রোববার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

হজ: শক্তি ও সামর্থ্যের শর্তের গভীর তাৎপর্য

বিল্লাল বিন কাশেম
প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৬ এএম

শেয়ার করুন:

billal
বিল্লাল বিন কাশেম। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো হজ। এটি এমন একটি ইবাদত, যা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ- তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তসাপেক্ষে, আর তা হলো ‘সামর্থ্য’। এই সামর্থ্য বা সক্ষমতা কেবল অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পরিধি বিস্তৃত- শারীরিক শক্তি, মানসিক প্রস্তুতি এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধের এক সমন্বিত বাস্তবতা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে, হজ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে “সামর্থ্য” শব্দটির গভীর তাৎপর্য নতুন করে ভাবনার দাবি রাখে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয় করে, অনেক কষ্ট সহ্য করে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হজ পালনের সিদ্ধান্ত নেন। এটি একদিকে প্রশংসনীয়—কারণ হজের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। তবে বাস্তবতা হলো, হজ এমন একটি ইবাদত যা শারীরিকভাবে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। পবিত্র মক্কা ও মদিনার তীব্র গরম, লাখো মানুষের ভিড়, দীর্ঘ সময় ধরে ইবাদতের চাপ- সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের কঠিন শারীরিক পরীক্ষাও বটে। ফলে জীবনের শেষ বয়সে এসে এই কঠিন ইবাদত সম্পন্ন করা অনেকের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।


বিজ্ঞাপন


ইসলাম কখনোই মানুষের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয় না। বরং ‘সামর্থ্য’ শর্তটি স্পষ্ট করে দেয় যে, যখন একজন ব্যক্তি অর্থ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার দিক থেকে প্রস্তুত হবেন, তখনই তার জন্য হজ ফরজ হবে। এখানে অর্থনৈতিক সামর্থ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শারীরিক সুস্থতাও সমানভাবে অপরিহার্য। একজন অসুস্থ বা দুর্বল মানুষ যদি হজে গিয়ে নিজের কষ্ট বাড়িয়ে ফেলেন, তাহলে ইবাদতের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়।

শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সক্ষমতাও হজের একটি বড় শর্ত। হজে গেলে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয় প্রতিটি মুহূর্তে। কখনো দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, কখনো যানজট, কখনো আবাসন বা খাবার নিয়ে অসুবিধা- এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য হারালে হজের মূল শিক্ষা নষ্ট হয়ে যায়। হজ আমাদের শেখায় সহনশীলতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা। তাই মানসিকভাবে প্রস্তুত না হয়ে হজে গেলে অনেকেই ছোট ছোট বিষয়েও বিরক্ত হয়ে পড়েন, যা ইবাদতের সৌন্দর্যকে ক্ষুণ্ন করে।

পারিবারিক সক্ষমতাও এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসলাম পরিবারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। নিজের স্ত্রী-সন্তান, পিতা-মাতা বা নির্ভরশীলদের অধিকার নিশ্চিত না করে হজে যাওয়া কখনোই আদর্শ নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবার আর্থিক কষ্টে আছে, অথচ হজে যাওয়ার জন্য সব সঞ্চয় ব্যয় করা হচ্ছে। এটি ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে, দায়িত্ব পালন করে, অতিরিক্ত সামর্থ্য থাকলেই হজে যাওয়া উচিত।

বর্তমানে হজের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। বিমান ভাড়া, আবাসন, সৌদি আরবের বিভিন্ন সেবা চার্জ- সব মিলিয়ে একজন সাধারণ মানুষের জন্য হজ এখন একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় ‘সামর্থ্য’ শর্তটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। হজ এমন কোনো প্রতিযোগিতা নয় যে, যেকোনো মূল্যে তা সম্পন্ন করতেই হবে। বরং এটি এমন একটি ইবাদত, যা আল্লাহ নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন- শুধুমাত্র তাদের জন্য, যারা সত্যিকার অর্থে প্রস্তুত।


বিজ্ঞাপন


অন্যদিকে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- তরুণ বয়সে হজ পালন। বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে দেখা যায়, মানুষ অপেক্ষাকৃত কম বয়সেই হজ পালন করেন। কারণ তখন তাদের শারীরিক শক্তি বেশি থাকে, ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা বেশি থাকে এবং তারা সহজেই হজের কষ্টগুলো সহ্য করতে পারেন। আমাদের দেশে এই প্রবণতা তুলনামূলক কম। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে হজ করাই উত্তম। কিন্তু বাস্তবে তরুণ বয়সেই যদি সামর্থ্য অর্জিত হয়, তবে হজ পালন করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও সহজসাধ্য।

হজ কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আত্মশুদ্ধির এক মহাসমাবেশ। এখানে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারব- সবাই একই পোশাকে, একই কাতারে দাঁড়ায়। এটি বিনয়, নম্রতা ও সমতার এক অনন্য শিক্ষা দেয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের কিছু হজযাত্রীর আচরণ এই শিক্ষার পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে গাইড বা সেবাকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অহংকারী মনোভাব, অস্থিরতা- এসব হজের মূল চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে।

আরও পড়ুন

হজযাত্রীদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও করণীয়

হজে যেতে ৭৬৫৮০ বাংলাদেশির নিবন্ধন

গাইডরা হজযাত্রীদের সহায়তার জন্যই নিয়োজিত থাকেন। তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। তাদেরকে নিজের ব্যক্তিগত কর্মচারী বা চাকরের মতো মনে করা শুধু অমানবিক নয়, বরং ইসলামের শিক্ষা বিরোধী। হজ আমাদের শেখায় কিভাবে একজন মানুষ হিসেবে অন্য মানুষের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতি দেখাতে হয়।

এক্ষেত্রে হজ-পূর্ব প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও হজ এজেন্সিগুলোর উচিত, হজযাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা- যেখানে শুধু নিয়ম-কানুন নয়, বরং আচরণগত দিক, ধৈর্য ধারণ, সহনশীলতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবেলার কৌশল শেখানো হবে। এতে করে হজযাত্রীরা আরও সচেতন ও প্রস্তুত হয়ে যেতে পারবেন।

রাষ্ট্রেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ, সেবার মান উন্নয়ন- এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে হজ এজেন্সিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে হজযাত্রীরা প্রতারণা বা হয়রানির শিকার না হন।

সবশেষে বলা যায়, হজ একটি ব্যয়বহুল, কষ্টসাধ্য এবং ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া ইবাদত। এটি শুধুমাত্র অর্থের বিষয় নয়- বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতির বিষয়। শারীরিক শক্তি, মানসিক দৃঢ়তা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা- সবকিছুর সমন্বয়েই একজন ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে হজের জন্য প্রস্তুত হন।

হজ আমাদের শেখায় বিনয়, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং আত্মত্যাগ। তাই এই ইবাদত পালনের আগে আমাদের উচিত নিজের সামর্থ্যকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা এবং প্রস্তুত হওয়া। কারণ হজ শুধু একটি সফর নয়- এটি আত্মার এক গভীর যাত্রা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই রয়েছে পরীক্ষা, আর প্রতিটি পরীক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আত্মশুদ্ধির সুযোগ।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর