ঢাকা শহরের স্থবিরতার দুটি কারণ তুলে ধরেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম। এজন্য তিনি ই-রিকশা ও হকার সমস্যাকে দুটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাই ই-রিকশা ও হকারদের নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনার কথাও জানিয়েছেন ডিএসসিসি প্রশাসক।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) নগর ভবনের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি ঢাকা শহরের স্থবিরতার এই দুটি কারণ তুলে ধরেন।
আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা শহর বর্তমানে যে অবস্থায় রয়েছে, তা কারও জন্যই সুখকর নয়। শহরটি এক ধরনের স্থবির অবস্থায় চলে গেছে। এর পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে- ই-রিকশা ও হকার সমস্যা। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় এ দুটি সমস্যা সমাধান করা না গেলে নগরকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনেকটা মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উচ্ছেদের পরিবর্তে হকার ও ই-রিকশাচালকদের সমন্বয় করে একটি ব্যবস্থার মধ্যে আনার পক্ষে। সে লক্ষ্যেই সরকার ঘোষিত নীতিমালা পর্যালোচনা করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হুট করে একদিনে সব ই-রিকশা বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই। বরং নিবন্ধন, কারিগরি মান যাচাই এবং নির্ধারিত মডেলে রূপান্তরের মাধ্যমে পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনা হবে।
ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশাসক বলেন, মঙ্গলবার থেকে নিবন্ধনের আবেদন ফরম বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এই ফরম সংগ্রহ করলেই কোনো ই-রিকশা চলাচলের অনুমতি পাবে না। এটি কেবল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করার ফরম। নীতিমালায় উল্লেখ করা শর্তগুলো পূরণ করে আবেদনকারীদের ফরম জমা দিতে হবে। এর আগে ই-রিকশার কারিগরি বিষয়ে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ইএমই) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাড়পত্র নিতে হবে। প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ ও ছাড়পত্র পাওয়ার পরই নিবন্ধন দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নিবন্ধন কার্যক্রম একবারে শেষ হবে না। প্রথমে এক, দুই বা পাঁচ হাজার যতগুলো আবেদন প্রস্তুত হবে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ই-রিকশাগুলোকে নির্ধারিত মডেলে রূপান্তরের সুযোগ দেওয়া হবে। এ জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্কশপ চিহ্নিত করে দেওয়া হবে। চালক ও মালিকেরা সেসব ওয়ার্কশপের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের ই-রিকশা নির্ধারিত মডেলে রূপান্তর করতে পারবেন। বুয়েটের কারিগরি মান পূরণ করে ছাড়পত্র পেলেই সেগুলো নিবন্ধনের সুযোগ পাবে।
ই-রিকশার চার্জিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনার পরিকল্পনার কথাও জানান ডিএসসিসি প্রশাসক। তিনি বলেন, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করতে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নির্ধারিত চার্জিং পয়েন্ট স্থাপন করা হবে। সম্ভব হলে ওয়ার্ডভিত্তিক, তা না হলে থানাভিত্তিক চার্জিং স্টেশন করা হবে। যাতে ই-রিকশাগুলো নির্ধারিত স্টেশন ছাড়া অন্য কোথাও অবৈধভাবে চার্জ দিতে না পারে।
ঢাকা দক্ষিণকে চারটি অঞ্চলে ভাগ করে ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে আবদুস সালাম বলেন, সব অঞ্চলে সমানসংখ্যক ই-রিকশা চলবে না। কোন অঞ্চলে কতগুলো ই-রিকশা চলতে পারবে, তা সিটি করপোরেশন ও পুলিশ যৌথভাবে নির্ধারণ করবে। এ বিষয়ে আগামী ৫ নভেম্বর একটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায় জোন চূড়ান্ত করার পাশাপাশি প্রতিটি অঞ্চলের জন্য প্রাথমিকভাবে ই-রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করা হবে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সেই সংখ্যা বাড়ানো বা কমানো হতে পারে।
বৈঠকে সাংবাদিকেরা জানান, নিবন্ধন ফরম বিতরণ শুরুর ঘোষণা দেওয়া হলেও সকালে অনেক ই-রিকশাচালক ও মালিক ফরম সংগ্রহ করতে এসে তা পাননি। এমনকি তথ্যকেন্দ্র থেকেও প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়ার অভিযোগ করেন তারা। জবাবে প্রশাসক বলেন, বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। সাংবাদিকদের কাছ থেকে শুনে তিনি খোঁজ নেবেন। তবে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) থেকেই ফরম বিতরণ শুরু হওয়ার কথা এবং আজই তা পাওয়া যাবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
বিদ্যমান ই-রিকশাগুলো নিবন্ধনের আগে রূপান্তর করতে হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্ধারিত ওয়ার্কশপের মাধ্যমে ই-রিকশাগুলোকে প্রস্তাবিত মডেলে রূপান্তর করতে হবে। কারিগরি মান যাচাই করে বুয়েট ছাড়পত্র দিলে নিবন্ধন দেওয়া হবে।
ই-রিকশার সামনে ভারী বাম্পার লাগিয়ে দ্রুতগতিতে চলাচলের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুস সালাম বলেন, নতুন নীতিমালায় চলাচলের গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত গতিসীমার মধ্যে চলতে হলে ই-রিকশার কারিগরি কাঠামোও সে অনুযায়ী হতে হবে। বুয়েট কারিগরি ছাড়পত্র দেওয়ার সময় এসব বিষয় পরীক্ষা করবে।
সবকিছু রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, এটি শুধু তার একার সমস্যা নয়, পুরো ঢাকা শহরের সমস্যা। তাই নগরকে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সাংবাদিক, নাগরিক ও ই-রিকশাচালকসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ই-রিকশা চলাচলকে একটি নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে আনতে চান তারা।
এম/এসআই




