাবে, জীবিকার অনিশ্চয়তায়, ভূমির অধিকারের লড়াইসহ নিত্য নানান সংকটে পাহাড়ের দিন কাটে। বর্ষার কয়েক দিনের দুর্যোগ কেবল সেই দীর্ঘদিনের বঞ্চনাকে দৃশ্যমান করে। পাহাড়ের মানুষের নিত্যদিনের কষ্ট আমাদের জাতীয় আলোচনায় খুব কম আসে। আমাদের মন বিষণ্ণ হলেই পাহাড়ে ছুটে যাই কিন্তু পাহাড়ের বিষণ্ণ চেহারা আমাদের চোখে পড়ে না।

আরেকটি প্রশ্ন আমাদের করতেই হবে, পাহাড় কে দখল করে? পাহাড়কে এরকম মৃত্যুর উপত্যকা কারা বানাচ্ছে?

জীবিকার তাগিদে পাহাড়ের ঢালে একটি ছোট ঘর তুলে থাকা দরিদ্র মানুষকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু পাহাড়ের সবচেয়ে বড় ক্ষতি কি তারাই করেছে? বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কেটে আবাসন, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পেছনে যেসব প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্বার্থগোষ্ঠী এবং ক্ষমতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা দখলদার চক্রের নাম বারবার এসেছে, তাদের সংখ্যা হয়তো বেশি নয়; কিন্তু তাদের ক্ষমতা এতটাই প্রবল যে আইন অনেক সময় তাদের সামনে এসে থেমে যায়। মুনাফা যায় অল্প কয়েকজনের হাতে, আর প্রাণ হারায় সাধারণ মানুষ।

আমরা ইদানীং একটি শব্দ খুব ব্যবহার করি-Inclusive বা অন্তর্ভুক্তিমূলক। বলা হয়, উন্নয়ন এমন হতে হবে যেখানে কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। কিন্তু পাহাড় ব্যবস্থাপনায় সেই অন্তর্ভুক্তি কোথায়?

পাহাড় নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়, অথচ পাহাড়ের মানুষের মতামত, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান, পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি, বন, জীববৈচিত্র্য কিংবা প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ-সবকিছুকেই বারবার উপেক্ষা করা হয়। উন্নয়নকে আমরা শুধু মানুষের জন্য ভাবি, প্রকৃতির জন্য নয়। অথচ পাহাড়ও এই রাষ্ট্রের একটি জীবন্ত সত্তা; তারও ধারণক্ষমতা আছে, তারও সীমা আছে। সেই সীমাকে অস্বীকার করে কোনো উন্নয়নই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না।

flood
পার্বত্যাঞ্চলে সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যার দেখা দেয়। ছবি: ঢাকা মেইল 

এই দুর্যোগের আরেকটি নির্মম পরিণতি নিয়েও খুব কম কথা হয়। জীবন বাঁচাতে অনেক পাহাড়ি পরিবার হয়তো তাদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবে। কিন্তু সেই শূন্য হয়ে যাওয়া পাহাড় কি প্রকৃতির কাছে ফিরে যাবে? অভিজ্ঞতা বলে, না। দুর্যোগের সুযোগে প্রভাবশালী ভূমিদস্যু ও অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি কম দামে জমি কিনে নেয়, কখনো ভয়ভীতি দেখিয়ে, কখনো আবার সরাসরি দখল করে। যারা শিকড় হারায়, তারা আরও প্রান্তিক হয়; আর যাদের হাতে অর্থ ও ক্ষমতা আছে, তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একসময় দুর্যোগও বাজারে পরিণত হয়, আর মানুষের বিপর্যয় কারও কারও জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ হয়ে দাঁড়ায়।

এরপর শুরু হবে নতুন আলোচনা। নতুন প্রকল্প হবে, নতুন কমিটি হবে, নতুন বরাদ্দ আসবে, নতুন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। আমরা আবার বলব—'সমন্বিত উদ্যোগ', 'মাস্টারপ্ল্যান', 'টেকসই উন্নয়ন'। কিন্তু যদি পাহাড় কাটা বন্ধ না হয়, দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনের সমান প্রয়োগ না হয়, বন পুনরুদ্ধার না হয়, পাহাড়ের মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার করা না হয়, তাহলে এসব প্রকল্প কাগজে উন্নয়নের গল্প লিখবে, বাস্তবে নয়।

আরও পড়ুন

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের স্বপ্নভূমি বান্দরবানের রূপরহস্য

পাহাড়কে রক্ষা করা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্ন নয়; এটি ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। কারণ পাহাড় ধসে কখনো ক্ষমতাবানের অট্টালিকা চাপা পড়ে না; চাপা পড়ে প্রান্তিক মানুষের ঘর। পাহাড় কাটার লাভ যারা পায়, পাহাড় ধসের মূল্য তারা দেয় না।

প্রশ্ন হলো, আমরা কি এবার অন্তত পাহাড়ের ভাষা শুনব? নাকি শেষ পাহাড়টিও কংক্রিটের নিচে চাপা পড়া পর্যন্ত উন্নয়নের জয়গান গেয়ে যাব?

রবীন্দ্রনাথের উপেন একদিন তার জমি হারিয়েছিলেন। আমরা যেন এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছি, যখন হারিয়ে যাবে আমাদের পাহাড়, বন, নদী; আমরা কী তখন উন্নয়নের হিসাব নিয়ে সন্তুষ্ট থাকব!

উন্নয়ন মানে কেবল সেতু, সড়ক, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; উন্নয়ন মানে এমন একটি ভবিষ্যৎ, যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও অর্থনীতি-তিনটিই একসঙ্গে টিকে থাকবে। পাহাড়, নদী, বন আর জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংস করে যে উন্নয়ন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে জীবন ধার করে বর্তমানের সমৃদ্ধি কেনার নামমাত্র।

প্রকৃতির কাছে উন্নয়নের একটাই হিসাব-যা তার ধারণক্ষমতার বাইরে, তা একদিন ভেঙে পড়বেই। আমরা যতই টেকসই উন্নয়ন, এসডিজি, সবুজ প্রবৃদ্ধি কিংবা জলবায়ু সহনশীলতার ভাষণ দিই না কেন, যদি উন্নয়নের সংজ্ঞার মধ্যেই পরিবেশ ধ্বংসকে জায়গা দিয়ে দিই, তবে সেই উন্নয়ন একদিন নিজের ভারেই ধসে পড়বে।

হয়তো একদিন আমাদের নির্মিত উঁচু অট্টালিকা, প্রশস্ত মহাসড়ক আর ঝকঝকে নগরীই আমাদের ব্যর্থতার স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু সেই উন্নয়ন দেখার বা তার সুফল ভোগ করার মতো আমাদের কোনো প্রজন্মই তখন আর বেঁচে থাকবে না।

হয়তো তখন অন্য কোনো গ্রহের প্রাণীরা এই পৃথিবীর ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখবে। ইতিহাসের পাতা উল্টে তারা বিস্মিত হবে।এত জ্ঞান, এত প্রযুক্তি, এত উন্নয়ন, তবু মানুষ কেন নিজের বাসস্থানটাকেই ধ্বংস করল? তারা হয়তো কোনো ভেঙে পড়া নগরের পাশে, মরিচা ধরা একটি বিলবোর্ডে লেখা দেখতে পাবে- ‘যেদিন শেষ গাছটি কেটে ফেলা হবে, শেষ নদীটি দূষিত হবে, শেষ মাছটি ধরা হবে-সেদিন মানুষ বুঝবে, টাকা খাওয়া যায় না।’

সেদিন এই বাক্যটি হবে বিলুপ্ত এক সভ্যতার এপিটাফ। আশা করি, সেই উপলব্ধির জন্য আমাদের এত দেরি করতে হবে না।

লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকার কর্মী

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর