কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেওয়া হতো। এরপর সেখানে পাঠানোর খরচ বাবদ ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হতো চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। পরে সেখানে নিয়ে তাদের সাইবার ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হতো। চক্রটির পাল্লায় পড়ে মোটা অঙ্কের টাকা খাওয়ানোর পাশাপাশি সর্বস্বান্ত হয়েছে প্রায় ৫০০ যুবক ও যুবতী। যাদের এখনও সেই দেশে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
গত কয়েক বছর ধরে এভাবে উচ্চ বেতনের লোভ দেখিয়ে অনেককে সর্বশান্ত করেছে তারা। অবশেষে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযান চালিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের মূলহোতাসহ তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাতে অভিযান চালিয়ে রাজধানীর পল্টন এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে র্যাব-৩। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন মূল হোতা নাজমুল ইসলাম (৩০), তার সহযোগী নুর ইসলাম সাজ্জাদ (২৫) ও সিরাজুল ইসলাম পঞ্চায়েত (৫৭)। এসময় তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট তিনটি, মোবাইল ফোন চারটি, রেজিস্টার একটি, মানবপাচার সংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজপত্র ২৫০ পাতা এবং নগদ পাঁচ হাজার-টাকা উদ্ধার করা হয়।
আরও পড়ুন: বৈধভাবে বিদেশ গিয়েও ‘বিক্রি’, দায় নিতে গড়িমসি বিএমইটির!
মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) র্যাব-৩ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের এ ব্যাপারে ব্রিফ করেন।
র্যাব অধিনায়ক জানান, চক্রের মূলহোতা কম্বোডিয়া প্রবাসী নাজমুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে উচ্চ বেতনে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরি দেওয়ার নাম করে ভুক্তভোগী এবং তাদের অভিভাবকদের প্রলুব্ধ করতেন। তিনি দালালদের মাধ্যমে শিক্ষিত, কম্পিউটার বিষয়ে পারদর্শী বেকার যুবক যুবতীদের প্রলুব্ধ করতেন। কম্বোডিয়ায় পাঠানোর খরচ বাবদ প্রাথমিকভাবে তারা চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে থাকে। আগ্রহী বেকার যুবক-যুবতীদের প্রথমে কম্পিউটার বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে কম্বোডিয়া প্রবাসী আলীম ও শরিফুলের সহায়তায় তাদের জন্য কম্বোডিয়ান ট্যুরিস্ট ই ভিসা করা হয়। তারপর তাদের বিমানযোগে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়।
আরিফ মহিউদ্দিন জানান, কম্বোডিয়ায় যাওয়ার পর গ্রেফতারকৃত নাজমুল তার সহযোগী কম্বোডিয়া প্রবাসী রাকিব ও রফিকের সহায়তায় প্রথমে ভুক্তভোগীদের কম্বোডিয়া প্রবাসী আরিফের হোটেলে নিয়ে যান এবং তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ওই হোটেলে কিছুদিন অবস্থান করার পর তাদের কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য কম্বোডিয়া প্রবাসী কামাল ওরফে লায়ন কামাল ও আতিকের সহায়তায় একটি বিদেশি ট্রেনিং সংস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে বিদেশি প্রশিক্ষকরা ভুক্তভোগীদের গুগল ট্রান্সলেটরের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছদ্মনামে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে অন্যদের কীভাবে প্রতারণা করা যায়, ভুয়া ক্লোন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা আত্মসাৎ করার কৌশল, ভুয়া নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে বা চ্যাটিং করে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার নাম করে কৌশলে ডিপোজিট হাতিয়ে নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভয়েস কল ও ভিডিও কল রেকর্ডিং করে ব্ল্যাকমেইলে অর্থ আত্মসাতের কৌশল শেখানো হয়।
আরও পড়ুন: লিবিয়ায় বন্দী মাদারীপুরের ১৬ যুবক, পণেও মিলছে না মুক্তি
মানবপাচারকারীদের ভাষায় সাইবার প্রতারণার বিষয়টি স্ক্যামার হিসেবে পরিচিত। ট্রেনিং শেষে ভিকটিমদের একটি বিদেশি কোম্পানির কাছে দুই হাজার থেকে তিন হাজার ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তারপর ভুক্তভোগীদের একটি সুরক্ষিত ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই ভবনে যাওয়ার পর তাদের দেহ তল্লাশি করে সবধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস তাদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়। তারপর তাদের একটি কম্পিউটার ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে একটি বৃহৎ কক্ষে ৩০০ থেকে ৪০০ ডেক্সটপ কম্পিউটার সাজানো থাকে। মানবপাচারকারীদের ভাষায় সেই ল্যাবকে ক্যাসিনো বা প্ল্যাটফর্ম বলা হয়।
যেভাবে সাইবার ক্রীতদাস বানানো হতো
কম্পিউটার ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরুষদের সাথে ছদ্মনামীয় নারী অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এবং নারীদের সাথে ছদ্মনামীয় পুরুষ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য বাধ্য করা হয়। ভাষাগত বাধা দূর করার জন্য গুগল ট্রান্সলেটের সাহায্য নেওয়া হয়। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পর ভিডিও কল দিয়ে আপত্তিকর অঙ্গভঙ্গি ও কথাবার্তা রেকর্ড করা হয়। তারপর সেই রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হতো। আবার কখনও উপহার পাঠানো, দেখা করার জন্য যাতায়াত খরচ ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হতো। এসব কাজে, টিকটক, বিটকয়েন, ফেইক ওয়েবসাইটের সহায়তা নেওয়া হয়।
র্যাব জানায়, ভুক্তভোগীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হতাশাগ্রস্ত অপেক্ষাকৃত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের টার্গেট করতে বলা হয়। আবার কখনও বিভিন্ন দেশ থেকে স্থানীয় লোকদের সহায়তায় যেসব ব্যক্তি ব্যাংক বা এনজিও হতে ঋণ গ্রহণ করেছেন বা ঋণ গ্রহণ করতে ইচ্ছুক তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট নম্বর বা মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। তারপর তাদের চ্যাটিংয়ের মাধ্যমে কম সুদে আকর্ষণীয় ঋণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই প্রস্তাবে রাজি হলে ডিপোজিট বাবদ ৫ শতাংশ অর্থ মোবাইল ব্যাংকিং বা ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পরিশোধ করতে বলা হয়। অর্থ আত্মসাৎ করার পর সেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই বিদেশি চক্র এভাবে ছয় থেকে সাত মাস একটি ক্যাসিনো বা প্ল্যাটফর্ম চালিয়ে যাওয়ার পর ঠিকানা, ফেইক অ্যাকাউন্ট, ডোমেইন ও ডিভাইস পরিবর্তন করে থাকে। এভাবে একটি প্ল্যাটফর্মে একজন ভুক্তভোগীকে বিরতিহীনভাবে ১৪ হতে ১৬ ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করতে হয়।
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, কেউ টার্গেট সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে বা কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। তার খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হতো। এই ক্যাসিনো বা প্ল্যাটফর্মগুলো কঠোর নিরাপত্তার চাদরে আবৃত্ত থাকে বিধায় সেই স্থান থেকে কারও পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। কেউ এই কাজ থেকে অব্যাহতি চাইলে তার কাছ থেকে তাকে কিনতে যে ডলার ব্যয় করা হয়েছে তার দ্বিগুণ অর্থ ফেরত দিতে বলা হতো এবং তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো অভিযোগ করবেন না মর্মে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হতো।
তখন সেই ব্যক্তি বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সেই কোম্পানিতে অর্থ ফেরত দিয়ে কম্বোডিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি দালালদের আশ্রয়ে যায়। তখন সেই দালালরা ভুক্তভোগীদের পুনরায় আরেকটি সাইবার প্রতারক কোম্পানিতে বিক্রি করে দেয়। যদি কেউ দেশে ফিরে আসতে চায়, তখন দেশে ফেরত যাওয়ার শর্ত হিসেবে আরও গ্রাহক সংগ্রহ করে দেওয়ার শর্ত জুরে দেয়। এই সময়ে ভিকটিমের কম্বোডিয়ায় থাকা খাওয়ার খরচ নিজেকে বহন করতে হয়।
ভুক্তভোগীর কোনো রোজগার না থাকায় তারা ইচ্ছার বিরুদ্ধে অবৈধ কাজ করতে বাধ্য হতো। নতুবা দেশ থেকে টাকা নিয়ে থাকা খাওয়ার ব্যয় নির্বাহ করতে হতো। তখন সেই ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে নিজে মুক্তি পাওয়ার জন্য তার পরিচিত অপর বাংলাদেশিদের কম্বোডিয়ায় আসতে প্ররোচিত করে। তারপর কম্বোডিয়া প্রবাসী আলীম ও শরিফুল তাদের ই-ভিসার ব্যবস্থা করে কম্বোডিয়ায় নিয়ে এসে ভুক্তভোগীদের একইভাবে সাইবার ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়।
এভাবে ওই চক্র সারা দেশ থেকে পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশিকে সাইবার ক্রীতদাস হিসেবে কম্বোডিয়ায় পাঠিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন বলে জানায় র্যাব।
এমআইকে/জেবি




