বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

বেগম জিয়ার দেশপ্রেম ও ইসলামি মূল্যবোধ

মাওলানা ফয়সাল আহমদ জালালী
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:৫৭ পিএম

শেয়ার করুন:

khaleda
বেগম জিয়ার দেশপ্রেম ও ইসলামি মূল্যবোধ। ছবি: সংগৃহীত

মঈনুদ্দীন ও ফখরুদ্দীন সরকারের সময় টিভি চ্যানেলগুলো লাইভ দেখাচ্ছিল, খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে সৌদি আরব চলে যাচ্ছেন। বিমানবন্দরে বিশেষ বিমানও প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বলে তারা জানায়। লাইভ ব্রডকাস্টের জন্য টিভি চ্যানেলগুলো তার বাড়ির আশপাশে অবস্থান করছিল। তারেক ও কোকোকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল জরুরি অবস্থার সরকার। তবু ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তার সাথে দেশ না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সৌদি দূতাবাস জানায়, যিনি সৌদি যাবেন, ভিসার জন্য তাকে আবেদন করতে হবে। অথচ তিনি আবেদনই করেন নাই। এই ছিল তাঁর দেশপ্রেম। 

আরও পড়ুন

খালেদা জিয়া: দেশপ্রেম যাঁর শিরোভূষণ

ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। রমজানের প্রথম ইফতার করতেন তিনি এতিম ও উলামায়ে কেরামকে নিয়ে। শাহবাগে ১৯৭১ সালের যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে তোলা হয়। সেখানে ‘ফাঁসি ফাঁসি, ফাঁসি চাই’, বলে এক রঙমঞ্চের আসর বসেছিল। রাত দিনের ভেদাভেদ নেই। সর্বস্তরের মানুষকে সেখানে গিয়ে তাদের সাথে একাত্মতা প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়। রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। যুদ্ধাপরাধের শাস্তির দাবির আড়ালে সেখানকার একদল ব্লগার আল্লাহ, রাসুল ও আল-কুরআন নিয়ে কটাক্ষ করত। এর প্রতিবাদে গড়ে উঠে ইসলামি জনতার শাপলা চত্বর মঞ্চ। হেফাজতের পক্ষ থেকে আল্লাহ ও রাসুলের অবমাননার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ৫ মে ২০১৩ সালে  লংমার্চ করে ঢাকা অবরোধের ডাক দেওয়া হয়। ঢাকার প্রবেশমুখে ছয়টি স্থান অবরোধ করে সারাদেশ থেকে আসা লংমার্চকারীগণ। ফজরের পরই ঢাকার প্রবেশ দ্বারগুলো দখলে নেয় জনতা। জনস্রোত দেখে দিশেহারা হয়ে সরকার বেলা বাড়ার পর তাদের শাপলা চত্বরে জমায়েতের অনুমতি দেয়।

Zia_20260104_163653113

শাপলায় আসার পথেই আলেম ও ইসলামি শিক্ষার্থীদের ওপর পথে পথে ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়েনারা। আমিরে হেফাজতকে মঞ্চে আসতে দেওয়া হয়নি। তাঁকে বিমানে উঠিয়ে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের দাবিতে শাপলায় রাতে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন পরোক্ষভাবে ঢাকাবাসীকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানান খালেদা জিয়া। উলামায়ে কেরাম ও  নিরীহ মাদরাসার ছাত্রদের ওপর যখন রাতের অন্ধকারে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, এর তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা যখন পালিয়ে যান, একটি প্রতিশোধমূলক কথা তিনি বলেননি। একটি ব্যঙ্গাত্মক কথাও না। অথচ শেখ হাসিনা তাঁকে বাড়ি ছাড়া করেন। এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করেন। ভুয়া মামলায় জড়িয়ে জেলে পুরে রাখেন। তাঁর মেডিক্যাল বোর্ড দেশের বাহিরে তাঁকে চিকিৎসা গ্রহণের পরামর্শ দেয়। কিন্তু কোনোভাবেই শেখ হাসিনা তাঁকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেননি। উল্টো তাঁর অসুস্থতা নিয়ে শেখ হাসিনা খেদোক্তি করেন। তার অশ্রাভ্য ভাষার কটূক্তি ছিল এরূপ- ‘খালেদা জিয়া অসুস্থ, এই মরে মরে,  এই যায় যায়, তে বয়স তো আশির উপরে, মৃত্যুর তো সময় হয়ে গেছে, তার মধ্যে অসুস্থ, তার লিভার নাকি পচে শেষ,  কী খেলে তাড়াতাড়ি লিভার পচে ইত্যাদি…।’


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

ষড়যন্ত্রের অন্ধকার পেরিয়ে দুই নক্ষত্রের অমর পুনর্মিলন

হাসিনার পালানোর পর তার সম্পর্কে কোনো কটু কথা বলেননি। বরং জনগণকে শান্ত  থাকার আহ্বান জানান। ফ্যাসিবাদের পতনের পর সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠানগুলোতে মধ্যমণি হিসেবে খালেদা জিয়াকে দেখা যেত। আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তাঁকে নিজেদের ভরসারস্থল মনে করত। সর্বশেষ যখন তিনি ২১ নভেম্বর ২৫  বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন, তখন তিনি রোগ শোকে কাতর। হুইল চেয়ারে করে কোনো মতে তাঁকে অনুষ্ঠানে আনা হয়। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বাংলাদেশে একটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার সময় সেনাবাহিনী প্রধান যখন তাঁর হুইল চেয়ার ধরে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসেন, তাঁকে দেখেই খালেদা জিয়া জিজ্ঞেস করেন, ভূমিকম্পের পর দেশের জনগণ কেমন আছেন। যা লাইভ অনুষ্ঠান থেকে সরাসরি দেখা গেছে। এটিই ছিল তাঁর সর্বশেষ জনসমক্ষে আসা। এখান থেকে ফেরার পর তাঁর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে।

kh-zia-dhakamail_20261231_140845471

সর্বশেষ তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এয়ার অ্যাম্বুল্যান্সেরও ব্যবস্থা করা হয়। হয়ত অন্তিম সময় হয়ে গেছে ভেবে তিনি নিজেই দেশের বাইরে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর এতই ভালোবাসা, এখানেই তিনি মরতে চেয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

স্বাধীনতার মূর্তপ্রতীক ম্যাডাম জিয়ার জানাজা ও কিছু কথা

খালেদা জিয়ার ইহকাল থেকে বিদায়ের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশের আকাশে সূর্যের দেখা মেলেনি। ৫৮ দিন হাসপাতালের বেডে ছিলেন। ২০২৫ সালের বিদায় নেওয়ার আর মাত্র এক দিন বাকি, ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৭৯ বছর, মাঝখানে ছিল ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবন। তাঁর অভূতপূর্ব জানাজায় গণমানুষের ঢল নামে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় তিনজন আলেম তাঁর খাটিয়া বহন করেছেন। শায়খ আহমাদুল্লাহ, শায়খ মামুনুল হক ও শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী। বাংলাদেশের ইলমি জগতে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তাঁরা তিন দিকপাল। জানাজায় ইমামতি করেন বাংলাদেশের ফকীহ আলেম, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররামের খতিব মুফতি আবদুল মালিক। এভাবেই আপসহীন অভিযাত্রার সমাপ্তি।

লেখক: নিউইয়র্ক প্রবাসী প্রবীণ মুহাদ্দিস, লেখক ও গবেষক

 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর