বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও, নীরবে আরও একটি সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে—পানি সংকট। বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানি আমাদের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে, কিন্তু পানি সংকট সরাসরি জীবন, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। তবু এই সংকট নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।
জ্বালানি সংকটের সাম্প্রতিক কারণ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশবিজ্ঞানী ও পরিবেশবাদীরা সতর্ক করে আসছেন যে জীবাশ্ম জ্বালানির (ফসিল ফুয়েল) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি টেকসই সমাধান নয়। কয়লা, তেল ও গ্যাসনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তাও বারবার সংকটে পড়ছে (IPCC, 2023; IEA, 2024)। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের দাবি এখন আর শুধু পরিবেশগত নয়, বরং অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ঠিক একইভাবে আমরা পানি সংকটের দিকেও এগোচ্ছি। বিষয়টি হঠাৎ করে সামনে আসেনি, বরং দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে আসছেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্বপরিসরে ইতোমধ্যেই পানি সংকট একটি বড় বাস্তবতা। বর্তমানে প্রায় ২.২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে রয়েছে এবং প্রায় ৪ বিলিয়ন মানুষ বছরে অন্তত এক সময় তীব্র পানি সংকটের মুখোমুখি হয় (Water.org, 2024; UNICEF, 2024)। একই সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, খুব শিগগিরই বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ পানি সংকটপূর্ণ এলাকায় বসবাস করবে এবং পানি ঘাটতির কারণে ব্যাপক জনসংখ্যা স্থানান্তরের ঝুঁকিও বাড়ছে (UNICEF, 2024)। ওয়াটারএইড বলছে, বিশ্বে ৭০৩ মিলিয়ন মানুষ—অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে প্রায় ১ জন—নিজেদের বাড়ির কাছাকাছি নিরাপদ পানির সুবিধা পায় না। WHO (২০২৩)-এর মতে, প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ (৪০০,০০০) পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু অনিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি-জনিত রোগে মারা যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন ১০০০-এর বেশি শিশু, কিংবা প্রায় প্রতি দেড় মিনিটে একটি শিশু মৃত্যুবরণ করে।
পানির এই সংকট শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই নয়, খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বৈশ্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, পানির চাহিদা সরবরাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে, যা কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানিচক্রে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে—খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যা—তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংকট আরও স্পষ্ট। নদীমাতৃক দেশ হওয়া সত্ত্বেও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে এখনো কয়েক মিলিয়ন মানুষ ঘরের কাছে নিরাপদ পানির সুবিধা পায় না এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ দূষিত পানি ব্যবহারে বাধ্য (WaterAid Bangladesh, 2024)। শহরাঞ্চলেও নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, বিশেষ করে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সমস্যা প্রকট। ওয়াটারএইডের ২০২০–২০২২ সালের কিছু পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে এখনও ৩.৩ মিলিয়ন মানুষ তাদের বাড়ির কাছাকাছি নিরাপদ পানির সুবিধা পায় না। বাংলাদেশে ৭০ মিলিয়ন মানুষ—অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুইজন—দূষিত পানি ব্যবহার করে। শহরাঞ্চলে প্রতি দুইজনের একজন দূষিত পানি ব্যবহার করে। বাংলাদেশে ২৯.৮ মিলিয়ন মানুষ—অর্থাৎ প্রতি পাঁচজনের একজন—নিজেদের বাসস্থানের ভেতরে বা আশপাশে পানির সহজ প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত।
রাজধানী ঢাকায় পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নদী ও খালগুলোর দূষণ পানির গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানির সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, যেখানে লক্ষাধিক মানুষ নিরাপদ পানির অভাবে ভুগছে (IWA Publishing, 2025)। কিছুদিন আগে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীতে পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। ১৯৯০-এর দশকে যেখানে পানির স্তর প্রায় ২০–২৫ মিটারের মধ্যে ছিল, তা ২০২৩ সালের মধ্যে অনেক এলাকায় ৭০–৭৫ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক—ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এখন গড়ে প্রায় ৬০ থেকে ৮০ মিটার গভীরে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর প্রায় ২ মিটার পর্যন্ত নিচে নামছে (The Daily Star, 2023; BWDB data; TBS, 2024)। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও গভীরে নেমে যাবে পানির স্তর, যা নগরবাসীর জন্য বড় ধরনের পানি সংকটের ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় খরার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা স্থানীয় পানি সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে যায়। কৃষি সেচের জন্য অতিরিক্ত পানির ব্যবহার এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেক এলাকায় খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষ নিরাপদ পানির জন্য গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় (BMDA, 2024; BARC, 2025)।
অন্যদিকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভিন্নধর্মী এক পানি সংকট দেখা যাচ্ছে—লবণাক্ততার বিস্তার। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে লবণাক্ত পানি অভ্যন্তরীণ এলাকায় প্রবেশ করছে। ফলে মিঠাপানির উৎসগুলো ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। অনেক স্থানে পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়ায় মানুষকে দূরবর্তী স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে শুধু দৈনন্দিন জীবনই নয়, কৃষি উৎপাদন ও জনস্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে (World Bank, 2024; IWMI, 2025)।
পানি সংকটের পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প দূষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার। শিল্পাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব নদী ও জলাশয়কে দূষিত করছে, যা পানির উৎসকে অযোগ্য করে তুলছে। অন্যদিকে, নগরায়ণের ফলে জলাধার ও খাল ভরাট হওয়ায় প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব বহুমাত্রিক। পানি সংকট খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, পানিবাহিত রোগ বাড়াতে পারে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। এমনকি পানি সংকট সামাজিক অস্থিরতা ও অভিবাসন বৃদ্ধির কারণও হয়ে উঠতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে পানি ব্যবস্থাপনায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনরুদ্ধার, শিল্প বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নীতিগত অগ্রাধিকার ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
মন্দের ভালো দিক হলো, দেশে পানি ও নদী রক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি ভিত্তি ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। পানি ও নদী সংরক্ষণে উচ্চ আদালত একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম একটি ঐতিহাসিক রায়ে দেশের সব নদীকে ‘আইনগত সত্তা’ বা লিগ্যাল পারসন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়—অর্থাৎ নদীরও অধিকার রয়েছে এবং তা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের (High Court Verdict, 2019)। একই সঙ্গে নদী দখল ও দূষণ রোধে ১৭ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং ন্যাশনাল রিভার কনজারভেশন কমিশনকে নদীর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়; এমনকি নদী দখল বা দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক ঋণ ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে এই রায়ের পূর্ণ সুফল এখনো দৃশ্যমান নয়। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী রায়ে হাইকোর্ট নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানিকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করে নির্দেশ দিয়েছেন—এক বছরের মধ্যে সব গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্থানে এবং ১০ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে হবে। রায়ে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নিরাপদ পানিকে জীবনাধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পানির উৎস সংরক্ষণ, দূষণ প্রতিরোধ এবং আদালত, উপাসনালয়, হাসপাতাল, স্টেশন, টার্মিনাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ উপকূলীয় ও দুর্গম এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে নিরাপদ পানি না পেলে নাগরিকরা এখন আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন, যা পানি অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
সবশেষে বলতে চাই, জ্বালানি সংকট আমাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে, কিন্তু পানি সংকট আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাই এখনই প্রয়োজন—জ্বালানির পাশাপাশি পানিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং টেকসই ভবিষ্যতের জন্য পানি ব্যবস্থাপনায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা। নয়তো সেই দিন খুব দূরে নয়, যখন গুলশান-বনানীর বাসিন্দারা যেমন জ্বালানির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছেন, ঠিক তেমনি একদিন সুপেয় পানির জন্যও পানি স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
লেখক: পরিবেশ ও নারী অধিকার কর্মী




