বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

শাবিপ্রবি থেকে অ্যামাজন হয়ে সুইসপোর্ট, জাপানে এক সফল বাংলাদেশির গল্প

বোরহান উদ্দিন, (টোকিও, জাপান থেকে ফিরে)
প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

শাবিপ্রবি থেকে অ্যামাজন হয়ে সুইসপোর্ট, জাপানে এক সফল বাংলাদেশির গল্প
  • শাবিপ্রবি থেকে কাজ করছেন বিশ্বখ্যাত এভিয়েশন জায়ান্টের শীর্ষ পদে 
  • জাপানের করপোরেট অঙ্গনে ফারুক মুক্তাদিরের বিরল রেকর্ড
  • ভালো চাকরির জন্য দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ বৃদ্ধির তাগিদ
  • ভাষাদক্ষতার সঙ্গে জাপানের আইন মেনে চলার পরামর্শ

উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়া কিংবা নেদারল্যান্ডসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এক তরুণ। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ক্যারিয়ারের শুরুতে আসা একটি চাকরির সুযোগ বদলে দেয় তার সব হিসাব-নিকাশ। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট 'শ্যাভরন' (Chevron)-এ কাজের মাধ্যমে শুরু হয় তার পেশাগত জীবন। শ্যাভরনসহ দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি আজ বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায়। বলছি বাংলাদেশি ফারুক মুক্তাদিরের কথা।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত (শ্যাভরন) ও তৈরি পোশাক খাত থেকে শুরু করে বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান 'কোটস' (Coats) এবং প্রযুক্তি জায়ান্ট 'অ্যামাজন' (Amazon)—কোথাও থেমে থাকেনি ফারুক মুক্তাদিরের পথচলা। বর্তমানে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক এভিয়েশন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং দানব 'সুইসপোর্ট'-এর (Swissport) জাপানি কার্যক্রম পরিচালনায় তিনি দেশের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার একজন। যা জাপানের আন্তর্জাতিক করপোরেট অঙ্গনে এক বিরল এবং গর্বের রেকর্ড।

বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানে একজন বাংলাদেশির এমন নেতৃত্বশীল আসনে আসীন হওয়া কেবল ফারুক মুক্তাদিরের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি বৈশ্বিক চাকরির বাজারে উদীয়মান তরুণদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা, জাপানের বিশ্বমানের প্রযুক্তি খাত এবং সেখানে বাংলাদেশের তরুণদের অপার সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে ‘ঢাকা মেইল’-এর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।

25

শাবিপ্রবি থেকে শ্যাভরন হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাত্রা

উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক ডিগ্রি অর্জনের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও পেশাগত জীবনের শুরুতে কীভাবে থিতু হলেন, তা শোনালেন ফারুক মুক্তাদির। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর চাকরির ইন্টারভিউয়ে সহপাঠী ও সিনিয়রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে শ্যাভরনে যুক্ত হন তিনি। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি তাকে দ্রুত সমৃদ্ধ করে তোলে।

প্রাথমিক অবস্থায় শ্যাভরনের ড্রিলিং সাইট, অপারেশনাল অ্যাসাইনমেন্ট এবং দেড় কোটি ডলারের গ্যাস প্ল্যান্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিশেষ করে 'অ্যাকর্ড' ও 'অ্যালায়েন্স'-এর আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স ও নিরাপত্তার কাজে যুক্ত থাকেন। এমনকি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠাতেও তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল।

পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান 'কোটস'-এ যোগ দিয়ে তার পেশাগত জীবন নতুন গতি পায়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার রিজিওনাল হেড থেকে এশিয়ার প্রায় সব দেশের দায়িত্ব পান তিনি। এক পর্যায়ে বাংলাদেশে বসেই উত্তর ও মধ্য আমেরিকার একটি বৃহৎ ক্লাস্টার পরিচালনার দায়িত্ব সামলান তিনি, যা তাকে বিশ্বমানের লিডারশিপে অভ্যস্ত করে তোলে।

যেভাবে অ্যামাজন জাপানে স্থান পরিবর্তন

২০২২ সালের মাঝামাঝি এক সকালে হঠাৎই অ্যামাজন জাপানের এইচআর বিভাগের ইমেইল পান ফারুক মুক্তাদির। লিংকডইনের মাধ্যমে তার প্রোফাইল দেখে যোগাযোগ করা হয়। চার ধাপের কঠিন ও পৃথক ইন্টারভিউ শেষে তিনি সরাসরি অ্যামাজন জাপানের রিজিওনাল হেড হিসেবে নিয়োগ পান। অ্যামাজন তার পুরো পরিবারকে জাপানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে।

বছর না ঘুরতেই পেয়েছেন স্থায়ী রেসিডেন্সি (PR)। দেশটিতে দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন ফারুক মুক্তাদির।

তিনি জানান, তার কার্যকালেই জাপানে অ্যামাজনের লোকেশন ২৯-৩০টি থেকে রেকর্ড গড়ে ৬০টিরও বেশি হয়। নতুন সাইটের নকশা থেকে শুরু করে ঠিকাদার ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা সম্প্রসারণে দিনরাত কাজ করেছেন তিনি। সাধারণত কোনো বাংলাদেশি পেশাজীবীর সরাসরি রিজিওনাল ডিরেক্টর বা তদূর্ধ্ব লেভেলে জাপানে স্থানান্তরিত হওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

বিশ্বখ্যাত এভিয়েশন প্রতিষ্ঠান 'সুইসপোর্ট'-এ ফারুক

বর্তমানে ফারুক মুক্তাদির সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'সুইসপোর্ট'-এর জাপানি কার্যক্রমের অপারেশন্স প্রধান দুই কর্মকর্তার একজন। বিশ্বের ৩১০টিরও বেশি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও প্যাসেঞ্জার সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত এই জায়ান্ট কোম্পানিটি। জাপানের বিখ্যাত নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘অ্যাসপায়ার লাউঞ্জ’।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিশেষায়িত পেশাগত যোগ্যতাকে দেখছেন তিনি। যুক্তরাজ্যের NEBOSH International Diploma এবং যুক্তরাষ্ট্রের Certified Safety Professional (CSP)—এই দুটি আন্তর্জাতিক সনদ একইসঙ্গে অর্জন করা বিরল বাংলাদেশি ব্যক্তিত্বদের একজন তিনি। জাপানের মাটিতেও এই জোড়া সনদধারী পেশাজীবীর সংখ্যা হাতগোনা।

23

জাপানের চাকরির বাজারে সম্ভাবনা ও যোগাযোগ ঘাটতি

ফারুক মুক্তাদিরের মতে, জাপানে প্রযুক্তি, প্রকৌশল, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে দক্ষ জনবলের বিপুল চাহিদা রয়েছে। তবে যোগ্য তরুণ থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগের ঘাটতির কারণে সেই সুযোগ বাংলাদেশিরা নিতে পারছেন না।

তিনি বলেন, আমাদের তরুণদের দক্ষতা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী পেশাদার সিভি (CV) বা লিংকডইন প্রোফাইল তৈরি করতে পারেন না। জাপানের স্থানীয় রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের কোনো সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে না।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার, দূতাবাস কিংবা সরকারের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংযোগ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। তবে সেটিকে যেন নিছক ‘ম্যানপাওয়ার রিক্রুটমেন্ট’ ব্যবসায় রূপ দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও তিনি সতর্ক করেন।

জাপানে পেশাগত সাফল্যের প্রধান শর্ত ভাষাদক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি

জাপানের চাকরির বাজারে সফল হওয়ার জন্য এক নম্বর শর্ত হিসেবে 'জাপানি ভাষা' শেখার ওপর জোর দিয়েছেন ফারুক মুক্তাদির। এর পাশাপাশি জাপানিদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তার ভাষায়, আমি যখন কোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করি, তখন কেবল ফারুক মুক্তাদির নই, বরং লাল-সবুজের বাংলাদেশকেই প্রতিনিধিত্ব করি। আমার ইতিবাচক বা নেতিবাচক আচরণ বিদেশের মাটিতে গোটা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তৈরি করে। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়তে আন্তর্জাতিক যোগ্যতার সঙ্গে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি গভীর সম্মান রাখা আবশ্যক।

ভিসা কড়াকড়ি ও বাংলাদেশিদের করণীয়

সম্প্রতি জাপানে ভিসা নবায়ন ও জটিলতা বৃদ্ধি নিয়ে ফারুক মুক্তাদির জানান, নতুন নিয়ম না হলেও আগের বিদ্যমান নিয়মগুলো নিয়ে এখন অত্যন্ত কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে। বিশেষ করে অনুমোদিত কাজের ক্যাটাগরির বাইরে কাজ করা, শিক্ষার্থীদের পার্টটাইমে অতিরিক্ত সময় দেওয়া এবং সঠিক সময়ে কর ও সামাজিক বীমা (পেনশন, হেলথ ইনস্যুরেন্স) পরিশোধ না করার কারণে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

তিনি তরুণদের ভুল তথ্যে কান না দিয়ে এবং এজেন্সির ফাঁদে না পড়ে সঠিক তথ্য ও কারিগরি যোগ্যতা অর্জন করে জাপানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

বিইউ/এএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর